
বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেকেই এখনও ইভি কেনার আগে এর ব্যবহার, খরচ, চার্জিং ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর উপযোগিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না। সেই দ্বিধা দূর করতেই কানাডার নোভা স্কশিয়ার হ্যালিফ্যাক্সে এ সপ্তাহান্তে আয়োজন করা হচ্ছে একটি বিশেষ ইভি প্রদর্শনী, যেখানে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়েও দেখতে পারবেন।
হ্যালিফ্যাক্সের কানাডা গেমস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া “হ্যালিফ্যাক্স ইলেক্ট্রিক এভিনিউ” শীর্ষক এই আয়োজনের পেছনে প্রাদেশিক সরকারের আর্থিক সহায়তাও রয়েছে। আয়োজকদের লক্ষ্য কেবল নতুন প্রযুক্তির গাড়ি প্রদর্শন নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা।
অনেক মানুষ বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার কথা ভাবছেন, কিন্তু সরাসরি ডিলারশিপে গিয়ে তথ্য জানতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাদের মূল আগ্রহ থাকে ইভি আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারে। তার ভাষায়, অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে কেনার চাপ অনুভব করতে চান না। বরং তারা নিরপেক্ষ পরিবেশে প্রযুক্তিটি সম্পর্কে জানতে এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এই প্রদর্শনী সেই সুযোগই করে দিচ্ছে।
কলিন রবার জানান, কানাডা সরকারের ৫ হাজার ডলারের ফেডারেল রিবেট এখনও বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনাকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী করে রেখেছে। বর্তমানে বাজারে প্রায় ৪০ হাজার কানাডিয়ান ডলার দামের মধ্যেও বেশ কয়েকটি আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও ইভি ধীরে ধীরে বাস্তবসম্মত একটি বিকল্প হয়ে উঠছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবেশগত সচেতনতা এবং সরকারি প্রণোদনার সমন্বয়ে কানাডায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
হ্যালিফ্যাক্সের একজন বাসিন্দা জানান, তার পরিবার বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেছে মূলত গ্যাসোলিনের দামের লাগামহীন ওঠানামার কারণে। তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি অনেক সময় পরিহাসের মতো মনে হয়। বর্তমানে তারা একটি প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং সেটির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তার মতে, প্লাগ-ইন হাইব্রিড ব্যবহারে যে সঞ্চয় হয়েছে, তা এখন সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। এটি দেখিয়ে দেয় যে, ধাপে ধাপে ইভির দিকে যাওয়া অনেক পরিবারের জন্য কার্যকর একটি পথ হতে পারে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চার্জিং সুবিধা নিয়ে অনেকের উদ্বেগ থাকলেও কলিন রবার মনে করেন, নোভা স্কশিয়ায় সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। তার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রদেশের প্রায় যেকোনো স্থান থেকেই সর্বোচ্চ ১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে একটি চার্জিং স্টেশন পাওয়া যায়। ফলে দূরপাল্লার ভ্রমণ নিয়েও আগের মতো উদ্বেগের প্রয়োজন নেই। তিনি আরও জানান, প্রায় ৯০ শতাংশ ইভি চার্জিং হয় ব্যবহারকারীদের নিজস্ব বাড়িতে, সাধারণত রাতের বেলা যখন গাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। এতে আলাদা করে চার্জিং স্টেশনে যাওয়ার প্রয়োজনও অনেকাংশে কমে যায়।
আয়োজকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে এখনও অনেক ভুল ধারণা এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন ইভি ব্যবহারে চার্জিং জটিল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণে সমস্যা হতে পারে। বাস্তবে আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত চার্জিং নেটওয়ার্কের কারণে এসব সীমাবদ্ধতার অনেকটাই দূর হয়েছে।
সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেই “হ্যালিফ্যাক্স ইলেক্ট্রিক এভিনিউ” আয়োজন করা হচ্ছে। আয়োজকদের আশা, পরীক্ষামূলকভাবে গাড়ি চালানোর সুযোগ এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে আরও বেশি মানুষ পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। সরকারি প্রণোদনা, দ্রুত সম্প্রসারিত চার্জিং অবকাঠামো এবং জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় এই তিনটি বিষয় আগামী কয়েক বছরে কানাডায় বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
