
এক
জুলাই-আগস্টকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে ঘিরে নানা দেশের নানা আগ্রহ। সেটাই স্বাভাবিক। নামমাত্র জিডিপি (Nominal GDP)-এর হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ৩৫তম এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (PPP) বিবেচনায় ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। আইএমএফ-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ৫১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।
পাকিস্তান ফিরে গেছে সেই ৪৭ সালে, তখনও তারা বাংলাদেশের সম্পদের ওপর দাঁড়াতে চেয়েছিল। সফলও হয়েছিল। দেশটা ছিল তাদের কলোনি। কিন্তু, এখন? আমাদের রপ্তানীর সাপ্লাইচেইনের অংশ হয়ে দাঁড়াতে চাইছে। কতটা সফল হয় সেটাই দেখার বিষয়।
কিন্তু, ভারত পড়েছে সবচে বড় নৈতিক সংকটে।
শেখ হাসিনার বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাতকে তারা বরণ করেছিল সৌভাগ্য বলে। সৌভাগ্যের সেই ঋণ শোধে আগ্রহ ছিল না তেমন করে। অথবা, বুঝতে পারেনি, বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করতে যাচ্ছে, তার চুড়ান্ত লক্ষ্য ভারত।
ভারত দো-টানায়।
এটা আজকের সমস্যা না। প্রজাতন্ত্র হিসেবে ভারতের জন্মকালীন সমস্যা। ভারত-বিভক্তি মেনে নাও–তাতে আগ্রহ যতটা না ব্রিটিশদের, তারচেয়ে অনেক বেশি মার্কিন পুঁজিপতিদের। টাটা-বিড়লাদের সাথে তখন ঘনঘন বৈঠক, ক্ষণে-ক্ষণে কথা। একটাই কথা–দিল্লি কেন্দ্রিক শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা দরকার। দ্রুত সিদ্ধান্ত, দ্রুত বিনিয়োগ, দ্রুত উন্নতি।
ভারত-ভাগ গান্ধিজী মানতে চায়নি। সর্দার প্যাটেল চেয়েছিল। নেহরু দ্বিধায়, তাঁর মাথায় সমাজতন্ত্র। ওটা আরেক সমস্যা। পুঁজিবাদের স্বাভাবিক বিকাশ কারো মাথাতে ছিল না আসলে।
বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের নৈতিক সংকটের আলোচনায় ভারত-ভাগ বিষয়টি না এসে পারে না। কারণ, ওই বিভক্তির মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করা কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান যে ক্রমশ: ভারত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে, সেটা ভারতবর্ষের কোন রাজনৈতিক নেতার কল্পনাতেও ছিল না। তো সেটাই হয়েছিল, বিশেষ করে ১/১১ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায়। যেখানে, পেছন থেকে জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়ে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে–মার্কিনীদের ডিপ-স্টেট। সরকারের চেয়ে বড় সরকার। সেরের ওপর সোয়াসের।
যাহোক, বহুবছর পরে বহু জল ঘোলা করে অবশেষে শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছিলেন আঞ্চলিক নিরাপত্তার সবচে শক্তিশালী স্তম্ভ। জঙ্গিরা তখন কারো লুঙ্গির তলায়, তো কেউ গুপ্ত। গণতন্ত্র তার মাটিই খুঁজে পেল না। সেজন্য, বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জ করাটা এত সহজ হয়ে গেল ডিপস্টেটের। তাই তাদের পছন্দমতো, কখনো ইনুচ, তো কখনো তারেক সরকার।
শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা ছিল ভারতের দিক থেকে খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা। ভারত সেই সক্ষমতা অর্জন করেছে। পচাত্তরে ছিল না।
কথা হচ্ছে, ভারত কি এভাবে নিজেকে বাঁচাতে পারবে?
বাংলাদেশে এতবড় ঘটনার পরেও দেখা যাচ্ছে, তাদের আগ্রহ ই-শ-রা-ই-ল। তাদের মনে এখনও মার্কিন-প্রেম। অথবা, ব্রিকস ও কোয়াড দুই নৌকায়–এক সাথে। এটাই নৈতিক সংকট। যা কিনা ইন্দিরার মধ্যে ছিল না। থাকলে, বাংলাদেশ সেই একাত্তর সালেই ফিলিস্তিন হয়ে যেতো। যাহোক, ইরানে মার্কিন ডিপস্টেট ব্যর্থ হওয়ার ঝাল মেটাতে এখন তারা বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে? মায়ানমার কি হাতছানি দিয়ে ডাকছে, বলছে, এসো এসো আমার ঘরে এসো, আমার ঘরে। আর সত্য-সত্যই যদি সেই ঘরে ঢুকতে বাংলাদেশের আঙিনা হয়ে ওঠে তাদের লোভনীয় জায়গা, তো বিশ্বযুদ্ধ এখান থেকেই শুরু হবে। মায়ানমার মানে চায়না। বিষয়টি তখন আর প্রক্সিযুদ্ধ থাকবে না।
দুই.
৯ই মে, শনিবার থেকে ১৫ই মে, শুক্রবার, মাত্র সাতদিনে তিনটি গানের অনুষ্ঠান। শুরু হয়েছিল অনিন্দ্য পালের কণ্ঠে “রবীন্দ্র-নজরুল” দিয়ে, পরদিন ১০ই মে, ক্যালগারি ট্যাগোর সোসাইটির “রবীন্দ্রজয়ন্তী”, আর ১৫ই মে শেষ হলো এসআরবি, অর্থাৎ, সেলিম রেজা ব্যান্ডের গান দিয়ে। গানের সুর-তাল-লয় ঠিক থাকলে তা শ্রোতাদের অচল করবেই, তা সেটা রবীন্দ্র-নজরুল হোক কি ব্যান্ড।
সেলিম রেজা একসময় বাংলাদেশে স্টার ছিল, গাইতো রুনা লায়লাদের মতো শিল্পীদের সাথে–সিনেমায় এবং মঞ্চে। তা, কোন দুঃখে তার প্রবাসে আসা? এই প্রশ্নের জবাব সম্ভবত কারও কাছে নেই। দুঃখ থাকলে দুঃখের নিরাময়ও আছে, না থাকলে দুঃখের দাম থাকে না।
তো সেদিনের সঙ্গীতময় সন্ধ্যায় মনে হলো, সেলিম রেজা যেন দুঃখ ভুলতেই অনেক বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো। দেড়ঘন্টারও বেশি সময় ধরে একটানা, তাও কিনা গলার স্বর কোনভাবে না কমিয়ে, চারটি খানি কথা না। শচীন দেব বর্মন, কিশোর কুমার, মান্না দে, শেখ ইশতিয়াক, মাইলস, আইয়ুব বাচ্চু, আযম খান, এবং মাঝে মধ্যে হিন্দি। মিউজিকে যারা ছিলেন, গিটার, কি-বোর্ড, ড্রাম এবং আড়ালে মিক্সিং, সব যেন এক সুতোয় গাঁথা। লাইভ মিউজিকের সব সুবিধা তখন সেলিম রেজার করায়ত্তে, তাই প্রতিটা গান নতুন করে জীবন্ত হয়ে আমাদের কাছে আসে। ক্যালগারির বাংলাদেশি ইঞ্জিনয়ারদের প্রতিষ্ঠান ’অ্যাবেক’ একটা বিশাল ধন্যবাদ পেতেই পারে। বলে রাখি, এ ছিল বহুল প্রতীক্ষিত অনুষ্ঠান, সেলিম রেজা তো বটেই, আমার জন্যও। বহুদিনের অপেক্ষা যে…
