
আপনার জীবনে তারুণ্য খুঁজে পাবেন, করোনা কালীন সময়ের তামিল একটি ছায়াছবির আলোকে বিশ্লেষণ করলেই। ছবিটির নাম “পুথ্বম পুধু কালাই”, একটি ছোট গল্প অবলম্বনে। গল্পটি এমন, দুই প্রবীণ কী করে তাদের পুরোনো প্রেম ভালবাসাকে নতুন আঙ্গিকে আবিষ্কার করলেন, কোভিড-১৯ লকডাউন সময়ে। পরিচালক যেভাবে তাদের নতুন ভালবাসার চিত্র বর্ণন করেছেন সেটি খুবই কৌতুহলোদ্দীপক, এ সময়ে তারা প্রেমে ডুবে বেশ চন্মনে হয়ে যেন তারুণ্য ও উদ্যম ফিরে পায়। ধরুন পরিচালক ছবির চরিত্রের নব প্রেমানুভব দর্শক স্রোতাদের অনুভবের মাঝে জাগ্রত করতে চান। ছবির কাহিনী যে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে তা হল প্রেম ভালবাসায় বয়স কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় এবং সব বয়সেই প্রত্যেকের হৃদয় চির সবুজ। আমরা সকলেই একটি লোককথা বা প্রবচন জানি, “বয়স শুধু একটি নম্বর মাত্র” কথাটি সত্য, এই সত্যতার অন্তর্দৃষ্টিই ছবিটির প্রয়াস।
এ ধরনের সামাজিক নিরীক্ষার জন্য একটি বইও রয়েছে, লেখিকা Ellen Langer ( Professor of Harvard University), বইয়ের নাম “Counter Clockwise”, একটি নিরীক্ষায় Ellen কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠকে কিছু দিনের জন্য নিভৃতে কোথাও বিনোদনে থাকতে দেন। তাদের মাঝে কেউ কেউ খুবই দুর্বল ছিল, হাঁটাচলায় লাঠি ভর করেও কষ্টসাধ্য ছিল চলা। লেখিকার উদ্দেশ্য ছিল বর্তমানের মাঝে জ্যেষ্ঠদের বিগত অতীতকে ফিরিয়ে দেয়া। বস্তুত তিনি এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন, যা তারা তাদের যৌবন বয়সে দেখেছেন, সব কিছুই অত্যন্ত সুক্ষ নিয়ন্ত্রণের মাঝে করা হয়েছে। সেই পুরোনো দিনের খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, রেডিও, সাদা-কাল টেলিভিসন, জন নন্দিত অতীতের সব সিনেমা, সেই দিনের ফ্যাসনের জামাকাপড়, পোষাক, লোক প্রিয় ৩০-৪০ বৎসর আগেকার আসবাব পত্র, ব্যবহারের সামগ্রী ইত্যাদি। এমন কী খাওয়া দাওয়া তাদের আগে যে ধরনের অভ্যাস ছিল সেভাবে তৈরি করে খেতে দেয়া হয়েছিল।
সব চাইতে গুরুত্ব পূর্ণ এই, প্রত্যেককে বলা হয়েছিল বিগত যৌবন স্মরণ করে যেন সেভাবে আচরণ করে, তারা স্মরণে নিয়ে আসে নিজ নিজ যৌবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্মৃতি। বলা হয়েছে কিছুতেই যেন মনে বয়সের কোন দুর্বলতাকে স্থান না দেয়। তাদের বেগ বা থলি বহন করতে কাউকে রাখা হয়নি, এমনকি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে ও। কোথাও কোন আয়না রাখা হয়নি, নিজ চেহারা দেখার সুযোগ ছিলনা। বরং তাদের যৌবন কালের ছবি রাখা ছিল বিভিন্ন স্থানে।
এই নিরীক্ষার ফলাফল অবাক হওয়ার মত। নিরীক্ষার আগেই তাদের IQ টেষ্ট, শারীরিক বিভিন্ন টেষ্ট করে রাখা হয়েছিল, তুলনা মূলক একটি রেখা টানার জন্য। অল্প দিন পর আবার সব টেষ্ট করে দেখা গেল তাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন, প্রায় সব টেষ্টের ফল তুলনা মূলক রেখার উপরে। শারীরিক ও স্মরণ শক্তি, অবগতি বা জ্ঞানশক্তি, অনুভূতি বা বোধ, কানে শুনা, চোখে দেখা সব কিছুতেই উন্নতি। সর্বোপরি সুস্থ সবলতার সাধারণ লক্ষণ দেখা গেল। বহিরাগত কিছু পর্যবেক্ষক, যাদের এই নিরীক্ষার কথা বলা হয়নি তাদের নিরীক্ষার আগের ও পরের ছবি দেখানো হলে তারা তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্নতা দেখতে পায়। এই নিরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে লেখিকার বই “Counter Clockwise”।
আমরা বয়স হলেই মনে করি বুড়ো হয়ে গেছি, যদিও জানি বয়স একটি জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রক্রিয়া, সাথে থাকে অনেক মনস্তাত্ত্বিক, মন ও দেহের সংযুক্তির দিক গুলো। আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারি যে আমাদের মনে তারুণ্য আছে, সুস্থ-সবল আছি, কাজের যোগ্য ও স্পন্দনশীল তবে অবশ্যই দেহকোষ, নার্ভতন্ত্র এবং অবচেতন মন সেই বার্তাটি পায়। আমি যে সকল আপন জন দ্বারা পরিবেষ্টিত তাদের আমার নিকট কিছু প্রত্যাশা থাকতে পারে, আমার যথাসম্ভব প্রচেষ্টা থাকা চাই তাদের পরিতুষ্ট করতে। আমাদের যখন বয়স বাড়তে থাকে শারীরিক সামর্থ্য বা অসামর্থ্যতা নিরূপণকারী হল আমরা কে কী ভাবে চিন্তা করি।
লেখিকা বয়োবৃদ্ধি সন্ধিক্ষণে পক্বতা নিয়ে নিম্নের ৩টি পরামর্শ দেন, “কী ভাবে ভাল থাকা যায় ও হৃদয়কে চির সবুজ রাখা যায়”।
# নম্বর-১
তোমরা তোমাদের নিজ বয়সের সাথেই দিন কাটাও তবে পুরোনো দিনের বন্ধুদের সাথে সংযোগ কর, স্কুলের কী কলেজের বা বাল্য বয়সের খেলার সাথী যদি থেকে থাকে। তাদের মাধ্যমেই সহজে অতীতকে খুঁজে পাবে। আমাদের সকলেরই এই সংযোগের মাঝে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব। Whats App গ্রুপের দ্বারাও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কম বেশী সুযোগ হতে পারে, আমি নিশ্চিত এভাবেই আমরা বাল্য, কিশোর ও যৌবনের দিনগুলো অনুভূতিতে নিয়ে আসতে সক্ষম হবো। পুরোনো বন্ধুদের সাথে সাথে বাস্তবে বর্তমানের বন্ধুদের সাথেও হাতেহাত রেখে জীবন যাপন করতে হবে। তাছাড়া নিজ নিজ অনুরাগ, শখ, খেয়াল বা সাদের কাজের স্পর্শে সময় অতিবাহিত করতে হবে। সব সময় ঐসব খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদের সঙ্গে ব্যস্ত থাকুন যেসব অতীতে করেছিলেন, সম্ভব হলে বন্ধুদের সাথে।
লেখিকা নিজে ছোটবেলায় অত্যুৎসাহী হয়ে বাইসাইকেল চালাতেন, এখন প্রবীণ হয়েও সেই সাইকেল চালাতে তিনি আগের মতই উদ্যম ও শক্তি ফিরে পান।
# নম্বর-২
এমন ভাবে সক্রিয় হতে হবে যেন, তোমরা অভিনয় করছ। নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ আমাদের সিনেমার নায়ক নায়িকারা যাদের বয়স ৫০-৬০ বৎসর তাদের দেখতে ২০-৩০ বৎসরের তারুণ্যপূর্ণ মনে হয়। এটি শুধুই সাজসজ্জার বিন্যাস বা কেমেরার প্রভাব নয়। অধিকন্তু অভিনেতাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকও বটে। যারা নিজ বয়সের চাইতে ২৫ বছর কম বয়সের চরিত্রে অভিনয় করে তারা আদতে তরুণ বয়সের যে লক্ষণ তার মত আচরণ করে, অতিরঞ্জিত হলেও। যার ফলে তারা তাদের সমসাময়িক বন্ধুদের চাইতে ধীরে পক্বতা প্রাপ্ত হয়। তাই আমাদেরও তারুণ্যের অভিনয় করা চাই। একটি প্রবাদ আছে, “অনুশীলন কর যতক্ষণ না সৃষ্টি করতে পার”। দিনের শেষে তোমার মনের অনুরাগ বা আসক্তি বয়সের নিমিত্ত বিশেষ এক উপাদান।
আমি আরো একটি উদাহরণ দিতে চাই। এক প্রবীণ লাঠিভর করে কষ্ট করে রাস্তার পাশের পায়ে চলা পথ ধরে হাঁটছিলেন, হঠাৎ রাস্তায় চলা একটি গাড়ী নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তার দিকে আসছিল। ধারণা কর সেই প্রবীণের প্রতিক্রিয়া, তিনি অলিম্পিক ধাঁচে একলাফে নিস্কৃতি পেয়েছিলেন। কিছুক্ষণ আগেই তিনি খুব কষ্ট করে হাঁটছিলেন, আচমকা লাফদেয়ার শক্তি কোথা হতে এসেছিল? কারন তিনি আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে ভুলেই গিয়েছিলেন, ওনি বুড়ো বা অচল। এটি প্রমান করে আমরা সকলের জীবন সম্ভাবনাময়। আমাদের নিস্তেজ করে দেয় আমাদেরই সংকীর্ণ প্রত্যয় বা চিন্তাধারা।
চলুন সবাই তারুণ্য ফিরে পাই, হয়ত একদা বিস্মিত হয়ে বলব চমৎকার।
# নম্বর-৩
ভালোবাসতে থাকুন। আমার মনেহয় আমরা যতই প্রবীণ হই ভালোবাসার থেকে ধীরে ধীরে দূরে চলে যেতে চাই। এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেকোন প্রকার ভালোবাসাই শ্রেয়, এমন নয় যে কাহারো সাথে পারস্পরিক গভীর সম্পর্ক থাকতে হবে। বন্ধুদের, পাড়াপ্রতিবেশীদের ভালোবাস, বিশেষ করে মানবতাকে, প্রকৃতিকে ভালোবাস। তুমি কিছু করতে ভালোবাস, কোন উৎসাহ ব্যঞ্জক প্রবল ইচ্ছা, সেই স্ফুলিঙ্গকে জীবিত রাখ। মন্ত্র হল, “বেশী দিন সজীব থাকতে বেশী বেশী ভালোবাস”। আমাদের তেজ, কর্মশক্তি, শৌর্য এবং আত্মা শাশ্বত, সময়ের অতীত বিদ্যমান। জীবনকে নিজ অনুপম স্পর্শে রাখ।
টরন্টো, কানাডা
