
শিশুদের নিরাপত্তা সবার আগে, এই মূলমন্ত্র নিয়ে অন্টারিও সরকার প্রদেশজুড়ে পার্কিং নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু-সেবা কেন্দ্র ও ডে-কেয়ারের সামনে এবং চারপাশে গাড়ি পার্কিং নিয়ে নতুন আইন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য একটাই: ভবিষ্যতে যেন কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা আর না ঘটে।
গত কয়েক মাস আগে রিচমন্ড হিলে ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা গোটা প্রদেশকে নাড়িয়ে দেয়। একটি গাড়ি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি একটি শিশু-সেবা কেন্দ্রের কাচের দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে মাত্র ১৮ মাস বয়সী এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়, আহত হয় অন্তত সাতজন শিশু ও কয়েকজন স্টাফ। এই ঘটনা অভিভাবক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। প্রতিবাদ মিছিল, মানববন্ধন এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রদেশের শিক্ষা মন্ত্রী পল কালান্দ্রা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে কোনো শিশু-সেবা কেন্দ্রের সামনে বা জানালার পাশে গাড়ি পার্ক করা যাবে না। বিশেষ করে প্রবেশপথের মুখোমুখি কোনো পার্কিং স্পট থাকবে না, যাতে গাড়ি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারালে সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি এড়ানো যায়।
এছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে শারীরিক সুরক্ষার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বোলার্ড, উঁচু কার্ব, কংক্রিট প্ল্যান্টার বা অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যারিয়ার বসাতে হবে। সরকারের ভাষ্যমতে, এটি আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে কার্যকর হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত পার্কিং স্পেসে অবশ্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। আবার যেসব শিশু-সেবা কেন্দ্র আবাসিক বাড়ি থেকে পরিচালিত হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের ফলে অনেক ডে-কেয়ার সেন্টারে পার্কিং স্পেস কমে যেতে পারে। অভিভাবক ও কর্মীদের গাড়ি রাখার জায়গা সীমিত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। নতুন ব্যারিয়ার বসানো, কার্ব তৈরি এবং পার্কিং পুনর্বিন্যাসের অতিরিক্ত ব্যয়ও মালিকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পৌরসভাগুলোকেও অনুমোদন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচে অংশ নিতে হতে পারে।
কিছু মালিক ও অপারেটর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও অধিকাংশ অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, পার্কিং সুবিধা কিছুটা কমলেও শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শুধু অন্টারিওতেই ডজনখানেক শিশু-সেবা কেন্দ্রে গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে একাধিক প্রাণঘাতী। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন আইন কার্যকর হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
বীমা কোম্পানিগুলোও মনে করছে, নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেলে ডে-কেয়ারগুলোর বীমা প্রিমিয়াম কমতে পারে, যা অপারেটরদের জন্য আর্থিকভাবে ইতিবাচক হবে।
তবে বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করে বলছে, এই পরিবর্তন আরও আগে আনা উচিত ছিল। তারা দাবি করছে, ছোট ও মাঝারি আকারের ডে-কেয়ারগুলো যেন অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে, সে জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রী পল কালান্দ্রা জানিয়েছেন, সরকার গ্রান্ট বা অর্থ সহায়তার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে।
সরকার ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সার্ভিস ম্যানেজার, স্থানীয় পরিদর্শক এবং শিশু-সেবা কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আইনগত সংশোধন ও নিয়ন্ত্রক বিধি প্রণয়ন করা হবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নতুন নিয়ম পুরো প্রদেশে কার্যকর হবে।
অন্টারিও সরকার বলছে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য শিশু ও কর্মীদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। জনসাধারণের প্রত্যাশা একটাই আর কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেন না ঘটে। সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ এবং নতুন আইন কার্যকর হলে অন্টারিওর শিশু-সেবা কেন্দ্রগুলো সত্যিই এক নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে বলেই মনে করছেন অভিভাবক ও বিশেষজ্ঞরা।
