ট্রাম্পের শুল্কে অন্টারিওর গাড়ি শিল্পে বিপর্যয়, স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধসের আশঙ্কা

সিএফআইবির সমীক্ষায় বলা হয়েছে অন্টারিওর ছোট ও মাঝারি আকারের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৯ শতাংশই ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ঘোষণার পর তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত বা বাতিল করেছে

কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য উত্তেজনার সরাসরি প্রভাবে অন্টারিও প্রদেশের গাড়ি শিল্প অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রদেশটির প্রায় অর্ধেক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত বা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছে এমন তথ্য উঠে এসেছে কানাডিয়ান ফেডারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিজনেস (সিএফআইবি)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায়।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এ শুল্কনীতি শুধু আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে না, বরং গোটা গাড়ি খাতের কাঠামোকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।

- Advertisement -

সিএফআইবির সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অন্টারিওর ছোট ও মাঝারি আকারের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৯ শতাংশই ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক ঘোষণার পর তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত বা বাতিল করেছে। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই ২৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা ছিল, যা এখন সম্পূর্ণভাবে ঝুলে গেছে।

সিএফআইবির নীতি বিশ্লেষক জোসেফ ফালজাটা বলেন, “উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়তি ব্যয় এবং বাজারে অস্থিরতার কারণে এখন তারা টিকে থাকার লড়াই করছেন।”

গাড়ি শিল্পের ধাক্কা অন্টারিওর সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ছাপ ফেলেছে। ফালজাটা উল্লেখ করেন, “মার্চের পর প্রথমবার জুন মাসে নিয়োগ কার্যক্রমের পরিবর্তে ছাঁটাই কমেছে, তবে সেটি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত নয়। আমরা একে ‘নেট-জিরো কর্মসংস্থানের মাস’ বলছি অর্থাৎ যতজন নিয়োগ পেয়েছেন, ততজন চাকরি হারিয়েছেনও।”

সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী তিন থেকে চার মাসে ১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে, আর ৭০ শতাংশ কোনো পরিবর্তন আনবে না। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্টারিওতে স্টেলান্টিস, ফোর্ড ও জেনারেল মোটরসের মতো বড় অটোমোবাইল কোম্পানির কারখানা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বড় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারলেও তাদের চারপাশে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র সরবরাহকারী ব্যবসাগুলোর টিকে থাকা এখন গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে।

ফালজাটা বলেন, “অন্টারিওর অটোমোবাইল শিল্পের জীবনরেখা এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা টিকতে না পারলে বড় বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” উইন্ডসরের মতো শহরে গাড়ি শিল্পের বাইরেও বহু ক্ষুদ্র ব্যবসা এই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। শুল্কের ধাক্কা তাদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে।

অন্টারিওর লন্ডন শহরের পরিস্থিতিও শোচনীয়। ২০২৩ সালে শহরটির ৭০০টিরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৮০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার বড় অংশই ছিল গাড়ি ও যন্ত্রপাতি সম্পর্কিত পণ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপে এই রপ্তানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা সতর্ক করেছে, ক্ষুদ্র ও পারিবারিক ব্যবসাগুলোর ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, কারণ তাদের হাতে পর্যাপ্ত আর্থিক সঞ্চয় নেই।

সিএফআইবি ৫০০ সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জরিপ চালায়, যার মধ্যে ১৮৭টি ছিল ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানি। ৬৫% প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবের শিকার, গড় বিক্রিতে ১৩% ক্ষতি হয়েছে এই ক্ষতির মাত্রাই অনেক ব্যবসাকে টিকে থাকা বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করছে

অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্টারিওর গাড়ি শিল্প নতুন প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি সেই অগ্রগতিকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে। এতে শুধু উৎপাদন খরচ বেড়েই যায়নি, বরং ব্যাংক ঋণ পাওয়া ও বাজারে টিকে থাকার জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

অন্টারিও এক সময় উত্তর আমেরিকার গাড়ি উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল। আজ সেই কেন্দ্রই শুল্ক ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তার ভারে ন্যুব্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, “কানাডা সরকার যদি এখনই কার্যকর নীতি, ভর্তুকি এবং বিকল্প বাণিজ্য রূপরেখা না নেয়, তবে এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে এক দশকও সময় লেগে যেতে পারে।”

অন্টারিওর গাড়ি শিল্প আজ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। শুল্ক ও বিনিয়োগ স্থবিরতা শুধু ব্যবসায়িক পরিবেশই বদলাচ্ছে না, বরং গোটা প্রদেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে এক সময়ের শক্তিশালী শিল্প খাতটি হয়তো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে চিরতরে।

- Advertisement -

Read More

Recent