মাইটকন্ড্রিয়া

ছবিতৌফিক বারভুইয়া

মাইটকন্ড্রিয়া শরীরে শক্তির জোগান দেয়, জীববিদ্যার জ্ঞান থেকে এটা আমরা জানি। প্রথম এই শক্তিটা আসে গ্লুকোজ থেকে। আর গ্লুকোজ আসে উদ্ভিদ থেকে এবং উদ্ভিদে সেই গ্লুকোজ তৈরি হয় সালোকসংশ্লেষণ নামক এক পদ্ধতিতে। গাছের সবুজ পাতা সূর্যালোক থেকে শক্তি সঞ্চয় করে শেকড় বয়ে উঠে আসা জল আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো কার্বন ডাই অক্সাইডকে একত্র করে বানিয়ে ফেলে গ্লুকোজ। সেই গ্লুকোজ আহারের মাধ্যমে আমাদের পেট, কলিজা ও রক্তনালির দীর্ঘপথ বেয়ে হাজির হয় কোষে। ওদিকে ফুসফুসের পথ বেয়ে রক্তের সাথে চলে আসে অক্সিজেন। সেই অক্সিজেনকে ব্যবহার করে আমাদের কোষের মাইটকন্ড্রিয়া ওই গ্লুকোজ থেকে জল আর কার্বন ডাই-অক্সাইডকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে তারা রক্তের পথ বেয়ে কোষ থেকে বহিষ্কৃত হয়, আর শক্তিটা থেকে যায়। পরে এই রক্তের পথ বেয়ে ফুসফুসের ধাক্কায় কার্বন ডাই-অক্সাইডে বাতাসে ফিরে যায়, আর কিডনির পথে জল ফিরে যায় মাটিতে। এই চক্রটা চলতেই থাকে। কিন্তু এই চক্রের খেলায় যে শক্তিটা থেকে গেল কোষে এটাতো সেই শক্তি যা সূর্য থেকে সংগ্রহ করেছিল উদ্ভিদ। আর সেটাই ব্যবহার করে আমরা বেঁচে থাকি। কেবল গ্লুকোজ না, কোষ তৈরি হয় যে প্রোটিন দিয়ে সেটাও আসে ওই উদ্ভিদ থেকে। অনেক আগে হয়তো কেবল উদ্ভিদ থেকেই আসতো, পরে মাছ-মাংস থেকেও আসতে শুরু করে। জীবের আর উদ্ভিদের কি পরষ্পর নির্ভরশীলতা! অথচ, না বুঝে আমরা বৃক্ষ নিধন করে যাই।
কার্বের বেলায় গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদনের মতো ফ্যাট বা চর্বির বেলায় চর্বি থেকে শক্তি উৎপাদনের কাজটিও এই মাইটকন্ড্রিয়াই করে থাকে। তখন অবশ্য কোষ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত না হয়ে কিটোন নির্গত হয় এবং মূত্রনালি বা নিঃশ্বাসের পথে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। মাইটকন্ড্রিয়াকে তাই আদর করে অনেকে কোষের চুলা বলে ডাকে।
আমাদের ত্বকে ও উদরে বসবাসরত অণুজীব, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়ার সাথে কোষের এই মাইট্রকন্ড্রিয়ার আজব সাদৃশ্য, যেন জনম জনম ধরে তারা সহোদরা এবং সারাক্ষণ একে অন্যের সাথে সংকেত আদান-প্রদান করে। কী বলে কে জানে? হয়তো দেশদুনিয়ার খবর আদান- প্রদান করে, হয়তো উদরে কী ধরনের খাবার এসেছে সেটা জানিয়ে দেয়। জেনিটিক্যালি উভয়ের ডিএনএ একইরকম। ব্যাকটেরিয়া যেভাবে সহজে দুইভাগে ভাগ হয়ে বংশবিস্তার করে, কোষের মাইট্রকন্ড্রিয়াও তাই। আমাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সে তার সংখ্যা বাড়ায় কিংবা কমায়। হিট বা উচ্চলম্ফে যেমন, তেমন করে বরফশীতল জলে অবগাহনে মাইট্রকন্ড্রিয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আমাদের শরীরে শক্তি সরবরাহ করে, উত্তাপের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয় ত্বক, ফলে ঠান্ডায় টিকে থাকতে অসুবিধা হয় না। তবে তারও সীমা আছে, দীর্ঘক্ষণের জন্য শরীরচর্চা বা বরফশীতল জলে অবগাহন তাই ক্ষতির কারণ হয়ে যায়। বরফশীতল জলে অবগাহনে আমাদের শরীরের সাদা রঙের চর্বিগুলোতে মাইট্রকন্ড্রিয়ার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং একসময় তার রঙ বাদামি হয়ে যায়। সাধারণত, শিশুদের শরীরে বাদামি রঙের চর্বি দেখতে পাওয়া গেলেও বয়ষ্কদের মাঝে ওই বরফশীতল জলে ডুবাদের বেলায় এই চর্বির দেখা পাওয়াটা ডেভিড সিনক্লিয়ারের মতো অনেককে আগ্রহী করে তোলে; কারণ, মাইট্রকন্ড্রিয়ার সংখ্যা বাড়ার আরেক অর্থ হচ্ছে শরীরের হজমক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া। তখন অনেক খেলেও শরীরে মেদ জমতে পারে না।
মানুষের ব্রেইনে, হার্টে বা লিভারে মাইটকন্ড্রিয়ার সংখ্যা বেশি। ঘুমের মধ্যে অন্যান্য অঙ্গ বিশ্রামে গেলেও এই অঙ্গগুলো চালু থাকে। ফলে ধারণা করতে অসুবিধা হয় না যে, এখানকার মাইটকন্ড্রিয়াগুলোও বিরতিহীনভাবে জেগে থাকে এবং এদেরকে শক্তির জোগান দেয়। কেবল শক্তির জোগান দেওয়া না, পরষ্পরের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান করার কাজটিও এরা নিরলসভাবে করে যায়। ফলে, শীতের রাতে ঘুমের মধ্যে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা যেন নিচে নেমে না যায় সেজন্য কোষের মাইটকন্ড্রিয়া সারাক্ষণ সজাগ থাকে এবং চুপি চুপি সে উষ্ণতা দিয়ে চলে। যারা ওজন কমাতে চায়, তাদের জন্য টিপস হচ্ছে শীতের সময় শরীরকে হালকা চাদরে ঢেকে রাখা, তাহলে বিনা পরিশ্রমে আমাদের ত্বক ১০০ ক্যালোরির মতো শক্তি ক্ষয় করতে সক্ষম হয়।
মাইটকন্ড্রিয়া সম্পর্কে এই সুযোগে একটা খুবই ছোট একটা তথ্য দিয়ে রাখি। আর সেটা হচ্ছে আমাদের কোষে মাইটকন্ড্রিয়ার উৎস হচ্ছে মায়ের জিন। অর্থাৎ, মায়ের জরায়ুতে পিতার শুক্রাণু কর্তৃক মায়ের ডিম্বানু নিষিক্ত হওয়ার সময় বাপ ও মা থেকে যে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম পরষ্পরের সাথে মিতালি গড়ে নতুন মানুষের জন্ম দেয়, সেখানে সেই যুক্ত হওয়ার মহালগ্নে কোষে মাইটকন্ড্রিয়া সরবরাহের দায়িত্বটি গিয়ে পড়ে মায়ের ক্রোমোজোম থেকে আসা জিনগুলোর ওপর।
ক্যালগেরি, কানাডা

 

- Advertisement -

Read More

Recent