‘প্রজেক্ট মন্ট্রিয়লে ইহুদিবিদ্বেষী প্রস্তাব ঘৃণা উস্কে দিতে পারে’

Group of people at a demonstration holding a sign in French about Montréal being freed from antisemitism; a blue fleur-de-lis is visible on the left side of the sign.
এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে মন্ট্রিয়লের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জুইশ জেনারেল হসপিটালের প্রধান হার্ট সার্জন ইমানুয়েল মসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে

গত দুই সপ্তাহে মন্ট্রিয়লের জনপরিসরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে ইহুদিবিদ্বেষ এবং এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা শহরটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতি, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে নগর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে।

এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে মন্ট্রিয়লের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জুইশ জেনারেল হসপিটালের প্রধান হার্ট সার্জন ইমানুয়েল মসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে। ওয়েস্টমাউন্টের টেম্পল এমানু-এল-বেথ শোলোম সিনাগগে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইহুদিবিদ্বেষের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি অনেক মানুষকে নতুন করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বসবাসের স্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।

- Advertisement -

সিনাগগে হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে ওয়াকিটকি বহনকারী এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যদিও তদন্ত এখনও চলমান, ঘটনাটি স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা শুধু নিরাপত্তা নয়, সামাজিক সহাবস্থানের জন্যও একটি গুরুতর হুমকি।

এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় মন্ট্রিয়ল সিটি কাউন্সিলে একটি প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা। ক্ষমতাসীন পৌর দল প্রজেক্ট মন্ট্রিয়ল ফিলিস্তিনে সংঘটিত ঘটনাবলিকে “গণহত্যা” আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি নেয়। তবে এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক নেতারা।

বিশেষ করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষক অ্যালিসন হেইন্স মন্তব্য করেন, শহরে যখন সামাজিক উত্তেজনা ও সম্প্রদায়গত বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন এ ধরনের প্রস্তাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তার মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংঘাতকে স্থানীয় রাজনৈতিক মঞ্চে নিয়ে আসা জনমনে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

ইহুদিবিদ্বেষের বিষয়টি যে শুধুমাত্র মন্ট্রিয়লের সমস্যা নয়, সেটিও সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি ইহুদিবিদ্বেষকে “বিশেষ এবং তীব্র” একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলাবিষয়ক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে মন্ট্রিয়লের এমপি মার্ক মিলারের নাম ঘোষণা করেন।

এই বিতর্কে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত আরেকজন ফেডারেল এমপি অ্যান্থনি হাউজফেদার। সম্প্রতি তিনি এবং মানবাধিকার সংগঠন সেন্টার ফর ইসরায়েল অ্যান্ড জিউইশ অ্যাফেয়ার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফো নিয়েমি একটি আলোচনায় অংশ নেন। সেখানে তারা মন্ট্রিয়লের বর্তমান পরিস্থিতি, ইহুদি সম্প্রদায়ের উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক প্রস্তাবের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

মাউন্ট রয়্যালের এমপি অ্যান্থনি হাউজফেদার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে অবস্থান নেওয়া কোনো পৌর প্রশাসনের মূল দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তার মতে, সিটি কাউন্সিলের এমন উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে ঘৃণা ও বিভাজনকে আরও উসকে দিতে পারে এবং মন্ট্রিয়লের ইহুদি নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “যখন কানাডায় ইহুদিবিদ্বেষের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেই একে জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন, তখন বিশ্বের একমাত্র ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে বর্জন বা নিন্দার প্রস্তাব আনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি আশা করি, কাউন্সিল সদস্যরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন এবং প্রস্তাবটি এজেন্ডা থেকে সরিয়ে নেবেন।”

মন্ট্রিয়লের এই বিতর্ক আসলে একটি বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার প্রতিফলন। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে কানাডার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে, অন্যদিকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সম্প্রদায়গত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে। ফলে স্থানীয় রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুর সংযোগ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি আগামী দিনগুলোতে মন্ট্রিয়ল এবং কানাডার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল, সম্প্রদায়ের নেতা এবং প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো সম্প্রদায় নিজেদের লক্ষ্যবস্তু বা বিচ্ছিন্ন মনে না করে। মন্ট্রিয়লের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই ভারসাম্য রক্ষার জটিল বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

- Advertisement -

Read More

Recent