
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণায় পা রাখার স্বপ্ন অনেকেই দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া খুব কম মানুষের পক্ষেই সম্ভব হয়। কানাডার টরন্টোবাসী ডিলন ডিকোটো সেই বিরল মানুষের একজন, যিনি জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ভ্রমণ করে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান সফরের মাধ্যমে তিনি এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায় সম্পন্ন করেন। বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী ডিকোটো পেশাগতভাবে অন্টারিওর ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস রেগুলেটরি অথরিটির (এফএসআরএ) একজন টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের প্রতিটি দেশ ভ্রমণের রেকর্ড। ডিকোটোর এই অসাধারণ অর্জন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্ম নোম্যাডম্যানিয়া এবং মোস্ট ট্রাভেলড পিপল কর্তৃক যাচাই ও স্বীকৃত হয়েছে। ফলে তার এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং বিশ্বভ্রমণপ্রেমীদের কাছেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের ১৯৩টি দেশ ঘুরে আসতে অনেকেই ভাবতে পারেন যে, ডিকোটো হয়তো বছরের পর বছর চাকরি থেকে বিরতি নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি তার অধিকাংশ ভ্রমণ পরিকল্পনা করেছেন সরকারি ছুটি এবং দীর্ঘ সপ্তাহান্তকে কেন্দ্র করে। ইস্টার, শ্রমিক দিবস, বড়দিন, নববর্ষ কিংবা অন্যান্য ছুটির সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক দেশের টিকিট বুক করেছেন। সীমিত সময়ের মধ্যেই তিনি একাধিক দেশ সফরের পরিকল্পনা করতেন, যাতে কর্মজীবনের সঙ্গে ভ্রমণের ভারসাম্য বজায় থাকে। তার ভাষায়, প্রতিটি সফর শেষ হওয়ার আগেই তিনি পরবর্তী কয়েকটি দেশের ভ্রমণ পরিকল্পনা ও বুকিং সম্পন্ন করে ফেলতেন। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ভ্রমণ তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
ডিকোটোর ভ্রমণকাহিনির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, তিনি বিশ্বের প্রায় সব দেশ ভ্রমণ করেছেন মূলত বিমান সংস্থার রিওয়ার্ড পয়েন্ট ব্যবহার করে। ব্যবসায়িক কাজে এবং নিয়মিত বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ ট্রাভেল পয়েন্ট অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই পয়েন্টই হয়ে ওঠে তার বিশ্বজয়ের হাতিয়ার। ২০১০ সালে তার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ট্রাভেল রিওয়ার্ড পয়েন্ট। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখবেন। প্রথমদিকে হংকং, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সফরের মাধ্যমে তিনি এই যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সাধারণ ভ্রমণের শখ পরিণত হয় একটি বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণের অভিযানে।
ডিকোটো জানান, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যে তিনি একসময় উপলব্ধি করেন পৃথিবীর প্রতিটি দেশ ঘুরে দেখার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, যখন এই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তখন বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণকারী মানুষের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। সেই বিশেষ গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার স্বপ্নই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের অধ্যবসায়, পরিকল্পনা এবং ভ্রমণপ্রীতির ফলস্বরূপ তিনি আজ সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
ত্রিনিদাদ ও টোবাগোয় জন্মগ্রহণকারী ডিকোটো জানান, বিশ্বের প্রতিটি দেশ ভ্রমণকারী ত্রিনিদাদ ও টোবাগো বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি। তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত গৌরবের নয়; এটি তার জন্মভূমির জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য সম্মানের বিষয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মানুষের কাছে ডিকোটোর সাফল্য অনুপ্রেরণার নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র সফরের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য পূরণ হলেও ডিকোটোর ভ্রমণপিপাসা থেমে নেই। তার মতে, পৃথিবীকে জানার কোনো শেষ নেই। দেশের সংখ্যা সীমিত হলেও অভিজ্ঞতার সংখ্যা অসীম। সুদানে পা রাখার মাধ্যমে তিনি হয়তো একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, কিন্তু একজন প্রকৃত ভ্রমণকারীর কাছে প্রতিটি নতুন যাত্রাই আরেকটি নতুন গল্পের সূচনা। ডিলন ডিকোটোর এই কাহিনি প্রমাণ করে, সুপরিকল্পনা, ধৈর্য এবং অদম্য আগ্রহ থাকলে একটি সাধারণ স্বপ্নও একদিন বিশ্বজয়ের গল্পে পরিণত হতে পারে।
