
৯ জানুয়ারি লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে বঙ্গবন্ধুর মিটিংটি আয়োজন করেন লন্ডনে ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের হেড অব ইন্ডিয়ান ডেস্ক-এর ইয়ান সাদারল্যান্ড। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মিটিং আয়োজন সম্পন্ন করে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এটি ছিল এক অতীব প্রয়োজনীয় এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষায় অত্যন্ত কার্যকরী ও প্রতিশ্রুতিশীল মিটিং। এর আগে-পরে কোন এক সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বঙ্গবন্ধুর ফোনে কথা হয়, যা আয়োজন করে দেন লন্ডনে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এ বি পন্ত, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে অভ্যর্থনা জানানো কয়েকজনের একজন। বঙ্গবন্ধুকে আনার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে একটি ভিআইপি প্লেনের ব্যবস্থা করা হলেও পরে এডওয়ার্ড হিথের সাথে কথা বলে ইন্দিরা গান্ধী ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের একটি মিলিটারি জেটের ব্যবস্থা করেন এবং দ্বিতীয়বারে ফোনকলে সেটি তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেন। শশাঙ্ক ব্যানার্জি তাঁর লেখায় তেমনটিই উল্লেখ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে লেখা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের বর্ণনা অবশ্য একটু আলাদা। তাঁর তথ্য মতে রয়াল ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের বিশেষ প্লেনে করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটি ছিল স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর।
যেভাবেই ঘটুক, বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বের ধারণাকে মজবুত করতে সাহায্য করে। কারণ, পশ্চিমা বিশ্বে নেতিবাচক প্রচারের প্রভাবে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে ভারতের ঔপনিবেশ। শুধু তাই না, বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানকে আগ্রাসন বিবেচনা করে বহু দেশ বাংলাদেশের আবির্ভাবের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সক্রীয় অংশগ্রহনকে আগ্রাসন বিবেচনা করা হতে পারে, তেমন সচেতনতা ভারত সরকারের ছিল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এ বিষয়ে কতটা সচেতন ছিলেন তা বুঝা যায় ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় প্রবাসে সরকার গঠনের আহ্বান জানানোর ঘটনায়। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য প্রদেশে চলমান মাওবাদী গেরিলা তৎপরতাকে মাথায় রেখে সম্পূর্ণ জাতীয়তাবাদী চেতনা-নির্ভর বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা মুজিববাহিনীকে গড়ে তোলা হয়, মূলত: চীনের অভিসন্ধি থেকে মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য থেকে। মুজিবনগর সরকারের অভ্যন্তরে মার্কিন বনাম রাশিয়া দ্বন্দ্ব, সরকারের উপদেষ্টা পদে চীনপন্থী হিসেবে পরিচিতি মাওলানা ভাসানী ও সোভিয়েত-পন্থী হিসেবে পরিচিত মণি সিং-এর দ্বন্দ্ব, সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে নানাধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের টানাপোড়েন, এসব লেগেই ছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরকারের পক্ষে ঐক্য ধরে রাখা আদৌ সম্ভব হতো কি-না সেই বিষয়টি ভারত সরকারকে বিবেচনা করতে হয়েছিল। সেই বিবেচনা থেকে মুজিববাহিনী তৈরী এবং তাকে মুজিবনগর সরকারের কর্তৃত্বের বাইরে রাখা। এই ব্যক্তিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করার জন্য যা যা লাগে তার সবকিছু প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের মাধ্যমেই সম্পন্ন করেছিল ভারত সরকার। এমনকি, শেষ পর্যায়ে এসে বাংলাদেশে সামরিক অভিযানের বিষয়টি অনিবার্য হয়ে উঠলে সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে এককভাবে পাঠানোর পরিবর্তে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী গঠন করে ওই অভিযানটি পরিচালনা করেন ইন্দিরা গান্ধী। নানাভাবে চেষ্টা করেও মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বৃহত্তর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে প্রমান করা সম্ভব হয়নি। না জাতিসংঘে না মার্কিন জনগণের কাছে।
১৬ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান মিলিটারির আত্মসমর্পনের সেই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের কয়েকদিনের মাথায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার ঢাকায় এসে দায়িত্ব গ্রহন করে এবং পাকিস্তানের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামোকে একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী কাঠামোতে রূপান্তরের কার্যক্রম শুরু করে।
ওদিকে পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে লন্ডন যাত্রা এবং সেখান থেকে দিল্লী হয়ে ঢাকায় আসার পুরো পথে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ভারতীয় কুটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু তখন বঙ্গবন্ধু, ১৯৬২ সাল থেকে যিনি বাংলাদেশ নামক উদ্যোগের সাক্ষী; তা সত্ত্বেও ভারতের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সন্দেহ নামক মারাত্মক রোগ দ্বারা বঙ্গবন্ধু যেন কোনোভাবেই আক্রান্ত না হন, সেদিকে ছিল তাঁর সতর্ক দৃষ্টি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিসের সাথে বঙ্গবন্ধুর কথাবার্তা শশাঙ্ক ব্যানার্জির পক্ষে জানার কথা না; কিন্তু বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রথম সুযোগে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার সংক্রান্ত অনুরোধের পরে পশ্চিমা বিশ্বের মনোভাব অুনমান করতে তাঁর এতটুকু দেরি হয়নি।
ক্যালগেরি, কানাডা
