
মধ্যযুগে মুদ্রার মান নির্ণয় করা হতো স্বর্ণ বা রৌপ্যের বিপরীতে। সেই সময় ব্রিটিশ ব্যাংকার স্যার থমাস গ্রেসাম লক্ষ্য করেন যে বাজারে নতুন মুদ্রা চালু করার জন্য সরকার স্বর্ণ বা রৌপ্যের মত মূল্যবান ধাতুর মুদ্রায় খাদ মেশায়। তখন খাদ হিসেবে সীসা বা টিনের মত সস্তা ধাতু ব্যবহৃত হতো। যদিও খাদ মেশানো মুদ্রার মান স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার অভিহিত মানের সমানই নির্ধারিত হত তবুও জনগণ এই মিশ্রিত মুদ্রাকে ভিন্ন চোখে দেখতো। সেই যুগে কেনাকাটার সময় ক্রেতারা মিশ্রিত মুদ্রা খরচ করতো আর নিখাদ মুদ্রা নিজস্ব কোষাগারে রেখে দিত। এইভাবে বাজারে নিখাদ মুদ্রার ব্যবহার কমে গেল এবং মিশ্রিত মুদ্রার প্রচলন বেড়ে গেল। গ্রেসাম ঘোষণা করলেন যে, টোটকা মুদ্রার আগমণে নিখাদ মুদ্রার প্রচলন আশংকাজনকভাবে কমে যাবে। অর্থাৎ টোটকা মুদ্রা নিখাত মুদ্রাকে বাজার থেকে বের করে দেবে। গ্রেসামের এই পর্যবেক্ষণ পরবর্তীতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে ব্যবসা, বাণিজ্য এবং অর্থনীতির বিবিধ পরিধিতে এবং মাত্রায়।
গ্রিস যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেয় তখন গ্রিক জনগণকে ড্রাকমা জমা দিয়ে ব্যাংক থেকে সমমূল্যের ইউরো বিনিময় করে নেয়ার জন্য বলা হলো। কিন্তু কার্যত দেখা গেল যে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পরিমাণ ড্রাকমা বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল কারণ ইউরোর মুদ্রামান তখনো জনমনে আস্থা অর্জন করতে পারেনি।
মার্কিন অর্থনীতিবিদ জর্জ একারলফ এই সূত্রের প্রয়োগ আবিস্কার করলেন পণ্য বাজারে। তিনি লক্ষ্য করলেন যে আমেরিকায় ব্যবহৃত গাড়ির বাজার রমরমা। কারণ যখনই কোনো গোলযোগ দেখা দেয় তখন সেই গাড়ি তথাকথিত ‘লেমনস’ মার্কেটে পাঠানো হয় বিক্রির জন্য। আর ক্রেতাও কম দামে পেয়ে ব্যবহৃত গাড়ি লুফে নেয়। মূলত তথ্যের অসামঞ্জস্যতার কারণে এমনটা ঘটে। অর্থাৎ বিক্রেতা গাড়ির গোলমেলে ব্যাপারটা সুকৌশলে এড়িয়ে যান এবং ক্রেতাও চালু গাড়ি কম দামে পেয়ে কিনে ফেলেন। তিনি আবার কিছুদিন পর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অন্য আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেন। ফলে ‘লেমনস’ মার্কেটের মাধ্যমে ব্যবহৃত পণ্য কেবলই হাতবদল হয়। মূলত বিষয়টি গ্রেসামের টোটকা মুদ্রানীতির প্রতিফলন।
ইদানিং ইউরোপ, আমেরিকায় বিমান বা এয়ারলাইনসে কমদামী টিকেটের বাজেট বিমান কোম্পানি বেশ ভালই গ্রাহক প্রিয়তা পেয়েছে। এইসব আকাশযান কোম্পানি তথ্যের অসামঞ্জস্যতাকে পুঁজি করে বাজার দখল করছে। বাজেট বিমান কোম্পানিগুলো যাত্রীর লাগেজের নির্ধারিত কোটা কমিয়ে দেয়। ফলে যাত্রীদের সামান্য কয়েক কেজি জিনিসপত্রের জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। এছাড়াও বাজেট বিমান কোম্পানি আকাশযানে খাবার পরিবেশনে কার্পণ্য প্রদর্শন করে। অনেকক্ষেত্রে যাত্রীকে খাবার কিনে খেতে হয়। ট্রানজিট বিমান বন্দরেও যাত্রীকে খরচ করতে হয়। টিকেট কেনার সময় যাত্রীরা কিন্তু এইসব লুকায়িত অতিরিক্ত খরচের কথা মোটেও চিন্তুা করেন না। কিন্তু ভ্রমণ শেষে হিসাব করলে দেখা যায় যাত্রাপথের সার্বিক খরচ মূলধারার বিমান কোম্পানির টিকেটের মতোই। এজন্যই বোধহয় ইদানিং বিজ্ঞাপনচিত্রে বলা হচ্ছে- “জিনিস যেটা ভালো দাম তার একটু বেশিই হয়”। অর্থনীতিবিদ চার্লস ব্যাবেজ বলেন যে, শুধু তথ্যের অসামঞ্জস্যতা নয়, পণ্য বা সেবার মান হ্রাস করার মাধ্যমে ক্রেতাকে প্রতারিত করা হয়। বাংলাভাষায় সেই প্রবাদ বাক্যই ঘুরেফিরে আসেÑ সস্তার তিন অবস্থা। প্রথম অবস্থা হল আপনাকে ডিসকাউন্টের টিকেট দেয়া হচ্ছে, অতএব যাত্রার তারিখ পরিবর্তনযোগ্য নয়। দ্বিতীয় কথা হল ট্রানজিট বিমানবন্দরে আপনাকে একরাত অবস্থান করতে হবে কিন্তু কোনো হোটেল রুম বা লাউঞ্জ দেয়া হবে না। তৃতীয় অবস্থা হল আপনাকে নিজের খাবার কিনে খেতে হবে। এই তিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যিনি বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তিনি দ্বিতীয়বার বাজেট বিমানে দুরপাল্লার যাত্রায় অভিযাত্রী হবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দেয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ঘুষ প্রদান করে বা অন্য কোনো সুবিধা লাভের জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। ফলে ঐসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিবাজদের টার্গেটে পরিণত হয়। আবার অনেক ব্যবসায়ী পণ্যের সাথে ভেজাল দ্রব্য মিশিয়ে অধিক মুনাফার লোভ সামলাতে পারে না। বস্তুত এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাÐের জন্য এক সময় এইসব প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণœ হয়। ব্যবসা যেহেতু একটি চলমান প্রক্রিয়া, তাই দূরদর্শী বণিকরা যথাসম্ভব দুর্নীতি বা অনৈতিক কর্মকাÐ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। আমরা দেখেছি এধরণের মত নামকরা কোম্পানি কিভাবে স্কান্ডালের অন্তরালে ডুবে গেছে।
ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গ্রেসামের নীতির কুটাভাস লক্ষ্যণীয়। দেখা যায় যে, আপাতদৃষ্টিতে ব্যয় সংকোচনে দক্ষতা অর্জন করতে যেয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের মূল লক্ষ্যের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ডেল্টা এয়ারলাইনস ব্যয় সংকোচনে দক্ষতা অর্জনের জন্য এমন সব কৃচ্ছতামূলক পদক্ষেপ নেয় যার ফলে কর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। ফলে ক্রমশ সেবার মান পড়ে যেতে থাকে। অসন্তোষের কারণে বিমানযাত্রীরা একসময় ডেল্টা এয়ারলাইনস থেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে নেয়। এভাবেই আপাত দক্ষতা অর্জন করতে যেয়ে ডেল্টা এয়ারলাইনস দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
এই বিষয়টা বিবেচনায় নিতে হবে যে অধিক বেতন আর সুযোগ সুবিধাই কেবল কর্মী প্রণোদনার মুখ্য চালিকাশক্তি নয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কর্ম পরিবেশ এবং ইতিবাচক সংস্কৃতি কর্মউদ্দীপনায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। যে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার বা পরিচালকরা তাদের কর্মীদের সাথে রূঢ় আচরণ করেন, যত বেতনই দেয়া হোক না কেন যোগ্য কর্মীরা সেই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবে।
অগ্রসরমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের কদর করেন। একটি হল কর্মী প্রণোদনা এবং অন্যটি কর্ম উদ্দীপনা। বাংলাদেশে কর্মী প্রণোদনার বিষয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কিছুটা মনোযোগ দিলেও কর্ম উদ্দীপনার বিষয়টি একেবারেই উপেক্ষিত। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য জিম, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ইত্যাদি কর্ম প্রণোদনার প্রেরণা হতে পারে। আর কর্মী উদ্দীপনার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত কর্ম পরিবেশ সৃষ্টি করা। যেমন কর্মীদের পারস্পরিক সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্কের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কর্মীদের কর্মস্পৃহা এবং প্রতিভাকে উৎসাহিত করা এবং কাজে লাগানো।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, গ্রাহক সেবায় দক্ষতা অর্জনের জন্য এমনসব প্রযুক্তি এবং কৌশল গ্রহণ করা হয় যার ফলে গ্রাহকরা বিমুখ হয়ে পড়ে। মানবীয় স্পর্শের সাথে সেবা সন্তুষ্টির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য এই বিষয়টি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গ্রেসামের মুদ্রাতত্ত¡কে যদি অতি সরলীকরণ করা হয় তবে তা বাস্কেট থিওরির সাথে অনেকটাই মিলে যায়। এক ঝুড়ি ভাল আমের ভেতরে যদি একটা পঁচা আম পড়ে তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অন্যসব আমে পচন ধরে। সেই জন্য আম ব্যবসায়ীকে খুব সতর্কতার সাথে পঁচা আমটি চিহ্নিত করে তা ফেলে দিতে হবে।
কোনো কোনো মহল মনে করেন যে অর্থনীতিতে কালো টাকাকে সাদা টাকায় রূপান্তরিত করার সুযোগ দিলে বোধহয় অর্থনীতির চাকা চাঙ্গা হবে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় যে কালো টাকার কু প্রভাব অর্থনীতির চাকাকে শ্লথ করে দেয়। এমনকি এই কৃষ্ণমুদ্রা অর্থনীতিকে বেগবান করার বদলে গ্যাঁড়াকলে ফেলে দিতে পারে। কারণ কালো টাকার অশুভ প্রভাব মানুষের নৈতিক অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেয়। আর নীতিহীন বণিক অভিষ্ট লক্ষ্যে কখনোই পৌঁছাতে পারে না। আর একারণেই বিনিয়োগের অর্থের আগমণ যেন সুপথে হয় তা নিশ্চিতকরণ একান্ত জরুরী।
গ্রেসামের মূলমন্ত্রকে যদি আমরা ব্যবসা বাণিজ্যে এবং অর্থনীতিতে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি তবে আমাদের অর্জনগুলো হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং সূদূরপ্রসারী।
