সিরিয়ায় বন্দী কানাডিয়ান প্রত্যার্পণ, নতুন বিতর্কের শুরু

নোটিশে জবাবদাতা হিসেবে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জননিরাপত্তামন্ত্রী এবং অভিবাসনমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে

উত্তরপূর্ব সিরিয়ায় আটক কানাডীয় নাগরিকদের প্রত্যার্পণ বিষয়টি আবারও নতুন করে বিতর্কের শুরু হয়েছে।  অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম হয়েছে সচেত নাগরিকদের মধ্যে।  এই আলোচনার আগে আমরা দৃস্টি ফেরাই উত্তরপূর্ব সিরিয়ায় আটক কানাডীয় নাগরিকদের প্রত্যার্পণ প্রশ্নে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে একটি নীতি প্রণয়ন করে কানাডা সরকার। এর নাম হল ‘গভর্নমেন্ট অব কানাডা পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক টু ইভ্যালুয়েট দ্য প্রভিশন অব এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাসিস্ট্যান্স: কন্স্যুলার কেসেস ইন নর্থ-ইস্টার্ন সিরিয়া’। কী আছে এই নীতিমালায়? এই নীতিমালায় বিশেষ পরিস্থিতিতে কনস্যুলার সহায়তা প্রদানের বিষয়টি বিবেচনার জন্য কয়েকটি ধাপ ও মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই বিষয়টি নিয়ে এখন আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কারণ কী?  উত্তরপূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি পরিচালিত একটি কারাগারে আটক এক কানাডীয় নাগরিকের প্রত্যার্পণ আবেদন ঘিরে নতুন করে আইনি ও মানবাধিকার বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ফেডারেল আদালতের কাছে আবেদন জানিয়ে তিনি চেয়েছেন, কানাডা সরকারের তিনজন মন্ত্রীকে তার মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দেওয়া হোক। দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়া চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বিষয়টি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।

- Advertisement -

টরন্টো বাংলাটাউনের এই প্রতিবেদকের হাতেও এসেছে আদালতের সেই নথি।  দাখিল করা নথিতে ওই ব্যক্তিকে ‘এসএস’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তার আইনজীবী নিকোলাস পোপের জমা দেওয়া নোটিশ অব অ্যাপ্লিকেশন অনুযায়ী, এসএস অভিযোগ করেছেন যে কারাগারে তাকে শারীরিকভাবে প্রহার করা হয়েছে এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে তিনি দাবি করেছেন, কারা কর্মকর্তারা তার সামনেই অন্য বন্দীদের হত্যা করেছেন। এমনকি হত্যার পর মৃতদেহ কয়েকদিন ধরে তার কক্ষেই ফেলে রাখা হয়েছিল যা তাকে চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলেছে। এসএসের দাবি, তাকে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়নি, কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডও দেওয়া হয়নি। এমনকি তার আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো আইনি সুযোগও তাকে দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিকে তিনি ‘আইনবহির্ভূত ও অনির্দিষ্টকালীন আটক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

নোটিশে জবাবদাতা হিসেবে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জননিরাপত্তামন্ত্রী এবং অভিবাসনমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের কাছে এসএসের অনুরোধ এই তিন মন্ত্রীকে তার প্রত্যার্পণ আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হোক। তার আইনজীবী পোপ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার মক্কেল “স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যর্পণ চান না”, বরং সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী তার আবেদনটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়া হোক এটাই তার প্রত্যাশা।

আইনি নথি অনুযায়ী, এসএস এই কাঠামোর অন্তত দুটি ধাপ পূরণ করেছেন। তবে চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী প্রত্যার্পণ প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। ২০২৪ সাল থেকে তার আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশি কানাডিয়ান আইজীবি ব্যারিস্টার আরিফ হোসেন বাংলা টাউনকে বলেন, সরকার এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কেন এত দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সিরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলে কুর্দি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন কারাগারে বিদেশি নাগরিকদের আটক থাকার ঘটনা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার সেখানে আটক ব্যক্তিদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অনেক দেশই তাদের নাগরিকদের প্রত্যার্পণ নিয়ে দ্বিধান্বিত অবস্থানে রয়েছে একদিকে নিরাপত্তা বিবেচনা, অন্যদিকে মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন। এসএসের মামলাটি সেই বৃহত্তর বিতর্কেরই অংশ, যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে আসে। এখন ফেডারেল আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে আদালত কি সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দেবে, নাকি বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দেবে।

এই মামলার পরিণতি শুধু একজন বন্দীর ভবিষ্যৎ ? আসলে তা নয়, সিরিয়ায় আটক অন্যান্য কানাডীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। নিজ নাগরিকের বিদেশে নিরাপত্তা এবং সকল বিপদে সহায়তা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কানাডা সবসময়ের মতো এই দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করবে এমন আশাবাদ সচেতন নাগরিকদের।

- Advertisement -

Read More

Recent