
গত শনিবার, ২৩ নভেম্বর এ,শ্রীকান্ত আচার্য “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা তুমি আমার সাধের সাধনা” গেয়ে শুরু করলেন অটোয়া শহরে Syndicate 71 এর আয়োজিত সংগীত সন্ধ্যা।অনুষ্ঠান অবশ্য শুরু হয়েছিল ছোট্ট সারভিনাজ এর গান দিয়ে। অপূর্ব গাইলো সে। ও যখন “ নদীর যেমন ঝরনা আছে” গাইছিল, ভাবছিলাম এত সুন্দর উচ্চারণ, এই দেশে জন্ম,বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের কিশোরী এক মেয়ে।
শ্রীকান্ত গাইছেন, আর সন্ধ্যার মেঘমালা যেনো টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে পুরো হল জুড়ে। এরপর গাইলেন “বন্ধু তোমার পথের সাথিকে চিনে নিও”! গল্পে বললেন মুকুল দত্তের লেখা, হেমন্ত মূখার্জির গাওয়া ১৯৫৯ সালের সেই গান এখনো কত প্রাসঙ্গিক।
প্রিয় কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা,”ভালো আছি ভালো থেকো গাইছিলেন” যখন, সবাই এর সাথে মিশে গিয়েছিলাম। আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখি এখন আমরা! কবিরা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা হন, এই গান তাই বলে দেয়।

“কেউ বলে ফাল্গুন কেউ বলে পলাশের মাস”গাইতে গিয়ে এই গানের শিল্পী আর গীতিকার জটিলেশ্বর মূখোপাধ্যায় এর গল্প বললেন।
অনুরোধের চিরকুট পৌছে যাচ্ছে তাঁর হাতে। তিনি এত সুন্দর করে অনুরোধকারীকে ভালোবাসা জানিয়ে সেই গান গুলো গাইছেন।এত বড় একজন শিল্পী দর্শক শ্রোতাদের এত শ্রদ্ধা ভরে মূল্যায়ন করলেন, সত্যি শেখার আছে!
শিল্পীরা যখন একটা অনুষ্ঠানের দর্শক, শ্রোতাদের অনুভব বুঝতে পারেন তখন এক অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়।সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে আর আমরা যেনো ডুবে যাচ্ছি সেই সুর মূর্ছণায়! এমন পরিবেশের জন্য শিল্পীদেরও অপেক্ষা থাকে বলে আমার বিশ্বাস।
শুভমিতার সাথে গাওয়া একটা গান গাইলেন আর অভিভূত হয়ে ধন্যবাদ জানালেন এত সুন্দর সব গানের অনুরোধ করবার জন্য।
“মেঘ হলে মন বিকেলবেলা একলা যেতাম মেঘের বাড়ি” গাইছেন আর মন যেনো ঘুড়ির মত ঘুরছে আকাশে। এই গানের গীতিকার কিংশুক অকালে চলে গেছেন , বারবার বলছিলেন তার কথা। বলছিলেন অকালপ্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষ এর কথা আর গাইলেন তাঁর পরিচালিত ছায়াছবি তিতলী তে গাওয়া গান,”মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা”। কত শতবার শোনা এই গান।

“রোদের ছুড়ি ছায়ার শরীর কাটছে অবিরত
রোদের বুকের ভেতর ক্ষত”।
“যেয়ো না দক্ষিণদ্বারে, বাতাস তোমায় উড়িয়ে নেবে”
এত সুন্দর গাইলেন। বিমোহীত হলাম।
কথায় আর গানে মুহুর্তগুলো পার হলো।সবার অনুরোধে গজলও গাইলেন।
শেষের আগের গানটা ,”আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ” কতবার শুনেছি। কতজন গেয়েছে। তবু এ অন্যরকম অনুভব।
সবশেষে “এই রাত তোমার আমার” গাইলেন। এত সুন্দর এক আবহ তৈরী হলো। তিনি যেনো গানে গানে বলে গেলেন মানুষ মানুষের কাছে থাকুক।
“ তুমি আছো আমি আছি তাই
অনুভবে তোমারে যে পাই”
অনুরণন বইয়ে দিয়ে গেলেন এই গানের সুর মূর্ছণায়।
অজস্র গান গাইলেন। সব বহুবার শোনা গান। শিল্পীর সামনে বসে শোনার আনন্দ অপরিসীম।
“মধুর মধুর ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে॥ “ শুনে মোহিত হলাম। এত সুন্দর।খুব বেশি সুন্দর।
বারবার করে অটোয়ার দর্শক, শ্রোতা আর আয়োজকদের ধন্যবাদ জানালেন।তার সাথে বাদ্য যন্ত্রে ছিলেন, রবি, সুমিত,শুভেন্দু, তন্ময় এবং শুভ।
অনুষ্ঠান উপস্হাপনায় শুরুতে ছিলেন সিলভিয়া আর পরে পুরো অনুষ্ঠান পরিক্রমায় সংগে ছিলেন নাসিম সাইদী ।তাদের প্রানবন্ত উপস্হাপনায় অনুষ্ঠান আরো উপভোগ্য হয়ে ওঠে।নাসিম অনুষ্ঠানের সুধীজনদের এবং আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠান এ মন্ট্রিয়ল থেকে অনেক বন্ধু স্বজনরা এসেছিলেন, তাদের অংশগ্রহন আয়োজনকে শক্তিশালী করেছিল। এছাড়া অটোয়া কয়েক’শ মানুষ তাদের একটা ব্যস্ত সন্ধ্যায় একটা সুন্দর শ্রীকান্ত সন্ধ্যায় এসে দারুণ প্রানের সঞ্চার করলেন।এমন আয়োজন সম্ভব হলো অটোয়ার সংস্কৃতিমনা মানুষদের জন্য।
আর বেশ কিছু স্পনসর তো ছিলেন।যাদের সহায়তায় অসম্ভব সম্ভব হয়ে ওঠে।তাদের মধ্যে ছিলেন, শাহ বাহাউদদীন শিশির, হাসান প্রিন্স, তানভীরা সুলতানা,এস এম বাশার এবং কায়সার আহমেদ।
অনুষ্ঠান এর শব্দ সহযোগীতায় ছিলেন কার্লটন এর কৈলাস মিত্তাল থিয়েটার এর জন জন আর তার সাথে ছিলেন আমাদের শহরের আরেফীন কবীর।তিনি নিজেও একজন কী বোর্ডিসট আর ব্যান্ড এর শিল্পী।
শ্রদ্ধেয় শ্রীকান্ত আচার্য আমাদের শুধু গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেছেন তা নয়,তিনি তাঁর কথায় আমাদের মন্ত্র মুগ্ধ করলেন।কুলদীপ সিং নামে একজন সুরকারের গল্প করতে গিয়ে তাকে মাটির মানুষ বললেন।আর আমি তাঁকে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম,”ডাউন টু আর্থ” মানুষ একজন তিনি নিজেই।
বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার শ্রদ্ধা তাঁর ভালোবাসার গল্প শুনে মন ভরে গেলো।
“মেয়েটা আজো ইচ্ছে মেঘে বৃষ্টিদিনের ভাষা
মেয়েটা আমার আতরঢালা সাধের বাংলা ভাষা”। তিনি বললেন আমাদের বাংলা ভাষার কথা।
“মেয়েটা ছিল আন্দোলনে, মেয়েটা ভীষণ একা
মেয়েটার নাম বাহাননোতে বুলেট দিয়ে লেখা!”
আবারো কিংশুক এর কথা মনে করলেন তিনি। এই অসাধারন গানের কথাও লিখেছিলেন তিনি।
বাংলা আমাদের প্রাণের ভাষা। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।এই ভাষাকে অর্জন করতে হয়েছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে যারা অংশগ্রহন করেছেন, জীবন দিয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়েছেন,শ্রদ্ধা ভরে তাঁদের স্মরণ করি।
আমাদের বাংলাদেশ গানে, কবিতায় যেমন ছিল তেমন থাক। কোন অশুভ শক্তি যেন আমাদের মনের ভিতরের সেই গান, সেই সুরকে বিনষ্ট করতে না পারে!
“গান হোক বহু আস্হাহীনতার বিপরীতে এক গভীর আস্হার গান” (ভূপেন হাজারিকা)।
ভালোবাসা প্রিয় মানুষরা। আমরা সবাই যে যেখানে আছি যেনো ভালো থাকি। ভালোবাসায় থাকি।
অটোয়া, কানাডা
