
নিত্যদিন তুষারের সহিত যুদ্ধ করিয়া এক প্রকার ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি । বহুবার মনে হইয়াছে হাল ছাড়িয়া এক প্রকার নিষ্ক্রিয় হইয়া দীর্ঘ সুখ নিদ্রার হস্তে নিজেকে সমর্পন করিয়া দেই কিন্তু সংসার নামক ঘূর্ণয়মান চাকাটি থামিবার বস্তু নহে । থামিয়া যাইবার অর্থই হইতেছে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিয়া লওয়া । চলমানতাই জীবন , স্থবিরতা মৃত্যু ।
কানাডা নামক দেশটিতে আসিবার পূর্বে কিঞ্চিৎ ধারণা পাইয়াছিলাম ইহা একটি শীতপ্রধান দেশ কিন্তু শীতের তীব্রতা কি প্রকার হইতে পারে তাহা শারীরিকভাবে অনুভব না করিলে বুঝিবার উপায় নাই প্রকৃত শীতের ভয়াবহ রূপটি কি নির্মম হইতে পারে । দেশে থাকিতে মাঘের শীতে ব্যাঘ্র পলাতক হয় বলিয়া শুনিয়াছি , এক্ষণে এই দেশে ব্যাঘ্রের কি অবস্থা হইতে পারে তাহা ভাবিয়া শংকিত হইতেছি ! বোধ করি এই হেতুবশতঃ দেশটি ব্যাঘ্র শূন্য হইয়া রহিয়াছে । দেশটির উত্তর মেরু প্রদেশে কদাচিৎ শ্বেত ভুল্লুকের দেখা পাওয়া যায় বলিয়া শুনিয়েছি কিন্ত ব্যাঘ্র শাবকের দর্শন একমাত্র লায়ন সাফারি পার্ক ব্যতীত অন্য কোথাও দেখিতে পাইয়াছি বলিয়া বোধ হয় না।
শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা অসহনীয় মনে হইলেও তুষারের মনোরম রূপ অবলোকনে কোনরূপ ক্লেশ অনুভব হয় না । ইহা যেন প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি । এহেন শ্বেত-শুভ্র এবং স্নিগ্ধ রূপ অবলোকনে বিরামহীন আনন্দ পাইয়া থাকি । ইহারা যখন ধরণীতে পতিত হইয়া কর্দমাক্ত হইয়া শ্বেত শুভ্র রূপ হারাইয়া ফেলে তখন এক প্রকার দুঃখবোধ হয়। এক সময় তাপ মাত্রার প্রকোপে দ্রবীভূত হইয়া হারাইয়া যায় । তুষারের আগমন এবং বিদায়ের মধ্যে এক প্রকার জীবনবোধ রহিয়াছে । শুভ্র তুষার শান্তি , স্নিগ্ধতা আর পবিত্রতার রূপক হিসাবে আমার অন্তকরনে ধরা দিয়া থাকে । ইহারা যখন কর্দমাক্ত হইয়া দ্রবীভূত হইতে থাকে তখন মনে হয় জড়া, ব্যাধি ইহাদিগকে গ্রাস করিয়াছে এবং ক্রমে মৃত্যুর দিকে পতিত হইতেছে ।আমাদের জীবনও ঠিক অনুরূপভাবে আবর্তিত হয় । পেঁজা তুলার ন্যায় আকাশ হইতে যখন তুষার চতুর্দিক দিয়া পতিত হইতে থাকে তখন মনে হয় ইহাকে স্পর্শ করিয়া ইহার স্নিগ্ধতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করি , ইহার শুভ্রতাকে নিজের অন্তরে ঠাই দেই ।
দেশটির দীর্ঘ শীতের অবস্থান অনেক সময় বিষণ্ণতার যোগ আনিয়া একাকীত্বকে আহ্বান করে । দীর্ঘ সময় বহির্গমনের বিরূপতা মানুষকে এক প্রকার গৃহকোণে আবদ্ধ রাখিয়া হতাশার গভীরে নিমজ্জিত করিতে পারে । ইহা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে অধিক অনুভূত হয় । সংসারের মধ্যে থাকিবার পরেও এই একাকীত্ববোধ আসিয়া আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতে পারে । ইহা হইতে পরিত্রানের আশায় অনেকেই নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করিবার নজির রহিয়াছে তবে ইহার পরিসংখ্যান আমার নিকট গচ্ছিত নাই ।
এখানে আসিবার পর এগারো বৎসর, এগারোটি শীত দেখিয়াছি , অনুভব করিয়াছি , শিখিয়াছি , অভিজ্ঞ হইয়াছি । জীবন যুদ্ধের মধ্যে কষ্ট, ক্লেশ , ক্লান্তি থাকিলেও সুখ এবং আনন্দও রহিয়াছে । প্রতিটি যুদ্ধ মানুষকে সম্মুখের দিকে অগ্রসরের পথ করিয়া দেয় । জীবন যুদ্ধে জয়ী হইয়াই মানুষ জীবনকে প্রতিনিয়ত ভবিষ্যতের গন্তব্যের দিকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে । কাহারো জীবন-তরী তীরে ভিড়িতে পারে আবার কাহারো তরী তীরে ভিড়িতে পারে না । ইহা লইয়া আক্ষেপের কিছু নাই । জীবনকে তাহার নিজস্ব ধারাতেই ছাড়িয়া দিতে হইবে ।
প্রথম যেদিন এই দেশটিতে উড়োজাহাজ হইতে অবতরন করিয়াছি তখন হইতেই দেশটিকে ভাল লাগিয়া গিয়েছিল । পিয়ার্সন বিমানবন্দরে নামিয়া ইহার চাকচিক্য দেখিয়া হতচকিত হইয়াছি । নিজেকে মনে হইয়াছে গ্রাম্য বালক গ্রাম হইতে ঢাকা নগরী দিখিতে আসিয়েছে । এয়ারপোর্টের প্রশস্থ সড়ক ধরিয়া যখন আমাদের গাড়ি সম্মুখে আগাইয়া যাইতেছিল তখন একটির পর একটি সুরম্য অট্টালিকা , গাছগাছালি শোভিত পার্ক, সুন্দর সুন্দর বিপণী বিতান , সড়ক পথে বিচিত্র সব যানবাহন দেখিয়া মন্ত্র-মুগ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলাম । সব চাইতে ভাল লাগিয়াছিল , সড়ক পথে যানবাহনগুলি সুশৃংখলভাবে আগাইয়া যাইতেছে । লাল বাতি দেখিলে থামিয়া যাইতেছে আবার সবুজ বাতি দেখিলে আগাইয়া যাইতেছে । এমন দৃশ্য আমি আমার দেশে দেখিতে পাই নাই । আরো মুগ্ধ হইয়াছি বিচিত্র আর নানা বর্ণের মানুষ দেখিয়া । ইহারা একে অন্য হইতে পৃথক হইলেও কাহারো সহিত কাহারো বিরোধ , বিসংবাদ নাই , সকলেই নিজেকে লইয়া ব্যস্ত রহিয়াছে । তখন হইতেই বুঝিয়াছি , এই দেশটিই আমার জন্য উপযুক্ত স্থান । আমি নিয়ম শৃংখলা ভালবাসি । ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম , বিশৃংখলা আমার মজ্জাগত নহে বিধায় এমন একটি সুশৃংখল দেশে আসিয়া যার পর নাই আনন্দিত হইয়াছি । ইহার বিনিময়ে অন্য সকল ক্লেশ কষ্ট ভুলিয়া গিয়েছি।
এগারো বৎসর অতিক্রান্ত হইবার পর আমার দেহ এবং মননে শীতের তীব্রতার অভ্যস্ততা গড়িয়া উঠিয়াছে । এগারোটি শীতকাল , এগারোটি বসন্ত অতিবাহিত হইবার পর আমার মধ্যে নিয়মের বর্ম গড়িয়া উঠিয়াছে । বিপণী বিতানে লাইনে দাঁড়াইয়া থাকিলে লাইন ভাঙ্গিতে কোন রূপ কুমন্ত্রণা অনুভব করি না । গাড়ি চালাইবার সময় মনে হয় না সিগন্যালের কোনরূপ ব্যত্যয় ঘটাই । কোন কিছুর আবেদনে বিলম্ব হইলেও ঘুষের অর্থ আগাইয়া দেই না। সন্তানের লেখাপড়ার জন্য কোনরূপ দেন-দরবার করি না ।কাজে কর্মে অহেতুক তৈলের ভান্ড খুলিয়া বসি না । নিজের কর্ম নিজে করিয়া সুখ অনুভব করি । অহেতুক মোসাহেবিপনা করিয়া সময় নষ্ট করিবার হেতু খুজিয়া পাই না । মানুষ গুলির মধ্যেও শৃংখালাবোধ, ভদ্রতা জ্ঞান দেখিয়া পুলকিত হই । সুন্দর দেশটির নানা জায়গা ভ্রমণে যেটুকু আনন্দ প্রাপ্ত হই তাহাতে সারা বৎসরের কর্মের জ্বালানী সঞ্চিত হইয়া কর্মের ক্লেশ ভুলিয়া যাই । নতুন উদ্যোমে কর্ম সম্পাদনের শক্তি পাই ।আরো ভাল দিক হইতেছে , আমি শুধু সরকারকেই ট্যাক্সের অর্থ দিয়া থাকি ,অন্য কাউকে ট্যাক্স দেওয়ার কোন প্রয়োজন অনুভব করি নাই এবং না দিলেও কোন ক্ষতি নাই বলিয়া শিক্ষা লাভ করিয়াছি ।
এমন দেশটিতে থাকিতে পারিয়া আমি গর্বিত । জীবনে একটিই মাত্র আকাংখা রহিয়াছে , নিজের প্রজন্মকে সঠিক স্থানে স্থাপন করিয়া দিয়া বিদায় লইবো । এই ইচ্ছার কারনেই এত দূর পথ পাড়ি দিতেও কুণ্ঠিত হই নাই । আমি জানি আমার প্রজন্ম এক সময় তাহার জীবন-যুদ্ধে আমাদিগকে স্মরণ করিবে , বলিবে , আমার প্রথম প্রজন্ম আমাকে এই দেশটিতে আনিয়েছিল , তাহারা আমার সাফল্যের জন্য কষ্ট করিয়াছে , দিনের পর দিন অনিদ্রা ,ক্লেশে-ক্লান্তিতে কাটাইয়া দিয়েছে । তাহাদের জন্যই আজ আমার , এই আমি ।
আমি এক সময় ধরণীর ধূলি-বালির মায়া ত্যাগ করিয়া গেলেও আমার স্মৃতি , কর্ম বাঁচিয়া থাকিবে আমার প্রজন্মদের সাফল্যের মধ্যে ।
স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা
