
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রদেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থান এবং কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের জন্য গঠিত সরকারি প্যানেলকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠছে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে। বিশেষ করে প্যানেলের সদস্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় উঠেছে রাজনৈতিক মহলে।
মজার বিষয় হলো, সাধারণত একে অপরের বিপরীত অবস্থানে থাকা দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলবার্টা প্রসপারিটি প্রজেক্ট (এপিপি)-এর নির্বাহী পরিচালক জেফরি র্যাদ এবং কানাডার ঐক্যের পক্ষে প্রচারণা চালানো থমাস লুকাসজুক এবার একটি বিষয়ে প্রায় একই মত প্রকাশ করেছেন। উভয়েরই দাবি, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে অর্থনৈতিক মূল্যায়নের জন্য যে পাঁচ সদস্যের প্যানেল গঠন করেছে ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টি (ইউসিপি) সরকার, সেটি আদতে নিরপেক্ষ নয়।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের সরকার সম্প্রতি ক্যালগেরি স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধীনে এই প্যানেল গঠন করে। এর দায়িত্ব হলো আলবার্টা যদি ভবিষ্যতে কানাডা থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে তা বিশ্লেষণ করা। তবে প্যানেল ঘোষণার পর থেকেই এর সদস্যদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কানাডার ঐক্যের পক্ষে পরিচালিত ‘ফরএভার কানাডিয়ান’ প্রচারণার অন্যতম মুখ থমাস লুকাসজুকের অভিযোগ, প্যানেলের সদস্য নির্বাচনই এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।
লুকাসজুক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টেড মর্টনের নাম। মর্টন ২০০১ সালে প্রকাশিত বহুল আলোচিত ‘ফায়ারওয়াল লেটার’-এর অন্যতম স্বাক্ষরকারী ছিলেন। ওই চিঠিতে আলবার্টাকে ফেডারেল সরকারের প্রভাব থেকে আরও স্বাধীনভাবে পরিচালনার বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পেনশন ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, করনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সেনেট সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অধিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন মর্টন।
মর্টনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান আলবার্টার স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিক স্বাধীনতার পক্ষে। ফলে তাকে এমন একটি প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিচ্ছিন্নতার অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করবে এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। লুকাসজুক বলেন, “প্যানেলের গঠন দেখলেই বোঝা যায় এটি কোন দিকে ঝুঁকে আছে। ড্যানিয়েল স্মিথ মূলত ফায়ারওয়াল আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করেছেন।”
প্যানেলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ জ্যাক মিনট্জ। কানাডার রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে তিনি ফেডারেল এবং প্রাদেশিক সরকারের নীতির সমালোচনা করেছেন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে সরব থেকেছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, টেড মর্টন এবং জ্যাক মিনট্জ ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি যৌথ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে তারা বিচ্ছিন্নতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে দেখেন না। তবে কানাডার ভেতরে আলবার্টার স্বার্থ রক্ষার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে বিচ্ছিন্নতা একটি ‘টেকসই সর্বশেষ বিকল্প’ হতে পারে বলে তারা মত দেন। এই অবস্থানই এখন সমালোচকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, বিচ্ছিন্নতাকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করেন এমন ব্যক্তিরা কি আদৌ নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দিতে পারবেন?
এদিকে প্যানেলের ব্যয় নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে। লুকাসজুকের দাবি, প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ লাখ ডলারের প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও প্যানেলের কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে। তার ভাষায়, এই অর্থ দিয়ে অন্তত তিনটি নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করা সম্ভব। তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রদেশজুড়ে জনমত সংগ্রহ ও আলোচনা আয়োজনের নামে একটি ব্যয়বহুল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, যার বাস্তব ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতাবাদী অনুভূতি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করে আসছেন যে ফেডারেল সরকার প্রদেশটির জ্বালানি খাত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। তবে একই সঙ্গে জনমতের একটি বড় অংশ এখনও কানাডার অংশ হিসেবেই থাকতে চায়।
ফলে এই প্যানেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন শুধু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, বরং আলবার্টার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী মাসগুলোতে প্যানেলের কার্যক্রম এবং এর সুপারিশকে কেন্দ্র করে প্রদেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতির নয়; এটি কানাডার জাতীয় ঐক্য, ফেডারেল কাঠামো এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই সরকারি প্যানেলের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
