
মাথার উপর নীল রঙের দুটো হেলিকপ্টার উড়ছে। ঝকঝকে রয়েল ব্লু। দেখে মনেহয় একজোড়া নীল গোয়ালা ফড়িং। ক্রমাগত চক্কর দিচ্ছে আকাশে। একটা উড়ে গেলো সাগরপানে। সাগরতুল্য লেক মিশিগানের নীল জলের উপর। আরেকটা ভন ভন করে আমাদের দিকে। যান্ত্রিক ঘড়ঘড় শব্দে স্থির দাঁড়িয়ে পড়লো। আকাশচুম্বী ঘিঞ্জি দালানের কোনো এক ছাদে। তারপর এপাশ ওপাশ বাতাস ছড়িয়ে ল্যান্ড করলো হিল্টন হোটেলের রুফটপে।
বাবা, দেখো বিল্ডিংটা ভেঙে ফেলবে।
না, ভাঙবে না মা। ভেতরে হোটেলের গেস্ট আছে। হয়তো এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছে।
লেকের পাড়ে পার্কে বসে আনমনে হেলিকপ্টারের দৃশ্য দেখছিলাম। ৬ বছরের কন্যার কথায় সম্বিৎ ফিরে আসে। আবারো প্রশ্ন, সব হোটেলেই আছে? বললাম না, সব হোটেলে নাই।
কেনো নাই বাবা?
তুমি বুঝবে না মা। এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাপার।
বাণিজ্যিক কি বাবা?
এ্যাতো কথা বলো না তো! চলো এখন আমাদের হোটেলে যাই।
না, আমি আরো হেলিকপ্টার দেখবো।
আজ আর কোনো হেলিকপ্টার নামবে না মা।
মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে রুমুকে বললাম গাড়িতে ওঠো। ডেভন এ্যাভিনিউয়ে একটা পরিচ্ছন্ন বাঙালি রেস্টুরেন্ট পেয়েছি। ওখানে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করবো।
জিপিএসে এড্রেস সেট করে গাড়ি ছুটলো শিকাগোর দেশী পাড়া ডেভনের দিকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ নগরীগুলোর মধ্যে শিকাগো একটু অন্যরকম। নিউ ইয়র্কের মতো অতি ব্যস্ত নয় আবার লস এঞ্জেলেসের মতো ঝকঝকেও নয়। হালকা দারিদ্রের ছাপ আছে। সেটাও কেবল বিশেষ কিছু এলাকায়। কারণটা সম্ভবত নিকট অতীতের অর্থনৈতিক মন্দা। সুপেয় জলের পঞ্চ গ্রেটলেকের একটির নাম লেক মিশিগান। এরই তীরে অদ্ভুত সুন্দর এক ডাউনটাউন। শিকাগো ডাউনটাউন। সেটার আকার আবার এতো বড় যে কয়েকটা ‘টরন্টো ডাউনটাউন’ গিলে খেতে পারে।
ডাউনটাউনের পেট চিড়ে চলে গেছে আঁকা বাঁকা সর্পিল নদী। নাম শিকাগো নদী। সরু নদীর দু’পাড়ে সুউচ্চ ভবনের বেশির ভাগই সরকারি ও বেসরকারি কর্পোরেট অফিস। অফিস পাড়ার মানুষগুলো বেশ ভাগ্যবান। জোছনা রাতে বাড়ি না ফিরে অফিসে বসে টলটলে জলে চাঁদের ছায়া দেখে।
নদীর দুকুল উপচে পড়া ভবনের একটু বাইরে ডাউনটাউন লুপের কেন্দ্রস্থলে অতিকায় একটি ভবন দাঁড়িয়ে। ১০৮ তলা ভবনটির উচ্চতা সাড়ে চৌদ্দশো ফুট। দেখলে মনে হবে অনেকগুলো ভবনের সমষ্টি। আসলেই তাই। কারণ এর স্থপতি ও প্রকৌশলী ‘সমষ্টি-পদ্ধতি’ ব্যবহার করেই ভবনটি বানিয়েছিলেন। পদ্ধতিটিকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘বান্ডেল টিউব কনসেপ্ট’। এই কনসেপ্টের স্রষ্টা বাঙালির গর্ব শ্রেষ্ঠ বাংলাদেশী প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান। এফ আর খান নামেই যিনি বেশি পরিচিত। ১৯৭৩ সালে নির্মান শেষে এটি বিশ্বের উচ্চতম ভবনের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সগর্বে দাঁড়িয়ে ছিলো বিশ্বের উচ্চতম ভবন হিসাবে। শুরুতে এর নাম ছিলো সিয়ার্স টাওয়ার। ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ‘উইলিস গ্রুপ’ ভবনটির ৩৮ লাখ বর্গফুটের মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী লিজ নেয়। শর্ত থাকে কর্তৃপক্ষ ভবনের নাম বদলে উইলিস টাওয়ার রাখবে। সেই থেকে এটি হয়ে গেলো ‘উইলিস টাওয়ার’।
বর্তমানে টাওয়ারটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় উচ্চতম ভবন। মাত্র ক’বছর আগে ২০১৩ সালে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার-ওয়ান’ পুনর্নির্মিত হলে এর উচ্চতা উইলিস টাওয়ারকে সামান্য অতিক্রম করে। ‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’র স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার বিখ্যাত প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান WSP (ডব্লিউ.এস.পি গ্রুপ, জীবিকার তাগিদে আমি যেখানে কর্মরত)।
শিকাগো বেড়ানোর সময়টা ইচ্ছে করেই ‘লেবার ডে’তে করেছিলাম। সেও আরেক কাহিনী। সারা দুনিয়ায় লেবার ডে মানে মে মাসের প্রথম দিন। ইউএস-কানাডায় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার। শ্রমিক আন্দোলনের সূতিকাগারে শ্রমিক দিবস কিভাবে পালিত হয় সেটি দেখার আকাংখা যে কারুরই হতে পারে। আমারও হয়েছিলো। তবে ভীষণ হতাশ হতে হয়েছে এ ব্যাপারে। শ্রমিক দিবস শিকাগো শহরে কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতায় ছুটির দিন। এর বেশি কিছু নয়। সে যাকগে, প্রথম এজেন্ডা ছিলো সিয়ার্স টাওয়ার দর্শন। সেটা পূর্ণ করেছি ষোলো নয়, আঠারো কলায়।
ফেরার পথে স্যুভেনির কেনার পালা। শিকাগো ডাউনটাউনে প্রচুর স্যুভেনিরের দোকান। এমনিতে শিকাগো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নগরী। শিকাগোর ইতিহাস মানে আমেরিকার ইতিহাস। ক্রীতদাস থেকে নাগরিক হয়ে ওঠার ইতিহাস। শ্রমিক অধিকার আদায়ের ইতিহাস। এমন শহরে রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক স্যুভেনিরের অভাব হওয়ার কথা নয়। এছাড়া সাগরসম লেক মিশিগানের পাড়ে গড়ে ওঠা চোখ জুড়ানো স্থাপত্য রয়েছে। বিশ্বখ্যাত শেড একুইরিয়াম, শিকাগো বাতিঘর, প্ল্যানেটরিয়াম, সোলজার ফিল্ড স্টেডিয়াম ইত্যাদি। এর যে কোনটির ক্ষুদ্র রেপ্লিকা চমৎকার স্যুভেনির হতে পারে। কিন্তু সব দোকান দেখি একই স্যুভেনিরে ঠাসা। শত শত হাজার হাজার। বিভিন্ন ডিজাইনের সিয়ার্স টাওয়ার। নানা রকম ম্যাটেরিয়ালে তৈরী। মাটি, সিরামিক, কাঁচ, মেটাল এমন কি স্বর্ণের তৈরী সিয়ার্স টাওয়ার। বিশালাকার কাব্যিক পেইন্টিংও আছে সিয়ার্স টাওয়ারের। দু’তিন দোকান ঘুরে এক আইরিশ-আমেরিকানের দোকানে ঢুকলাম। স্থুলকায় বৃদ্ধ লোকটাকে কেনো জানি পছন্দ হলো। নাম রোনান ফ্ল্যাটলি।
‘সিয়ার্স টাওয়ারের রেপ্লিকা এতো বেশি রাখেন কেনো?
বেশি বিক্রি হয় তাই।
অন্য কিছু হয় না।
হয়। তবে সিয়ার্স টাওয়ারের সেল অনেক বেশি।
এর কারণ কি?
টুরিস্ট শিকাগোতে আসেই সিয়ার্স টাওয়ার দেখতে। এর ১০৩ তলার স্কাই ডেকে দাঁড়িয়ে পুরো শহর দেখে। যাবার সময় এর একটি রেপ্লিকা স্যুভেনির হিসাবে নিয়ে যায়।
দোকানি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি কি ইন্ডিয়ান? একটু গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘না, বাংলাদেশি’।
ওহ মাই গড, ডু ইউ নো হু ইজ দ্য ডিজাইনার অব দিস বিল্ডিং? ওর প্রশ্নের ভঙ্গি দেখেই আমি বুঝে গেছি ও কি বলতে চাইছে।
ইচ্ছে করেই বললাম, ব্রুস গ্রাহাম।
রোনান মাথা এপাশ ওপাশ করলো। বললো, নো। এর ডিজাইনার এফ.আর. খান। ডোন্ট ইউ নো দ্যাট? হি ওয়াজ ফ্রম ইওর কান্ট্রি।
বুক ভর্ত্তি করে বাতাস নিলাম। বললাম, আমি জানি। কিন্তু তিনিতো এর স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আর্কিটেক্ট ছিলেন ব্রুস গ্রাহাম। পৃথিবীর সব ভবনের স্থপতির নামই মানুষ মনে রাখে। প্রকৌশলীদের কথা……..।
রোনান মাঝপথেই থামিয়ে দিলো আমাকে।
জানি সেটা। তবে এ ভবনটি একটু ব্যাতিক্রম। আকাশচুম্বী ভবনের অভিজ্ঞতা ব্রুসের ছিলোনা। বান্ডেল টিউব কনসেপ্ট এফ. আর খানের দেয়া। সে কারণে স্থাপত্য নকশায় গোটা ভবনটিকে একাধিক ভবনের বান্ডেলে বিভক্ত করার মূল পরিকল্পনাও তাঁর।
আশ্চর্য ! তুমি এতো কিছু জানো কি করে?
স্কুলে (বিশ্ববিদ্যালয়ে) আমি আর্কিটেকচার পড়তে গিয়েছিলাম। টিউশন বেশি হওয়ায় ছেড়ে দিয়ে আমেরিকান স্টাডিজ পড়ি। কিন্তু সভ্যতা আর স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে রোজই পড়াশুনা করি।
হুম, তোমাকে দেখে অবশ্য বেশ পড়ুয়াই মনে হয়।
হা হা… তাই! বুর্জ খালিফা টাওয়ারও যে বান্ডেল টিউব পদ্ধতিতে তৈরী, এটা বুঝতে কিন্তু পড়াশুনা লাগেনা!
কেনো?
ভালো তাকিয়ে দেখো, বুর্জ খালিফা কেবল ছোটবড় ক’টি টিউবের সমাহার।
জানি রোনান। এফআর খান যে কন্সালটিং ফার্মে কাজ করতেন, সে ফার্মই ডিজাইন করেছে বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফা।
হ্যাঁ.. বিশ্বে মেগা স্কাইস্ক্রাপার নির্মানে প্রায় প্রত্যেকটি ভবন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মিস্টার খানের থিওরিতে বানানো। স্যালুট!
ফোনের ঘড়িতে বেলা সোয়া বারো। শিকাগো থেকে টরন্টো সাড়ে আট ঘন্টার ড্রাইভ। আর দেরী করা ঠিক না। সিরামিক আর কাঁচের তৈরী দুটো সিয়ার্স টাওয়ার কিনে দ্রুত পয়সা মেটালাম। বেরিয়ে যাবার সময় রোনান জানতে চাইলো গাড়ি কোথায় রেখেছি।
৩১১ সাউথ ওয়াকারের পে পার্কিংএ। সিয়ার্স টাওয়ারের দক্ষিনে।
গুড, নিরাপদ জায়গা। আমিও মাস চুক্তিতে রাখি। প্রতিদিন বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সিয়ার্স টাওয়ার দেখি আর এফ.আর. খানের কথা মনে করি।
সূর্য মাথার উপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে। শিকাগো ছেড়ে বেড়িয়ে আসছি। হাইওয়ে আই-৯০ ইস্ট ধরতে হবে। ইচ্ছে করেই ওয়েস্ট ধরে উত্তর দিকে গেলাম। আবার আই-৯০ ইস্টে ফিরে এলাম দক্ষিনে নামবো বলে। যাতে ফেরার পথে হাইওয়ে থেকে সিয়ার্স টাওয়ার দেখতে পারি।
গাড়ি ছুটছে। সেপ্টেম্বরের ঝকঝকে রোদ। আর্ট আর আর্কিটেকচারে ভরা ডাউনটাউন ভেদ করে বিশাল এক্সপ্রেস হাইওয়ে। হাতে শক্ত করে ধরা স্টিয়ারিং। দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সিয়ার্স টাওয়ার। কয়েক সেকেন্ডে কাছাকাছি। ফের দূরে। গাড়ি ছুটছে। সিয়ার্স টাওয়ার এবার পেছনে। ক্রমশ পেছনে। এতো উঁচু যে রিয়ার ভিউ মিররে পুরোটা ধরেনা। কেবল মাথা দেখা যায়। মনে হলো কোনো বাঙালির মাথা সগর্বে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে শিকাগো শহরে।
টরন্টো, কানাডা
