
অন্টারিও প্রদেশে লাগামহীন গাড়ি চুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাদেশিক সরকার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর আইন পাস করেছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, প্রথমবার গাড়ি চুরির অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ড্রাইভিং লাইসেন্স কমপক্ষে দশ বছরের জন্য বাতিল থাকবে। আর একই অপরাধে দ্বিতীয়বার বা একাধিকবার ধরা পড়লে তাকে আজীবনের জন্য গাড়ি চালানোর অনুমতি থেকে বঞ্চিত করা হবে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে অন্টারিওতে গাড়ি চুরির হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শুধু ২০২৩ সালেই নথিভুক্ত হয়েছে ৩৮ হাজারের বেশি গাড়ি চুরির ঘটনা। এক দশক আগের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১০০ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে গ্রেটার টরন্টো এরিয়ায়, যেখানে গড়ে প্রতিদিন একশ’রও বেশি গাড়ি চুরি হচ্ছে। বিলাসবহুল এসইউভি এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর গাড়ি এ চুরির প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
পুলিশ জানিয়েছে, এই চুরির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র জড়িত। চুরি হওয়ার পর গাড়িগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কন্টেইনারে ভরে বিদেশে পাচার করা হয়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের কালোবাজারে কানাডিয়ান গাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। টরন্টো থেকে গাড়ি চুরি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তা বিদেশি বন্দরগুলোতে পৌঁছে যায়।
অন্টারিওর পরিবহন মন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, “গাড়ি চুরির কারণে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পরিবারগুলো ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনছে, অথচ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি হারিয়ে ফেলছে। এই নতুন আইন অপরাধীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা।” সরকারের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, এই শাস্তি অপরাধীদের মনে ভয় তৈরি করবে এবং সমাজে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দেবে।
অলস্টেট এর সিনিয়র ব্রোকার ইমরোজ আহমেদ টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, গাড়ি চুরি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে বীমা খাত ও পুরো অর্থনীতিতে। বীমা কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত বছর গাড়ি চুরির কারণে ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। এর ফলে গাড়ির বীমার প্রিমিয়াম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অর্থাৎ ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ গাড়ি মালিকরাই।
পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এই আইনকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, এতদিন অপরাধীরা স্বল্পমেয়াদি সাজা ভোগ করেই মুক্ত হয়ে আবারও একই কাজে লিপ্ত হতো। কিন্তু আজীবন ড্রাইভিং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তাদের পেশাগত ও সামাজিক জীবন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করছে।
তবে সমালোচকদের একাংশ মনে করছে, কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়। গাড়ি আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বন্দর এলাকায় কঠোর নজরদারি, এবং আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে সাইবার হ্যাকিং বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে গাড়ি চুরির যে কৌশল অপরাধীরা ব্যবহার করছে, তা রোধে গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
অন্টারিও সরকারের নতুন আইন গাড়ি চুরির বিরুদ্ধে এক শক্ত বার্তা। এটি শুধু অপরাধীদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের কাছে সরকারের অগ্রাধিকার ও অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। তবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বন্দরে নজরদারি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার না করলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
