
নব্বুই একানব্বুই সাল। আমি কাজ করি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়। ওফিস গ্রীনরোডে। লাল হোন্ডায় চেপে ওয়ারি থেকে গ্রীনরোড আসা-যাওয়া করি। পত্রিকাটার ফিচার এডিটর আমি। ছোটদের পাতা ‘হইচই’ প্রকাশিত হয় আমার পরিচালনায়। বাড়তি দায়িত্ব চারপাতার ‘সাময়িকী’। মাঝে-মধ্যে ইচ্ছে হলে রিপোর্টও লিখি। ব্যস্ত সময়। সকাল এগারোটার দিকে অফিসে আসি। বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে চলে যাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। দুপুরে খেতে হয় হোটেলে। তো গ্রীনরোডে মোটামুটি মাঝারি মানের একটা হোটেল আবিস্কার করলাম। প্রায় দুপুরেই চলে আসি এই হোটেলে। অধিকাংশ দিনেই সঙ্গীসহ। অফিস থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। সেদিন খেতে গেছি একা। আমি হোটেলে ঢুকলেই মেছিয়ার বা বেয়ারারা ব্যস্ত হয়ে ওঠে আমাকে সেবা দেবার জন্যে। এর পেছনে টিপ্স একটা মূখ্য ভূমিকা পালন করে। বেসিনে ট্রান্সপারেন্ট পিচ্চিল কসকো গ্লিসারিন সাবানে হাত ধুতে ধুতে খেয়াল করলাম আমাকে বসানোর জন্যে যে টেবিলটা ক্লিন করছে বেয়ারাটা সেই টেবিলে একটা বাচ্চা ছেলে ভাত খাচ্ছে। বেয়ারা তাকে দ্রুত খেয়ে নিষ্ক্রান্ত হবার তাগাদা দিচ্ছে। একটা টেবিলে মুখোমুখি দুটো করে চারটা চেয়ার। আমার মুখোমুখি ডানদিকের দেয়াল ঘেঁষা চেয়ারে ছেলেটা ভাত খাচ্ছে কিছুটা দ্রুত ভঙ্গিতে। ওর পাতে ভাত আর ডাল। ডালের পরিমাণ খুবই কম বলে ভাত খানিকটা শুকনো। ছেলেটা সেই বেয়ারাকে খুব নিচু স্বরে বললো—থোরা ডাইল…
এইধরণের হোটেলে যারা খাওয়া দাওয়া করেন তারা জানেন ‘থোরা ডালে’র মানে কি। থোরা ডাল হচ্ছে সামান্য কিছু এক্সট্রা ডাল। যার জন্যে আলাদা পয়সা দিতে হয় না। এক বাটি ডাল নিলে থোরা ডাল ফ্রি। কাস্টমার এটা চাইলে সাধারণত বিমুখ করা হয় না। কিন্তু বাচ্চা এই ছেলেটাকে ধমকে উঠলো বেয়ারা—অই হারামজাদা যা। থোরা ডাইল! জলদি খাইয়া ভাগ…
কণ্ঠে নির্দয় হলেও বাটিতে খুব সামান্য পরিমাণে ডাল সরবরাহ করলো লোকটা। আমার জন্যে চলে এলো চমৎকার ঘ্রানসমৃদ্ধ মুর্গি ভুনা সহ এক প্লেট গরম ভাত। আগের রাতে কেটে রাখা হোটেলের রেগুলার সালাদ আমি খাই না। আমার জন্যে একটা পেঁয়াজ কেটে দেয়া হয়, সঙ্গে দু’তিনটে কাঁচা মরিচ আর এক টুকরো লেবু। আমাকে দেয়া পানির গ্লাসটা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দু’বার করে ধোয়া ঝকঝকে চকচকে। আমি খাওয়া শুরু করি আর আমার সামনের বালকটাকে অবজার্ভ করতে থাকি। লক্ষ্য করলাম খুব দ্রুত খাচ্ছে ছেলেটা। আর আমার চোখ এড়িয়ে আঁড় চোখে তাকাচ্ছে আমার প্লেটের দিকে। ওকে হাতেনাতে মানে চোখেচোখে ধরতে চাইলাম। পরেরবার লুকিয়ে তাকাতে গিয়েই আমার চোখের শার্প এন্টেনায় ধরা পড়ে গেলো ছেলেটা। এবং ধরা পড়েই খুবই অপরাধীর ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নিলো সে। আমি বললাম—কীরে, খাবি নাকি একপ্লেট, মুর্গিভূনা দিয়া?
আমার প্রশ্নে হতবাক ছেলেটা এই প্রথম মুখটা উঁচু করে তাকালো আমার দিকে সরাসরি। ওর চোখে অবিশ্বাস আর বিস্ময়ের মিশেল। ওর সন্দেহ আমি ওর সঙ্গে ঠাট্টা করছি না তো? প্রশ্নটা তাই রিপিট করলাম—কীরে ব্যাটা খাবি কীনা বললি না? মুর্গিভূনা দিয়া একপ্লেট ভাত খাবি নি?
খুব দ্বিধা সংকোচ আর বিহবলতায় আক্রান্ত ছেলেটা ওর মাথাটা খানিক ঝাঁকালো বাঁ দিকে। হ্যাঁ সূচক ঝাঁকানি। আমি মেছিয়ারকে বললাম—ঠিক আমার মতোন এক পিছ মুর্গি ভূনা দিয়া পোলাটারে এক প্লেট ভাত দেও। আমার অর্ডার পেয়ে খানিকটা হতবাক মেছিয়ার খুব দ্রুতই নিয়ে এলো ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের প্লেট আর মুর্গি ভূনার বাটি। সালাদও দিতে বললাম। মেছিয়ার ওর এঁটো ডালভাতের প্লেট আর ডালের শুন্য বাটিটা সরিয়ে নিলো। লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম—এই পোলার বিল কতো হইছে? মেছিয়ার বললো—একপ্লেট ভাত তিনট্যাকা আর এক বাটি ডাইল দুইট্যাকা—মোট পাঁচ ট্যাকা খাইছে স্যার। আমি বললাম—ওর বিল আমি দেবো। ওর থেকে টাকা নিও না।
ছেলেটা খেতে শুরু করেছে। খেয়াল করে দেখলাম ছেলেটা চেয়ারে বসে খাচ্ছে না। খাচ্ছে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। চেয়ারে বসলে টেবিলের উচ্চতায় ঠিকমতো মাখিয়ে লোকমা মুখে তুলতে পারবে না ছোট্ট ছেলেটা! টেবিলটা ওর বুক সমান উঁচু। খেতে খেতেই কথা বলছিলাম আমি ছেলেটার সঙ্গে। –নাম কীরে তোর?
নাম বললো সে,আকবর। ওর কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক। দশ এগারো বছর বয়েসী একটা ছেলের কন্ঠস্বর এমন হয় না। ওর ভোকাল কর্ড কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। কথা বলে সে নিঃশ্বাসে খুব প্রেসার দিয়ে। আর তখন গলার দু’পাশের ভেইন ফুলে যায়। বললাম—কী করিস তুই?
–আমি ছার টেম্পুর হেল্পার।
–তোর গলার স্বর এমন কেনো?
–গলা ভাইঙ্গা গেছে ছার। টেম্পুর হেল্পারি করি তো হারাদিন চিল্লাইতে অয়। চিল্লাইতে চিল্লাইতে গলা ভাইঙ্গা গেছে।
–তোর দায়িত্বটা কী?
–পেসিঞ্জার উঠানি নামানি আর ভাড়া নেওন আমার কাম।
ঢাকার টেম্পুগুলোতে ওর মতো খুদে বালকদের আমি দেখেছি। খুব রিস্কি জব। টেম্পুর পা-দানিতে ঝুলতে ঝুলতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ওদের। এব্রো-খেব্রো রাস্তায় টেম্পু চলে লাফিয়ে লাফিয়ে। মাথার ওপরের রড থেকে হাত ফস্কে গেলেই সোজা চাকার নিচে।
–কতো পাস মাসে?
–মাসকাবারি হিশাব না। ডেইলি হিশাব। সকাল থিকা সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিউটি। বিশ ট্যাহা রোজ। খাওন খরচ এক্সট্রা।
–খাওয়া বাবদ কতো পাস?
–সাত ট্যাকা ছার। দুই ট্যাকায় নাস্তা খাইতে হয় আর পাঁচ ট্যাকায় দুফরের ভাত। এর বেশি এক ট্যাকাও দেয় না ওস্তাদে।
–রোজ রোজ তাহলে এই ডাল আর ভাতই খাস?
–হ। পাঁচ ট্যাকায় আর কি খামু!
ছেলেটার কথায় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আমার। ঠিক ওর বয়েসী ছিলাম যখন, একা একা ওয়ারি থেকে বাংলা একাডেমিও আসতে পারতাম না আমি। রাস্তা পেরুতে পারতাম না। ওর বয়েসী ছিলাম যখন, সাগর ভাই প্রথম আমাকে হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে বাংলা একাডেমিতে নিয়ে এসেছিলেন। উপস্থিত গল্প বলা প্রতিযোগিতায় সেদিন প্রথম হয়ে একগাদা বই পেয়েছিলাম পুরস্কার হিশেবে। আর ঠিক আমারই বয়েসে এই ছেলেটা কী কঠিন জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত! জীবন ওকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মৃত্যুর মুখোমুখি। প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে কানামাছি খেলতে হয় ওকে ঢাকার রাজপথে।
খাওয়ার জন্যে ওদের ওস্তাদ অর্থাৎ টেম্পুর ড্রাইভার টাকার পাশাপাশি সময়টাও নির্দিষ্ট করে দেয়। দেরি করলে বাপ-মা তুলে গালাগালি করে। মায়ের সম্মান বাঁচাতে তাই তড়িঘড়ি খেয়েই ছুট লাগাতে হয় আকবরকে। আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে মুর্গি ভূনা দিয়ে গরম ভাত খেয়ে ‘সম্রাট আকবর’এর রিভার্স এডিশন ‘নিঃশ্ব আকবর’ বেসিনে হাত ধুয়ে বাম হাতের চেটোয় মুখ মুছতে মুছতে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে গেলো হোটেল থেকে। জীর্ণ মলিন রংজ্বলা হাওয়াই শার্ট আর শরীরের তুলনায় সামান্য বড় ঢিলেঢালা হাফপ্যান্ট পরা ছেলেটা হোটেল থেকে বেরিয়ে মিশে গেলো জনারণ্যে। আমি তাকিয়ে ছিলাম ওর গমন পথের দিকে। ধারণা করেছিলাম একবার অন্তত পেছন ফিরে তাকাবে সে আমার দিকে। মুখে না হোক, চোখের দৃষ্টিতে অন্তত ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দেবে সে আমাকে। কিন্তু না। ছেলেটা তাকালো না। একবারও তাকালো না। আমি মন খারাপ করে বসে থাকলাম। আমার মনে হতে থাকলো—ছেলেটা বুঝি বা আমাকে শনাক্ত করে ফেলেছে, আমি ওর শত্রুপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করি। মনে মনে ক্ষমা চাইলাম ছেলেটার কাছে—আকবর, তোর আনন্দময় শৈশব কেড়ে নিয়ে তোকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য আর যন্ত্রণাবিদ্ধ স্বপ্নহীন অনিশ্চিত একটা জীবনের প্যাঁচে ফেলে আমরা কী সুন্দর ছিমছাম নিরাপদ খাদ্যময় একটা জীবন উপভোগ করছি! পারলে ক্ষমা করিস ভাই…
অটোয়া, কানাডা
