
কানাডার অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি হলো শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দেশীয় শিল্প খাতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স ফান্ড’ গঠন ও “বাই কানাডিয়ান” নামে নতুন এক অর্থনৈতিক নীতি ঘোষণার মাধ্যমে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের সূচনা করেছেন।
সরকারের দাবি, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয় বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও কানাডার শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিকে টেকসই রাখার জন্য একটি “অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয়”।
বর্তমানে কানাডা এমন এক সময় পার করছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন, ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনৈতিক মন্থরতা এবং নতুন শুল্কনীতির কারণে দেশীয় অর্থনীতিতে সরাসরি চাপ পড়ছে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সম্প্রতি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং বিদেশি প্রতিযোগিতার কারণে বড় ধরনের আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার যে তহবিল ঘোষণা করেছে, তা থেকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ভর্তুকি, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে এই তহবিল থেকে কমপক্ষে ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা ১৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
ঘোষিত নীতির দ্বিতীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “বাই কানাডিয়ান” নীতি। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য ও সেবা বাধ্যতামূলকভাবে অগ্রাধিকার পাবে।
নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যশস্য, প্রযুক্তি যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT) সেবা সবক্ষেত্রেই কানাডার উৎপাদন ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে সুযোগ পাবে।
সরকারি পূর্বাভাস বলছে, এই নীতি কার্যকর হলে প্রতি বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সরকারি ব্যয় সরাসরি দেশীয় বাজারে প্রবাহিত হবে। এর সুফল ভোক্তা পর্যায়েও পৌঁছাবে, কারণ দেশীয় উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ চেইন আরও স্থিতিশীল হবে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের হিসাব অনুযায়ী, “বাই কানাডিয়ান” নীতির ফলে দীর্ঘমেয়াদে কানাডার জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ০.৭% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে কানাডার মোট আমদানি ছিল ৭৫০ বিলিয়ন ডলার, অথচ রপ্তানি মাত্র ৬৯০ বিলিয়ন ডলার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৬০ বিলিয়ন ডলারে।
এই ঘাটতি কমাতে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় অভ্যন্তরীণ বাজারে ধরে রাখার এই পরিকল্পনাকে অনেক অর্থনীতিবিদ সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন – “আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই যেখানে আমাদের শ্রমিক, কৃষক, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখেও স্থিতিশীলভাবে টিকে থাকতে পারেন। ‘বাই কানাডিয়ান’ কেবল একটি নীতি নয় এটি কানাডার আত্মনির্ভরতার অঙ্গীকার।” তিনি আরও জানান, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
যদিও এই পদক্ষেপকে অনেকেই সাহসী ও সময়োচিত বলছেন, তবুও সমালোচকদের মতে নীতিটি আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে USMCA (যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো–কানাডা চুক্তি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি এই সিদ্ধান্তের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
যদি বাণিজ্য অংশীদাররা পাল্টা ব্যবস্থা নেয়, তবে কিছু রপ্তানি খাত (বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি সেবা খাত) সংকটে পড়তে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
টরন্টো, মন্ট্রিয়ল ও ভ্যাঙ্কুভারের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। কানাডিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, শুধু সরকারি ক্রয়ে দেশীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে আগামী তিন বছরে স্থানীয় শিল্পে উৎপাদন ২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। কৃষি উৎপাদক সংগঠনগুলোর মতে, আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্য কমে গেলে স্থানীয় কৃষকরা বড় বাজার সুবিধা পাবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে।
সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনেকে মনে করছেন, দেশীয় শিল্পে অগ্রাধিকার দিলে পণ্যের দাম কিছুটা বাড়লেও গুণগত মান ও কর্মসংস্থান আরও স্থিতিশীল হবে। অন্যদিকে, একাংশ আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে কিছু রপ্তানিমুখী খাতে অর্থনৈতিক ধাক্কা আসতে পারে।
সব দিক বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী কার্নির এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ কানাডার অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। যদি পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কানাডা খুব দ্রুতই দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করতে, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলতে এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতির পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
মার্ক কার্নির ‘স্ট্র্যাটেজিক রেসপন্স ফান্ড’ ও “বাই কানাডিয়ান” নীতি একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে কানাডাকে সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের পুনর্জাগরণের পথও প্রশস্ত করবে। সময়ই বলে দেবে, এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং কানাডার অর্থনীতিতে কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
This article was written by Rezaul Haque as part of the LJI
