
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে হাজার হাজার টিকিট কিনে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরদের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে টরন্টো সিটি কর্তৃপক্ষ। তবে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউ। তার দাবি, এটি কোনোভাবেই মুনাফাকেন্দ্রিক বা কালোবাজারির মতো কার্যক্রম নয়; বরং বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপুল ব্যয় সামাল দিতে এবং করদাতাদের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত কৌশল।
সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আয়োজক শহর হিসেবে পাওয়া বিশেষ সুবিধা ব্যবহার করে টরন্টো সিটি কর্তৃপক্ষ তিন হাজার পাঁচশোরও বেশি বিশ্বকাপের টিকিট সংগ্রহ করেছে। এসব টিকিটের অধিকাংশই কর্পোরেট স্পন্সর, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এখনও অল্পসংখ্যক টিকিট বিক্রি বাকি রয়েছে। যদিও এই কর্মসূচি থেকে মোট কত অর্থ আয় হয়েছে, সেই চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে সিটি প্রশাসনের দাবি পরিকল্পনাটি প্রত্যাশামতো সফল হচ্ছে এবং বিশ্বকাপ আয়োজনের আর্থিক চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে বিরোধীদের একাংশ এবং সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ দর্শকদের পরিবর্তে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে টিকিট বিক্রি করে সিটি প্রশাসন কার্যত টিকিটের ব্যবসায় নেমেছে, যা অনেকের কাছে কালোবাজারির সঙ্গে তুলনীয়। তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মেয়র অলিভিয়া চাউ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যয়ের একটি পেনিও সরাসরি করদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া হবে না। এই ব্যয়ের অর্থ আসবে মূলত হোটেল লেভি এবং কর্পোরেট স্পন্সরশিপের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির আয় থেকে। তার ভাষায়, “করদাতাদের এই আয়োজনের জন্য এক ডাইমও ব্যয় করতে হবে না।”
মেয়র আরও বলেন, এই উদ্যোগের পেছনে লাভ করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। বরং শহরের বাসিন্দাদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য। তিনি জানান, প্রাদেশিক সরকারের নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই গত বছর এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তিনি অন্টারিওর প্রিমিয়ারের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন এবং সিটি কী করছে, সে বিষয়ে প্রিমিয়ার সম্পূর্ণ অবগত রয়েছেন। অলিভিয়া চাউ স্পষ্ট করেন, এসব টিকিট সাধারণ ভক্ত, ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে না। বরং সেগুলো নির্দিষ্ট কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, স্পন্সর এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যারা বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের ক্ষেত্রে আয়োজক শহরগুলোর জন্য ব্যয় নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, পরিবহন, জনসেবা এবং অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বিকল্প রাজস্বের উৎস তৈরির চেষ্টা অনেক শহরই করে থাকে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সাধারণ দর্শকদের স্বার্থ কতটা রক্ষা করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
টরন্টো সিটির এই উদ্যোগও সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, এটি করদাতাদের অর্থ সাশ্রয়ের কার্যকর উপায়; অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরের টিকিট সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট বিক্রি, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
