
ঘর থেকে বেরিয়ে তিনবার ডানে মোচড় ঘুরোলেই হুরঅন্টারিও স্ট্রীট। সেটি ধরে সোজা উত্তর দিকে গেলে ব্লু মাউন্টেইন আর সাগরসম জর্জিয়ান বে। গুগল বাবুর সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী বাড়ি থেকে দুরত্ব মোটে ১২৬ কিলোমিটার। হুরঅন্টারিও স্ট্রীট ধরে এতোটা পথ পেরোনোর সুযোগ নেই। তাই উত্তরের শেষ অংশটুকু চলতে হয় কাউন্টি রোড কিংবা রিজিওনাল হাইওয়ে ধরে। সাকুল্যে এক ঘন্টা বিশ মিনিটের পথ।
গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হয়ে গেছে টরন্টো এবং আশেপাশের সাব-আর্বান এলাকায়। করোনা মাথায় নিয়েই লোকে বেরিয়ে পড়ছে অবকাশ যাপনে। আমার অবশ্য ‘কোভিড অবকাশ’ নামে কোনো প্ল্যান মাথায় নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটাই সঙ্গত ও নিরাপদ মনে করি। সকাল বেলার ঝরঝরে রোদ্দুর দেখে মনে হলো কাছে পিঠে কোথাও ঘুরে আসি। ছেলের পছন্দে সায় দিয়ে রওনা হলাম উত্তরপানে।
ঘন্টা আধেক বাদে সুন্দরী অরেঞ্জভিল শহর। একজিট নিতে হলো গাড়ির তেল নিতে। শহরে ঢুকে লোকজনের স্বাস্থ্য সচেতনায় মুগ্ধ হলাম। সবার মুখে মাস্ক। গ্যাস স্টেশনে তেল ভরছে হাতে দস্তানা পড়ে। কেউ আবার হ্যান্ডেল ধরার আগে টিস্যু দিয়ে মুছে নিচ্ছে। বুকে বল পেলাম। নিজেকেও নিরাপদ মনে হলো। তেল নেয়া শেষে আবারো হুরঅন্টারিও। এটি এখানে এসে হয়েছে আঞ্চলিক মহাসড়ক নম্বর ১০। বিরামহীন গেটলক যাত্রা। গন্তব্য দ্য ব্লু মাউন্টেইন।
পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ। দুপাশে ইয়েলো বার্চ আর হোয়াইট স্প্রুসের সারি। কোথাও ওক গাছ কিংবা ঘন ওয়ালনাটের বুনো ঝোঁপ। মাঝে মাঝে টলটলে জলের কানাডিয়ান হাওর। দেখলেই চলনবিল হাকালুকি টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা মনে পড়ে যায়। অসংখ্য হাঁসের মেলা দেখে পেছনে বসা কন্যা আমার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। ছেলে তখন যান্ত্রিক হেডফোনে ব্যস্ত। স্পোটিফাইয়ে বুঁদ হয়ে ভিনদেশি গান শোনে।
বেলা গড়ায়নি তখনো। জর্জিয়ান বে’র আকাশ পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেলে সূর্যকিরণ ছড়াচ্ছে। ভাতের মাড়ের মতো কড়কড়ে রোদ। তবে সাগরিক শীতল হাওয়ায় গরম তেমন তীব্রতা পায়নি। ব্লু মাউন্টেইন টাউন হলের নিকটবর্তী থর্নব্যুরি বীচে পৌঁছলাম তেমন কোনো থ্রিলিং এডভেঞ্চার ছাড়াই।
কিন্তু মুশকিলে পড়লাম পার্কিং পেতে। ছোট্ট বীচে প্রচুর দর্শনার্থী। গিজগিজে বানিজ্য মেলা না হলেও পৌষ মেলার সরল গ্রাম্যজনের উপস্থিতি। সবারই গাড়ি। বড়সড় ফ্যামিলি কার। পার্কিং নেই। রাস্তার ধারেই হঠাৎ একটা খালি জায়গা পেয়ে গেলাম। তাও আবার দুটো ‘জিএমসি ইউকন’ সাইজের গাড়ির মাঝখানে। আমার নিসান রুগের চে’ ফুট দেড়েক লম্বা জায়গা। ঐ জায়গাতেই বিশেষ কায়দায় দ্রুত প্যারালেল পার্কিং করে নিলাম।
ছেলেমেয়ে ফিল্মি স্টাইলে দরজা খুলেই বীচে দৌড়। দুজনের কেউই মাস্ক পরেনি। ওদের ঠেকাতে আমিও লাফ দিয়ে মাস্ক ছাড়া নেমে পড়লাম। বাট সারপ্রাইজিং… এ আমি কি দেখছি? পুরো বীচে শত মানুষের ভিড়ে একটিও মাস্ক নেই! আশ্চর্য… কেউই মাস্ক পরেনি। কেউ না! একজনও না! কিছুটা বিষ্ময় নিয়ে মাস্কবিহীন সুন্দর মুখগুলো দেখতে দেখতে বাচ্চা দুটো কোনদিকে গেলো, সেটাই বুঝলাম না।
সম্বিত পেলাম পেছন থেকে বজ্রকঠিন ঝাড়ি খেয়ে। কোন দিকে তাকিয়ে আছো? রোবাব মর্ম কোথায়?
না দেখেই আঙ্গুল তুলে বললাম, ঐদিকে।
হ্যাঁ… তোমাকে বলছে ঐদিকে? ঘাড়টা ঘুরাও। দেখো, ওরা পাথুরে জায়গায় পা ভেজাচ্ছে।
বললাম, মেয়েতো সাঁতার জানেনা।
তো আমি কি করবো? তুমি এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে ওদের জল থেকে তুলে আনো।
রাণীমাতা এলিজাবেথ বললেও হয়তো ইগনোর করা যেতো। যা সুন্দর দৃশ্যম! কে যায়? করোনাকে ডর না করলেও চলে। কিন্তু হোম মিনিস্টার বলে কথা।
মুখশ্রী কৃষ্ণবর্ণ করে বললাম, আনছি।।
সূর্য তিরিশ ডিগ্রী হেলার আগেই ব্লু মাউন্টেইন ভিলেজ রিসোর্টে রওনা দিলাম। জোজো ওয়েইডার বুলেভার্ড থেকে পার্কিং লটে রাইট টার্ণ নিয়েই মাথার ওপর বিরাট সাইন। ‘পার্কিং ফুল’। তবে গেইট ওপেন রাখা হয়েছে। সিকিউরিটির সামনে দিয়ে বিনা বাঁধায় ভেতরে ঢুকে পড়লাম। তিন চার চক্করের পড়েও বিশাল পার্কিং লটে জায়গা হলোনা আমার নিসান বেচারার।
পার্কিংএ জায়গা হয়নি তাতে দুঃখ নেই। দুঃখ পেয়েছি অন্যখানে। রিসোর্ট জুড়ে হাজারো মানুষের ঢল। অথচ কারো মাস্ক নেই। সতর্কতা নেই। সামাজিক দুরত্ব ততোটুকুই যতোটুকু বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের হয়। অথচ পৌর কর্তৃপক্ষের সাইন ঝুলছে সর্বত্র। অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের ঘোষণা সাঁটা শহর জুড়ে। কেউই মানছেনা। বেসরকারি সিকিউরিটি যাঁরা প্রতি অক্ষরে সরকারি নির্দেশ মেনে চলেন, তাঁরাও মানছেন না। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সিকিউরিটিকে দেখলাম মাস্ক ছাড়া দিব্যি ঘুরে বেড়াতে।
মনে হলো ব্লু মাউন্টেইন অন্টারিওর বাইরে কিংবা কানাডার বাইরে এক করোনাবিহীন দ্বীপরাজ্য।
করোনা জয় করতে না পারলেও মানুষ বুঝি করোনা ভীতি জয় করে ফেলেছে। কেবল কানাডা আর বাংলাদেশ নয়। বিশ্বের সব দেশে একই দৃশ্য।
ভয় শুন্য চিত্ত মানুষের মহা সম্পদ। কিন্তু বোকার মতো সাহস দেখানো জ্ঞানীর কাজ নয়। করোনার প্রথম ওয়েভ সবে পার হয়েছে বা হচ্ছে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর মতো দু’তিনটি ওয়েভ তৈরীর ক্ষমতা কি করোনার নেই? যদি থাকে তাহলে এই বোকামির ফল ১৯১৮-১৯২০ এর পুনরাবৃত্তি হিসেবে ২০২০-২০২২ হতে কতক্ষণ?
অতএব, সাধু সাবধান!!
ব্রাম্পটন, কানাডা
