
এক
সংসারের চাল,ডাল ,নুন,তেলের সাথেও আরো কত কিযে লাগে।আর এই শীতের দেশে বাজার করাটা একটা ঠ্যালাঠেলির ব্যাপার হয়ে যায় মাঝে মাঝে। যদিও রাশীকের বাবা বাজার করতে চায়না অনেকদিন। কারন আছে,বাসায় আসলেই রাশীকের মা প্রশ্ন করে ,এইটার দাম কত,ওইটা এত দাম দিয়ে আনলা কেনো, রিসিট কই? সত্যি বলতেছো? এইসব নানা কিছু।
রাশীকের বাবা জীবনেও কোন কিছুর দাম দেখে কেনে না,কিনবেও না,যা দরকার নিয়ে চলে আসবে। এটুকু পড়েই অনেকে ভাবতেও পারেন আমি ভীষন কিপটা। ব্যাপারটা ঠিক তা না। এইসব দেশে পাশাপাশি স্টোর এ একই জিনিসের দাম এত ভিন্ন দাম এ পাওয়া যায়। তাই আমার ক্ষেত্রে আমি sale দেখে জিনিস কিনি। সেক্ষেত্রে রাশীকের বাবার বলার মত ,লাভ যে করিনা তা কিন্তু ঠিক। কিন্তু মনের শান্তি পাই। দেখা যায় লিস্টের বা প্রয়োজনের ১০ বা ১৫ টা জিনিস কিনতে যেয়ে ৩০ রকম জিনিস কিনে এনেছি। এবং অনেকক্ষেত্রের ওর চেয়ে বেশিই খরচ করে এসেছি। গ্রোসারী করতে যেয়ে নিজের চেয়ে অন্যের শপিং ট্রলির দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে অবাক হই? এত কিছু লাগে নাকি? কতদিন পরপর বাজার করে এরা। আমার এক পরিচিত প্রতিবেশি মহিলা বলেছিল ,ওর সাতটা বাচ্চা। প্রতি সপ্তাহে ও দুইবার গোসারী করে, এতেও হয়না। তিনদিন না যেতেই ছেলেমেয়েরা খাবার খুঁজতে শুরু করে ফ্রিজ ,বাহির সবখানেই খালি হয়ে যায় সব।
আমার বাসায় দুই ছেলে। আমি গত সপ্তাহে হাড় কাঁপানো শীত এ বের হয়নি। ভাবলাম যা আছে চলুক। শুক্রবার থেকে শুরু করে দেখি ,দুই পুত্রই ফ্রিজ এর সামনে একটু পর পর এসে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে। কিচেন কেবিনেট খুলে দাঁড়িয়ে থাকে। আমার দিকে চোখ পড়লে হাসে। বড়জন তো নিজেই এটা সেটা ম্যানেজ করে। রাইয়ান পুরাই অসহায় চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। ওর বেশি বেশি ক্ষুধা পায়।পিউবারটি টাইম তাই। আচ্ছা পিউবারটি টাইম কতদিন চলে বাপ?
দুই
পরশু বিকাল এ গ্রোসারী করেছি। আর মাছ মাংস র জন্য বেইজমেন্ট এর ফ্রিজটা নতুন করে পরিষ্কার করেছি আমি আর রাশীকের বাবা গত সপ্তাহে। গতকাল সকাল থেকেই মন্ট্রিয়ল যাবো ভাবছি।বাজার করা উদ্দেশ্য আর আমাদের গাড়্রির আড্ডাও কারন। দুই ছেলে ম্যানচেস্টার এর খেলা দেখায় ব্যস্ত। ওদের বাবাও দেখি ওদের সাথে জমে গেছে। খেলার গোল হতে না হতেই সেই ছেলেদের সাথে আগে চিৎকার করে,গোওওওওল। সকালে নাস্তা দেরীতে হওয়াতে লাঞ্চ একটু গুছিয়ে বের হবো দুজনে। রাতে দুইভাই স্কিপ ডিশ এ অর্ডার করে খাবে বলে। আমি বলি দরকার নাই,রাতের খাবার ও রেডি আছে ফ্রিজ এ। রাশীক দেখি ,রাইয়ানকে বলছে,শেয়ার ইয়র মানি। আমি রাইয়ানকে বলেছি,জীবনে রাশীককে টাকা দিবিনা। বড়ভাই হয়েছে,সারাজীবন তোকে দেখবে। দুইজনই হাসে। রাশীক,রাইয়ানকে একা পেলে ঠিক এই কথাটাই বলি,সারাজীবন ভাইএর পাশে থাকবি। আমরা যখন থাকবোনা,তোমরা দুই ভাই থাকবা একে অন্যর পাশে।
মন্ট্রিয়ল রওনা দিলেই রাশীকের বাবা সবসময় আমাদের খুব কাছের বন্ধুদের নাম বলতে শুরু করে,যাদের কারো কারো সাথে অজস্রবার মন্ট্রিয়ল যাওয়া আসার স্মৃতি রয়েছে।আর মন্ট্রিয়ল যেতে আমরা দুজন পছন্দ করি।দারুণ একটা ড্রাইভ হয়। আর শুধু তা না ,একটানা দুইঘন্টা কথা বলার এমন সুযোগ তো পাওয়া যায়না। মন্ট্রিয়ল যাবার সময় ও কত কথা বলছিল।বারবার বলা কথাই নতুন করে।
“মন্ট্রিয়ল এ থাকতাম ১৯ বছর আগে, এই উনিশ বছরে কতবার ওখানে গেছি? রাশীকের বাবা বলে ও চোখ বন্ধ করে গাড়ি চালাতে পারবে। কোন রাস্তায় পুলিশ থাকে,কোথায় বিশাল বাক খেয়ে গেছে পথ। প্রতিবার শেখায়,বলে কোনদিন একা আসতে হয় যদি,জেনে রাখো। আচ্ছা রাস্তার বাক কি কবিতার লাইন যে শিখে রাখতে হবে? চুপ থাকি,বুঝে ফেলে।বলে, না এমনি বলে রাখলাম আর কি! কে জানে কখন কাজে লাগে !
আমি বলি,বলো, ‘এই পথ যদিনা শেষ হয়’ গান না গেয়ে এই সবই বলো। কি আর করা!”
ও হাসে। ওর প্রিয় শিল্পীর বারী সিদ্দিকীর গান গায়।গলা ছেড়েই,”আমি তোর পিরিতের মরা তুই চাইয়া দেখনা এক নজর বন্ধুরে অপরাধী হইলেও আমি তোর তোর রে বন্ধু অপরাধী হইলেও আমি তোর”।
রেডি হচ্ছি ,মিনুর ফোন আসে। বলি বাজার করতে যাচ্ছি মন্ট্রিয়ল। মিনুকে বলি,চলেন এই শীতে,সবাই মিলে নায়েগ্রা যাই। রাশীকের বাবার সাথে গাড়িতে আড্ডা। আমরা অনেক গল্প করি। আমাদের জীবন,আমাদের চেনা জগত,বনধু বান্ধব,স্মৃতি,আনন্দ,দুঃখ, আমাদের জীবন যুদ্ধ,ছেলেরা,পরিবার,দেশ ,বাবা মা আরো কত কি?
নীলা আপার সাথে কথা হয়। জানান,গতকাল মন্ট্রিয়ল এ গেছিলেন। ও চুপ হলে গান ও শোনাই। মন্ট্রিয়ল যাবার আনন্দটাই অন্যরকম। বের হবার আগে ও মামুনভাইকে ফোন করেছিল। আমাকে বললো তুমি দেখো কারো সাথে দেখা হবার থাকলে বলো,নামিয়ে দেবো। রানাভাবীকে হুট করে ফোন করে পাবোনা। রবিবার এ মন্ট্রিয়ল এ নানা আয়োজন থাকে। বাবুভাই বললো, আজ অটোয়া থেকে হাইকমিশনের মাননীয় হাইকমিশনার থেকে শুরু করে আরো অনেকে গিয়েছেন। আমরা গ্রোসারী করতে এক দোকানে ঢুকলাম। ইলিশ মাছ দেখি ৩ টা কিনলে ৭৫ ডলার। আমার পাশেই আর একটা বাংলাদেশী কাপল। আমি একা দেশের মাছ খাই তিনটা কিনে কি করবো ভাবছি। সেই কাপল বললো চলেন একসাথে কিনে,ভাগ করে নেই। আমি দুইটা, উনারা একটা। বেশ মজার ব্যাপার। অটোয়া থেকে এসেছি শুনে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিচিত বের হয়ে গেলো। পৃথিবীটা আসলে বেশি ছোট ,এটা কতবার যে মনে হয়েছে আগে।আজো হলো!
‘আপ্যায়ন ‘ নাম এ একটা বাংলাদেশি রেস্তোরা হয়েছে ,৪২ সীট এর। এর আগেও বাবুভাই,তোফিকভাইদের সাথে বসেছি। ভাবলাম সমুচা আর চা খাবো। পরে দেখি ও মোগলাই পরোটার অর্ডার দিয়েছে।
মাসুদভাই আসলেন একটু পর। তুহিন ভাই অক্টোবর এর ১৯ এ চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। মাসুদভাই এর ছোটবেলার বন্ধু তুহিন ভাই। একইপাড়ার। তুহিন ভাইকে নিয়ে আমাদের কত স্মৃতি এই মন্ট্রিয়ল এ। কত আড্ডা আমাদের বাসায়,হেলালদের বাসায়।মামুনভাই এর বাংলাবার্তায়।
ডুরেশর এর Tim Horoton এ বসলাম এরপর। আজম ভাই সহ আরো অনেকের সাথে দেখা হলো। নিয়মিত এখানে আড্ডা হয়। মন্ট্রিয়ল এর এই জায়গাটা চোখের সামনে বদলে গেছে। পার্ক মেট্রোর কোনায় Loblaws টা দেখলে কত স্মৃতি এসে পরে।হাসানভাই নাম এজনের সাথে পরিচয় হলো ,বড়ভাইদের বয়সী। চুপ করে কথা শুনছিলেন। আরো একজন বন্ধুর সাথে পরিচয় করালেন মাসুদভাই। সংসার বিপর্যয় এর মুখে। উনার মুখে উনার দিকটা শুনলাম,সাংসারিক সব গল্পের অন্য দুইটা দিক থাকে। স্বামী স্ত্রী ছাড়াও সন্তানদের দিক।
আমি শুধু বললাম বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে একসাথে থাকার কোন মানেও হয়না এটা সত্যি। কিন্তু বাচ্চাদের বাবা মা মিলেই অনেক সময় সামলানো যায়না,অন্ততঃ এই বিদেশ বিভূই এ যখন সব কিছু নিজেদের করতে হয়। শুধু একাই মা বা বাবা পারতো সব সামলাতে,তাহলে বাবা বা মাকে এক্সেস ও দিতোনা বাচ্চার সাথে দেখা করতে। মন্ট্রিয়ল এ আসার আনন্দ,বন্ধুদের সাথে দেখা হবার আনন্দ,এখানে পথ এ হাঁটার আনন্দ কেমন ম্লান হয়ে গেলো। আমি একজন বাবার চোখে,কথাবলায় সব হারানো দেখছিলাম। উনি বলছিলেন,রাতের পর রাত উনার ঘুম আসেনি বাচ্চাদের ছাড়া। এই শোকটা আসলে আইনের কারনে বাবাকেই সামলাতে হয়। ১৮ বছর এর পর সন্তানরা ডিসিশান নিতে পারে সে কার কাছে যাবে,ততদিনে সেই বাবার মনে কি এই শোক আর থাকে? রাতের পর রাত এর চোখের জল?
এই বিদেশে এসে যত কান্না আর কষ্ট দেখেছি সংসার ভাঙার। ২৩ বছর পর ছেলেদের ফিরে আসতে দেখেছি বাবার কাছে,সেই একলা বাবা যে দিনের পর দিন একা থেকেছে। যেই বাবাকে দরকার ছিল খেলা দেখে গোল বলে চিৎকার করার জন্য, গাড়ি চালানো শেখার জন্য,বন্ধুদের গল্প বলার জন্য,বেড়াতে যাবার জন্য। নিজেদের মারাত্মক কোন সমস্যা নেই অথচ ছোট ছোট ইগোর জন্য এই যে অসহায় অবস্থা। মা চড় দিলে সেইছবি তুলে রাখেননা বাবা।বাবার চড়ের ছবিটা তুলে রেখে আইনগত ব্যবস্থা নেবার আগে আর একবার ভাবতেই পারি। বাবার শাস্তি হয়েই কিন্তু শেষ হয়ে যাবেনা। বাবা যে একজন এবিউজার ,এর জের বয়ে বেড়াতে হবে সন্তানদের ও। একটা চড়ের এমন ক্ষমতা,জেনারেশন পর জেনারেশন চলবে এর জের। ভালোবাসার শক্তিতে যে সংসার এর শুরু হয়,সন্তান হয় জন্ম হয়।আনন্দ হয়। ঝগড়া হয়। তুচ্ছ তুচ্ছ ক্ষোভ,বিরোধ এর জের এই ভাঙতে শুরু করে ভালোবাসা, সেই ভাঙন পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফের ধ্বস থেকেও মারাত্মক। এক সাথে থাকার জন্য অনেক কারণ লাগেনা। অনেক মিল লাগেনা। অনেক প্রেম ও লাগেনা। লাগে বোঝাপড়া। অন্যর ভুলটাকে বোঝার ইচ্ছা। লাগে যত্ন।
টীম হর্টন থেকে বের হতে সব রেস্তোরা বন্ধ হয়ে যায়। মাসুদভাই জোর করছিলেন খাওয়াবার জন্য। ফেরার পথ এ দুজনে ম্যাগডোনাল্ডস এ বসে রাশীকের বাবার প্রিয় বার্গার আর আমার প্রিয় Poutine খাই। আগে মন্ট্রিয়ল থেমে মামুনভাই এর সাথে দেখা না করে ফিরলে মন খারাপ হতো। এখন জানি মামুনভাই ভালো আছেন। কাছের মানুষদের যত্নে।
জীবনের সরল অংক ,পাটিগণিত এর সরল অংকের মতই। মিললে সহজ। না মিললে কঠিন। এই মিলানোর জন্য যত ধাপ চলতে হয়,সেখানে দরকার শুধু মায়া। একটু চোখ খুলে থাকা। একটু চোখ বন্ধ করেও থাকা। তাহলে সব সহজ হয়ে যায়। মন্ট্রিয়ল যাওয়া আসার চারঘন্টার জার্ণিতো শুধু নয়,এ আমাদের একজনের কাছেই আবার নতুন করে ফিরে আসা। মিতা ভাবী ফোন করলেন একটা দরকারে,উনার সাথে কথা হলো কিছুক্ষন।
অটোয়ার কাছাকাছি চলে এসেছি হঠাৎ রাশীকের বাবা বলে,”আর পারছিনা,ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে।থামছি আমি। “পাশ থেকে ওর দিকে তাকিয়ে ওর মিথ্যাবলাটা ধরতে ধরতে,সংশয় এ তবু বলি,আমি গাড়ি চালাবো ,তুমি পুলওভার করবা? ও হাসতে থাকে। সারাজীবন সত্যির সাথে মিশিয়ে কত মিথ্যা যে বললো সে। কিছু ধরতে পারি,কিছু পারিনা। আর অত পারার দরকারই বা কি?
অটোয়ার লাইট দেখতে পাই। এই শহরের জন্য ভীষন টান হয়ে গেছে। মানুষদের জন্য। পথের জন্য। আগে মন্ট্রিয়ল গেলে এমন হতো। এখন অটোয়া ফিরতেই আনন্দ হয়। এখানেই তো আমাদের সব। আর ভালোবাসা ব্যাপারটাই তো এমন,ফুলঝুরির মত ঝরতে থাকে,শুধু ভালোবাসাতেই তো এতকিছু সম্ভব।
অটোয়া, কানাডা

