
একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস নিয়ে একটি ছোট কনফিউশন তৈরী হয়েছে আমাদের প্রজন্মের মাঝে। “এদিন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তিরিশ লক্ষ শহীদ হয়েছিলেন” লেভেলের বলদ মার্কা কনফিউশন না, “মাতৃভাষা” ও “রাষ্ট্রভাষা” নিয়ে কনফিউশন।
ইতিহাস বলে, পাকিস্তান চেয়েছিল উর্দূকে “একমাত্র” রাষ্ট্রভাষা করতে। উর্দূকে মাতৃভাষা করতে চায়নি, কারন মাতৃভাষা জোর করে চাপানো যায় না। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা ছিল, এবং সেটাই থাকতো।
প্রশ্ন উঠে, তাহলে বাঙালি ক্ষেপলো কেন? কেন প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দিতে হলো?
তাহলে একটু ইতিহাস পড়েন।
যখন ইংরেজরা ভারতের দখল নিল, এবং “রাষ্ট্রভাষা” বা “অফিস আদালতের ভাষা” ফার্সি ও আরবির বদলে ইংলিশ করলো, তখন তাঁরাই সরকারি চাকরি পেতেন যারা ইংলিশ জানতেন। মুসলিমরা জেদ ধরে, ভুল ও ভুয়া ফতোয়া শুনে (“ইংলিশ খ্রিষ্টানদের ভাষা। তাই এই ভাষা শিখলে কাফের হয়ে যাবে”) ইংলিশ শিখে নাই, ফলে সমাজে পিছিয়ে পড়েছিল।
কাজেই, উর্দূ যদি হতো একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি ভীষণ সমস্যায় পড়তো। উর্দু অনেক কঠিন ভাষা। ফলে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে থাকতাম। বর্তমানে ইংলিশ না জানলে যেমন আপনি ইংল্যান্ড আমেরিকায় ভাল চাকরি পেতে সমস্যা হয়, সেটাই বুঝাচ্ছি। বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতো এই “রাষ্ট্রভাষা উর্দু” অস্ত্র। এই কারণেই বাঙালি নিজের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা চিন্তা করে নিজের জীবনের পরোয়া না করে ভাষার সম্মানের জন্য প্রাণের পরোয়া না করেই রাস্তায় নেমেছিলেন।
এবং এই আবেগকে স্বীকৃতি দিতেই পরবর্তীতে জাতিসংঘ “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে ঘোষণা দেয়, যেন সবাই নিজের মাতৃভাষাকে সম্মান করে।
এই কারণেই রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষায় কনফিউশন তৈরী হয়েছে।
হ্যা, বর্তমানের সবচেয়ে বড় আফসোস এইটাই যে আমরা সেই বাংলায় কথা বলাকেই খ্যাত মনে করি। ইংলিশে কথা বলাকে স্মার্টনেস হিসেবে নেই। আঞ্চলিক ভাষাকেতো গণাতেই ধরি না। ইংলিশ বিদ্যা নিয়ে চায়না যান, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস বা ইতালি, এমনকি দক্ষিণ ভারতে হিন্দিতে কথা বলেন, কেউ বুঝবে না, এবং সেদেশে এটা সমস্যাই না। সাউথ ইন্ডিয়ায়তো ওরা মাতৃভাষা নিয়ে এতটাই কট্টর যে সেখানে তামিল/তেলেগু ইত্যাদির বদলে কেউ হিন্দিতে পোস্টার বা দেয়াল লিখলে, ওটা মুছে ফেলা হয়। ইন্ডিয়ায় অবস্থিত হয়েও হিন্দির আগ্রাসন তাই ওদের অঞ্চলে নেই।
কিন্তু আমাদের দেশে “মাতৃভাষা খ্যাত।”
আরেকটা কথা, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, আরবি, ইংলিশ, স্প্যানিশ কোন ভাষার সাথেই কিন্তু আমাদের শত্রুতা নেই। বরং আমরা যে তিন চার ভাষায় কথা বলতে পারি, এইটা আমাদের জন্য বিরাট আশীর্বাদ, দুর্দান্ত স্কিল, এবং আন্তর্জাতিক মাঠে এইটা দারুন কাজে লাগে। অনেকেই জেদ ধরে তেমনই আচরণ করে যা পাকিস্তানি মূর্খ শাসকরা আমাদের সাথে করেছিল, ভাষাকে “জাত ও ধর্ম” দিয়ে পরিচয় করাতে চেয়েছিল। ভাষার কোন জাত ধর্ম থাকেনারে ভাই! মুসলিমদের অহংকার, মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষা আরবি হলেও কুরাইশ কাফেররাও আরবিতেই কথা বলতো, আজও আরব খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মাতৃভাষা আরবি। ভাষাকে কোন সঙ্কীর্ণ মানসিকতা দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করবেন না। পৃথিবীর সব ভাষাকেই সম্মান করুন, যত বেশি ভাষা শিখতে পারবেন শিখে নিন। নিজের আঞ্চলিক ভাষাও। কোক স্টুডিওর “মুড়ির টিন” গানটা শুনে খুবই গর্বিত হলাম, কারন আমি প্রতিটা শব্দ বুঝতে পেরেছি। অথচ আমার দেশের বেশিরভাগ মানুষই চাটগাঁইয়া ও সিলেটি ভাষা একেবারেই বুঝতে পারেনা।
আরেকটা কথা, একুশে ফেব্রুয়ারি আনন্দের উৎসব নয়, ভাষা শহীদদের স্মরণ ও সম্মান দিবস। “হাসিমুখে শুভেচ্ছা” তাই একটু খটকা লাগে। কেউ কারোর বাপের মৃত্যুদিনে শুভেচ্ছা বিনিময় করে? না। ঘটনা এখানেও তাই।
