
এক ভাইরাল মোল্লার কমেন্ট খুব ভাইরাল হয়েছে।
সে বলেছে মাহরাম ছাড়া কোন নারীকে ধর্ষণ করা জায়েজ।
একজ্যাক্ট বয়ানটা মনে নাই, তবে উনি অনেকটা এমন বলেছেন যেসব মেয়েরা পর্দা ছাড়া ঘুরবে, ছেলেদের সাথে আড্ডাবাজি করবে, ওদেরকে কেউ ধর্ষণ করে ফেললে আগে মেয়েগুলিকে শাস্তি দিবে, পরে ছেলেদেরও দিবে।
প্রথমত, এই ভাইরাল মোল্লাকে কিন্তু বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম আলেম সমাজ পাত্তা দেয়না। যেমন, আব্দুল রাজ্জাক বিন ইউসুফ এর নাম শুনলেই বিরক্ত হয়, এর ব্যাপারে ফালতু সময় নষ্ট করেনা। এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী নিজের স্বভাবসুলভ গালাগালি করে। দুইজন এক্সট্রিম বিপরীত প্রান্তের দুই আলেমের নাম নিলাম। মধ্যপন্থী, যেমন, সাইফুল্লাহ, আহমাদুল্লাহ প্রমুখ হুজুরদের নজরেও এ একটা অযোগ্য বক্তা।
কেন? কারন দুই চারটা বই পড়ে সে বক্তা হয়ে গেছে। অথেন্টিক, জাল ইত্যাদি হাদিসের পরোয়া নাই, যা মনে আসে বক্তব্য দিয়ে দেয়।
এদিকে এর মুরিদরা মনে করে অন্যান্য হুজুররা একে হিংসা করে বলেই জেলাস। এর মুরিদদেরও মাথা নষ্ট। বোধ শক্তি নাই।
তা এই লোকের পপুলারিটি বিশাল। সেই যে বৌয়ের ভয়ে গুম হওয়ার নাটক করে দেশব্যাপী ভাইরাল হয়েছিল, এরপর থেকেই ও পপুলার। কারন সে আখেরি জমানার সবকিছু জেনে বসে আছে। কেয়ামতের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ চিরকালীন। তাই সে ভুলভাল যা খুশি বলে বলে বেকুবদের আরও বেকুব বানায়। কখনও দাজ্জালকে প্লেনের সাথে তুলনা করে, কখনও তালেবানদের মাহদীর সেনা বলে। কখনও এই আহাম্মকটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষে খুব লাফায়, কারন এতে নাকি জালিমদের পতন হবে, আর ইসলাম আবার পুরানো শান শওকত ফেরত পাবে।
তারচেয়ে বড় কথা, এ তরুণদের জিহাদের ডাক দেয়। যখন তরুণ পাল্টা প্রশ্ন করে আপনি কেন সিরিয়া/ফিলিস্তিন যাচ্ছেন না? তখন বলে “সরকার অনুমতি দিলে যাব।”
এখনতো সেই সরকারও নাই। এখনও যায় না কেন? এর দ্বিচারিতা আর ভণ্ডামি আজকের না। বহু আগের।
তা আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ মুসলিম বটে, কিন্তু নিজের ধর্মের ব্যাপারে কয়জন পড়াশোনা করে? কার আগ্রহ হয় আল্লাহর কিতাবটা খুলে একটু অর্থ সহ পড়তে? আল্লাহ যে তিরিশ পারার একটা কিতাব নাজেল করেছেন, সেটা অর্থ সহ পড়া হয় কয়জনের? যে নবীর (সঃ) প্রতি প্রেমে আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত, তাঁর বাণীগুলি কয়জনে পড়ে? তাঁর জীবনী? এই আবেগ, এই ভালবাসা খাঁটি, কিন্তু শুধুমাত্র সাধারণ বিদ্যার অভাবে একে ভুল পথে চালানো অতি সহজ।
এরই ফায়দা তোলে এইসব অল্পবিদ্যার “বক্তা নামের তক্তারা।” (এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর ভাষাতেই বললাম।)
এখন আমরা জানি, যেকোন অপরাধে অপরাধী নিজের কুকর্মকে জাস্টিফাই করে। অপরাধীর দৃষ্টিতে সে যা করে, সেটা সঠিক। কারন, বেঠিক বা ভুল হলেতো সে অপরাধ করতো না।
যেমন একটা চোর যখন চুরি করে, সে নিজেকে বুঝায় সে গরিব। এই সমাজ ওকে গরিব বানিয়েছে। ও যা কাজ করে তাতে আরও বেশি উপার্জন করার কথা, কিন্তু সিস্টেমের কারনে সে কম আয় করছে। দোষটা সিস্টেমের। সাথে যোগ হয়েছে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, পোলাপান বৌয়ের ঘ্যানঘ্যানানি। সে নিজের জন্য চুরি করছে না। সে চোর হয়েছে পরিবারের জন্য। সমাজের জন্য। নিজেকে রবিনহুড ইমেজে কল্পনা করে সে জাস্টিফাই করে।
দেশের মন্ত্রী বিদেশে টাকা পাচার করে। সে নিজেকে বুঝায় সবাই করছে, আমি কেন করবো না? আমি না করলে দেশের কত টাকাই বা বাচঁবে? উল্টা অন্য কেউ ঠিকই মেরে দিবে।
তা এই মোল্লা যেমনটা ফতোয়া দিল। এতে ধর্ষকরাও একই জাস্টিফিকেশন দিবে। “আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন মেয়েদের পর্দা করতে। ওরা করেনি কেন? ভাইরাল মোল্লাও বলেছে মেয়েগুলির শাস্তি প্রাপ্য। কেননা আমিই ওদের একটু শাস্তির ব্যবস্থা করলাম?”
অথচ একটু পড়াশোনা করলেই এই আহাম্মকগুলি বুঝতো মেয়েদের যেমন পুরুষদের সাথে আড্ডাবাজি নিষেধ করা হয়েছে, একই নিষেধাজ্ঞা পুরুষদের বেলাতেও প্রযোজ্য। ছেলেদেরও বলা হয়নাই মেয়েদের সাথে আড্ডা দিতে। তাই হুজুর হলে আমার দায়িত্ব যখন দেখবো কোথাও বেশরিয়তী বেহায়পনা চলছে, তখন সেই আড্ডা থেকে সরে আসা।
এখন আসি কুরআনের উদাহরনে। ভাল করে লক্ষ্য করুন, এবং বুঝুন। কাউন্টার যুক্তি থাকলে দিবেন।
হজরত ইউসুফকে (আঃ) উনার মনিবের স্ত্রী একা রুমে পেয়ে দরজা বন্ধ করে বলে “এসো।”
মহিলা দেখতে রূপসী ছিলেন। আমার বিশ্বাস অসম্ভব রূপসী ছিলেন। হয়তো সর্বকালের সর্বসেরা সুন্দরীদের একজন হবেন। কারন আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে হ্যান্ডসাম নবীর পরীক্ষা কোন ফকিরনী চেহারার কাউকে দিয়ে নিবেন না এইটা নিশ্চিত। এবং কুরআনেই বলা আছে মেয়েটি ইউসুফকে (আঃ) চাইতো, এবং ইউসুফও (আঃ) তাঁর কথা ভাবতেন। আধুনিক ভাষায় “ক্রাশ” যাকে বলে। সুন্দরী মেয়ে দেখে ব্যাচেলর পুরুষ মানুষের হৃদয়ে হাল্কা ধাক্কা লাগেই। এইটাতে পাপ নেই। পাপ পুন্য নির্ভর করে এর পরের পদক্ষেপে। কিভাবে, কোন উদ্দেশ্যে সেই ফিলিংকে হ্যান্ডেল করছেন।
এই মোল্লা এবং ওকে ভাইরাল করা সাগরেদরা যদি ইউসুফের (আঃ) বদলে সেখানে উপস্থিত থাকতো, তাহলে এরা বলতো, “মাহরাম ছাড়া বেডি মানুষ আমার সাথে আড্ডাচ্ছে। বেপর্দা আউড়াত! একে এর পরিনাম বুঝিয়ে দেয়া যাক।”
কিন্তু ইউসুফ (আঃ) আল্লাহর নবী। উনার ঈমান নিয়ে অন্তত কারোর সন্দেহ নেই। তিনি বললেন, “আল্লাহ রক্ষা করুন; তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমা লংঘনকারীগণ সফল হয় না।”
এবং তিনি দৌড়ে পালাতে গেলেন।
মহিলা তারপরেও নাছোড়বান্দা। ইউসুফের (আঃ) জামা টেনে ধরলেন। ছিঁড়ে গেল। ইউসুফও (আঃ) দাঁত কামড়ে প্রতিজ্ঞা করলেন, এই কঠিনতম পরীক্ষায় তিনি কিছুতেই হার মানবেন না।
মহিলা সবভাবে ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ প্রতিহিংসার কারনে তাঁকে জেলে বন্দি করলো। তবুও আল্লাহর নবী (আঃ) নিজেকে কন্ট্রোল করেছেন।
তা এই মোল্লা কুরআনে এই কাহিনী পড়েছে নিশ্চিত। সে এইটাও বলতে পারতো যে মহিলারা যেভাবেই থাকুক, মাহরাম ছাড়া, ওড়না ছাড়া, কাপড় ছাড়া, রুমের ভিতর একা – যেভাবেই থাকুক না কেন, কোন অবস্থাতেই একটা মুসলিম পুরুষ “ইল্লিগ্যাল” সম্পর্কের অন্য একটা নারীর সাথে ধর্ষণতো বহু দূরের কথা, ফ্লার্টিং, ইভটিজিং ইত্যাদি কিছুই করতে পারবে না। কথা এখানেই শেষ। কোন এক্সেপশন নাই।
তারপরে মেয়েদের ধরা হবে, বুঝিয়ে বলা হবে যে, “দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আদালতে বিচার ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের moral, ethics, চরিত্র সবই তলানিতে, কাজেই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিজেরাই সাবধান থেকো। প্রতিদিন ধর্ষণের খবর পত্রিকায় আসছে, কে জানে, কালকে তোমার খবরও আসতে পারে। তুমি সাবধানতার জন্য কি ব্যবস্থা করেছো?”
মেয়েটা তখন চিন্তা করবে, নিজেই সাবধান হবে। সে নিজে সিদ্ধান্ত নিবে কার কার সাথে মিশবে, কাকে কাকে বাদ দিবে। ঘরে থাকবে নাকি বেরোবার সময়ে মরিচের স্প্রে, পিস্তল, ছুরি, হাতুড়ি, চুলের কাটা, ব্লেড ইত্যাদি হাল্কা অস্ত্র বহন করবে। সিদ্ধান্তটা তার।
