রহস্য

বিশ্বাস করেন এখানে কীভাবে এলাম সেটা আমি জানি না

বিশ্বাস করেন, এখানে কীভাবে এলাম সেটা আমি জানি না।

ফুপুর বাসা থেকে বের হয়ে আমি আবারো সেই অ্যাপটায় ট্যাপ করে রাহেলের অবস্থান দেখে নিয়েছিলাম। আর তারপরই সামনে একটা সিএনজি খালি পেয়ে তাতে উঠে পড়েছিলাম। একবার ভেবেছিলাম সিএনজি ড্রাইভারকে বলি টিএসসিতে যেতে। তারপর আবার কী ভেবে ধানমন্ডির এই রেস্টুরেন্টটার কথা বললাম। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে রাহেল তার ছেলে বন্ধুদের নিয়ে বুফে খেতে এসেছে। আমি কেবল এটাই জানতে চেয়েছিলাম যে রাহেল তার নতুন কোনো গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ডিনারে আসেনি।

- Advertisement -

কিন্তু এত কিছু জেনে আর কী হবে? রাহেল তো আর আমাকে ফিরে পেতে চায় না। তার এপার্টমেন্টটা ছেড়ে দিতে বলার পরেই তো ব্যাপারটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। বড়ো জোর সে হয়তো আমাকে বন্ধু হিসেবে থাকতে দিতে পারে। এর বেশি তো তার কাছে কিছু আশা করা যায় না আর।

সিএনজি থেকে নামতেই এক রাশ শীতল হাওয়া এসে আমাকে ধাক্কা দিলো। বুঝতে পারলাম শীত এসে পড়েছে। একটা গরম কাপড় নিয়ে আসলে ভালো ছিল। আমার আবার কোল্ড এলার্জি আছে। অল্পতেই শর্দি-জ্বর হয়ে যায়। এখন রাহেল পাশে থাকলে তার পরনের জ্যাকেট খুলে আমাকে পরিয়ে দিত। কোনো পুরুষ মানুষ এতটা কেয়ারিং হতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না। শীতের রাতে বাইরে বের হলে আমি মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই কার্ডিগান বা চাদর পরে বের হতাম না। রাহেল যখন আমার গায়ে তার জ্যাকেট পরিয়ে দিত মনে হত  এ জীবনে আমার এর চেয়ে বেশি কিছু চাইবার নেই।

এখন যদি আমি দেখতে পাই রাহেল তার জ্যাকেট খুলে অন্য কোনো মেয়েকে পরিয়ে দিচ্ছে আমার কেমন লাগবে? ভাবতেই চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো। আর, এজন্যই আমার কখনো আর রাহেলের আশেপাশে থাকা উচিত না। সম্ভব হলে এ শহরেই আর থাকা উচিত না।

রেস্টুরেন্টের কাচের দরজায় হাত দেয়া মাত্রই আমার বুকটা ধ্বক করে উঠলো। কী হবে যদি আমি তাকে কোনো মেয়ে বন্ধুর সাথে দেখতে পাই? আমি কি তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারবো? আল্লাহ! এমনটা যেন কখনোই না ঘটে।

সে যদি আমাকে দেখে ফেলে তাহলে তো সব বুঝে ফেলবে। ছি ছি আমি লজ্জায় মরেই যাবো তখন। ওড়নাটা দিয়ে পুরো মাথা ঢেকে মুখের বেশি অংশটাও ঢেকে ফেললাম। তারপর পা টিপে টিপে অতি সাবধানে এদিক ওদিক না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে রেস্টুরেন্টটার একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ালাম।

কিন্তু রাহেলকে কোথাও দেখতে পেলাম না। দ্বিতীয়বারের মতো পুরো রেস্টুরেন্টে চোখ হাঁটালাম। না, রাহেল নেই। রাহেল এখানে নেই!

সাথে সাথে মোবাইল ফোন বের করে ফোন ট্র্যাকার অ্যাপে ট্যাপ করলাম। হুম, রাহেল বের হয়ে গেছে। খুব বেশি দূর অবশ্য যায়নি। রাহেলের এই মুহূর্তের অবস্থান এখান থেকে এক ব্লক  দূরেই।

আমার এখন বাড়ি ফেরা উচিত। অবশ্য চাইলে এখানে বসে কিছু খেয়েও যাওয়া যায়। কিন্তু ফুপু অপেক্ষা করছে। আমার বরং চলেই যাওয়া উচিত। অথবা আরেকটা কাজ করা যায়। শিউলিকে একটা কল করা যায়। কতদিন তার সাথে কথা হয় না।

কিন্তু এসব কিছু না করে আমি যেটা করলাম সেটা হলো রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে রাহেল যেদিকে আছে সেদিকে এগোতে থাকলাম। ট্র্যাকারে তার গতি দেখে মনে হচ্ছে সে হাঁটছে। কোনো গাড়িতে উঠেনি এখনো।

একটু স্পিডে হাঁটলে কিছুক্ষণের ভেতর তাকে দেখতে পাবো- আই অ্যাম শিউর।

যা ভেবেছিলাম তাই। মিনিট পাঁচেকের ভেতর তাকে পাওয়া গেল। সে হাঁটছে। প্যান্টের দু’পাশের পকেটে দুটো হাত ঢুকিয়ে রেখে সে ধীর গতিতে হাঁটছে। আর তার গায়ে গা ঘেঁষে হাঁটছে আরেকটা মেয়ে!

দু’জন গল্প করতে করতে এগোচ্ছে। বড়ো রাস্তা ফেলে তারা ছোট্ট একটা গলির রাস্তায় ঢুকে গেল। আমিও ‌দ্রুত পা চালালাম। এ রাস্তায় তেমন কোনো মানুষ-জন নেই।

চোখ রগড়ে আমি আবারো রাহেলের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, এটা রাহেল। আর কেউ না। আর তার পাশেই হাঁটছে একটা মেয়ে!

মেয়েটা সুন্দরী।

দূর থেকে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতেই বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা সুন্দর। তার শারীরিক গঠনও বেশ আকর্ষণীয়। লম্বায় রাহেলের প্রায় কাছাকাছি।

গতি বাড়িয়ে আরেকটু সামনে এগুলাম। এবার মেয়েটাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এর তো বয়সও অনেক কম হবে বলে মনে হচ্ছে। আরেকটু গতি বাড়ালাম। মেয়েটাকে দেখে আমার নিজের কথাই মনে পড়ছে। আমি যখন আঠারো-বিশ বছরের ছিলাম তখন আমিও অনেকটা এর মতোই দেখতে ছিলাম।

রাহেলকে কত দিন হলো এর সাথে সম্পর্ক পেতেছে? এই মেয়েকে তো আগে কখনো দেখিনি বলে মনে হচ্ছে। যতদূর মনে পড়ছে রাহেলের ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টেও তো এই মেয়ের চেহারা দেখিনি কখনো। মনে হয় না, এই মেয়ের সাথে অনেক আগে থেকেই তার পরিচয়। সম্ভবত আজকেই তাদের প্রথম দেখা।

মনে কত কত প্রশ্ন জেগে উঠছে! রাহেল কি মেয়েটাকে চুমু খেয়েছে? মেয়েটাকে কি তার নতুন এপার্টমেন্টে নিয়ে গেছে?

চলতে চলতে হঠাৎ রাহেল দাঁড়িয়ে পড়লো। এখন কি সে মেয়েটাকে চুমু দেবে? এমনই একদিন রাতে হাঁটার সময় রাহেল আমাকে প্রথম চুমু খেয়েছিল। ঠিক এই মুহূর্তের মতো আশেপাশে কোনো লোকজন ছিল না তখন। চুমু না দিয়ে রাহেল মেয়েটার দিকে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। সে অপেক্ষা করছে মেয়েটার হাতের। কেমন যে লাগছে আমার!  মেয়েটা কি তার হাত ধরবে? এই পিচ্চি একটা মেয়ে কেন রাহেলের হাত ধরতে যাবে? নিশ্চয়ই মেয়েটা হাত ধরবে না।

বাহ বাহ! বেশ বেশ! মেয়েটা তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে! কি বেআক্কেল মেয়েরে বাবা! বয়সে এত বড়ো একটা লোকের হাত ধরতে যাবে কেন সে? সে তো চাইলে রাহেলের থেকেও ইয়ং আর হ্যান্ডসাম যে কোনো ছেলেকে পাবে প্রেম করার জন্য। মেয়েরা এত বোকা হয় কেন?

মনে পড়ে গেল রাহেল যেদিন প্রথম আমার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিনকার কথা। আমার একটা বান্ধবীর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছিল সেটা। সে ছিল আমার বান্ধবীর আত্মীয়, আমার সাথেও আগের পরিচয় ছিল তার। তারপরও রাহেল যখন হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল আমি তো সাথে সাথে তার হাত ধরিনি। পাঁচ মিনিট ভাবতে হয়েছিল তার হাতে হাত রাখবো কি না সে সিদ্ধান্ত নিতে। যদিও তার বাড়িয়ে ধরা হাত দেখে আমি থ হয়ে গিয়েছিলাম। এমন সুদর্শন এক ডাক্তার আমার দিকে হাত বাড়াবে আমি এটা তখন স্বপ্নেও ভাবিনি।

তারপর সেই রাতে অনুষ্ঠানের অন্য সব গেস্টদের উপেক্ষা করে আমরা দু’জন গল্পে মেতে উঠেছিলাম। কত কিছুই না গল্প করেছিলাম সেদিন! সে রাতেই বুঝতে পেরেছিলাম এই রাহেল ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। রাহেল ছাড়া আমি এক দন্ডও কাটাতে পারবো না।

হায়রে আমার কপাল! যা পারবো না বলে ভেবে নিয়েছিলাম এখন আমার সেটাই করার চেষ্টা করতে হচ্ছে।

যার সাথে আপনি সারা জীবন কাটাবেন বলে ভেবেছিলেন তাকে যদি অন্য মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন তখন আপনার কেমন লাগবে? আপনি কি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের প্রেম লীলা দেখে যেতে পারবেন? আমিও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। দম বন্ধ বন্ধ লাগছে! তবু অপেক্ষা করতে থাকলাম, তারা কখন তাদের হাত ছেড়ে দেয় সেটা দেখার জন্য। অপেক্ষা করতে থাকলাম মেয়েটা হঠাৎ ঝাড়ি দিয়ে রাহেলের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়ার দৃশ্য দেখার জন্য। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তারা দু’জন হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলো।

আমার এখনই ফিরে যাওয়া উচিত। রাহেল আর তার নতুন প্রেমিকাকে আমার এক্ষুনি ভুলে যাওয়া উচিত। রাহেলকে ভুলে গিয়ে আমার আগে বাড়া উচিত। কিন্তু আমি এসবের কিছুই করলাম না। তাদের অনুসরণ করতে থাকলাম।

আর তখনই চিন্তাটা মাথায় এলো।

- Advertisement -

Read More

Recent