
শৈশবে আমার স্বপ্নের নায়িকা ছিলো একাধিক। বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি নায়িকার ছড়াছড়ি ছিলো আমার জীবনে।
আমার স্বপ্নের নায়িকারা বারবার পরিবর্তিত হতো। তালিকাটা দীর্ঘ এবং হাস্যকর। কিন্তু স্মৃতির সঙ্গে প্রতারণা করতে নেই, তাহলে আখেরে নিজেকেই ঠকানো হয়। দু’চারটে নাম বলেই ফেলি। সুচিত্রা সেন তো চিরকালের। পরে সুচিত্রার আদলটা আমি পেয়েছি মাধুরী দীক্ষিতের মধ্যে। মাধুরীর রূপ লাবণ্য হাসি এবং নৃত্যের আমি সবিশেষ ভক্ত। এমনকি তাঁর ‘ধাক ধাক কারনে লাগা’ টাইপের নাচেরও ভক্ত আমি। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মাধুরীর মধ্যে সুচিত্রার স্নিগ্ধতাটা আমি অনুভব করতাম। উপভোগ করতাম। খুব ভালো লাগতো রেখাকে। ‘ওমরাও জান’ দেখার পর রেখার ঘোরে পড়েছিলাম।বিটিভির ‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান’ এবং ‘বায়োনিক ওম্যান’-এর নায়িকা ছিপছিপে সুদর্শনা লিন্ডসে ভাগনারে আপ্লুত ছিলাম বহুদিন। বহুকাল মুগ্ধ ছিলাম সোফিয়া লোরেনের দ্যুতিতে।
কবরী-ববিতা-শাবানারা আমার নিত্যসঙ্গী ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁদের কারণেই আমি বাংলা ছবির পোকা ছিলাম না।এর সঙ্গে আরো অনেক অনুষঙ্গ জড়িত ছিলো। নূতনকে ভালো লাগতো তাঁর অসামান্য নাচের প্রতিভার কারণে। বসুন্ধরা ছবিতে তাঁর অপূর্ব একটা ক্লাসিক্যাল ডান্স ছিলো। ওস্তাদ আখতার সাদমানীর ধ্রুপদী বোলের সঙ্গে। ১৯৭৫-এ আলমগীর কবিরের শাদাকালো ‘সূর্যকন্যা’ মুক্তি পেলে আমার স্বপ্নের নায়িকার তালিকার ১নম্বরে তশরিফ নিয়েছিলেন জয়শ্রী রায় ওরফে জয়শ্রী কবির। ১৯৭৭ সালে রঙিন ‘সীমানা পেরিয়ে’ দেখার পর অপরূপা জয়শ্রী আমার স্বপ্নের নায়িকার স্থায়ী আসনটি অধিকার করে নিয়েছিলেন পাকাপাকি ভাবে। এই ছবিতে জয়শ্রীর লিপসিং-এ ভূপেন হাজারিকার অসাধারণ সুর ও আবিদা সুলতানার অনন্য কণ্ঠে ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার/মৌনতার সূতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর/সেই চাঁদরের ভাঁজে ভাঁজে/নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া আছে ভালোবাসার আদর’ গানটি আমাকে মুগ্ধতার সাগরে ভাসিয়ে নিয়েছিলো। এই গানটায় আজো আমি সমান প্লাবিত ও নিমজ্জিত। এই রচনাটি লিখবার সময়েও আমার ল্যাপটপে বেজে চলেছে শিবদাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা চিত্ত প্রসন্ন করা গানটি।
নায়িকা জয়শ্রী ছিলেন সত্যিকারের ক্লাসিক্যাল রূপসী।এক ধরণের উজ্জ্বল আভিজাত্য মেশানো অনিন্দ্যসুন্দরী জয়শ্রীর নিঃশব্দ ও সশব্দ হাসি, অশ্রুসিক্ত ও অশ্রুহীন কান্না, ছন্দময় হাঁটা, কোলাহল থামানো হাঁটা এবং হৃদস্পন্দনের মাত্রা বাড়ানো ও মাত্রা কমানো চাহনী আমাকে মুগ্ধতার সাগরে ভাসিয়ে নিতো। বাংলাদেশে বাস করা সমস্ত নায়ক-নায়িকাকে আমি ছুঁয়ে দেয়া দুরত্ব থেকে অবলোকন করেছি কিন্তু সব সময় এড়িয়ে চলেছি জয়শ্রীকে। আমি চাইতাম—স্বপ্নের এই নায়িকার সঙ্গে আমার দেখা না হোক। কিন্তু জয়শ্রী অভিনীত সব চলচ্চিত্রই আমি দেখেছি একাধিকবার। বিশেষ করে ‘সূর্যকন্যা’ ও ‘সীমানা পেরিয়ে’ দেখেছি বারবার বহুবার।
আমার টিনএজ বয়েসে একবার অসহনীয় কিডনি পেইন নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যন্ত্রণাকাতর আমার চিৎকারে অতিষ্ট হয়ে চিকিৎসক আমাকে পেইনকিলার ইনজেকশন ‘পেথেড্রিন’ দিয়ে কেবিনে ঘুম পাড়িয়ে রাখতেন। এই পেইনকিলার আমার যন্ত্রণার উপশম তো করতোই বাড়তি বোনাস হিশেবে আমাকে নতুন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও দাঁড় করাতো। আমি চিৎকার শুরু করলেই পরিবারের লোকজন নার্সদের ডেকে আনতেন। আমার কেবিনেই প্যাকেট ভর্তি ইনজেকশন রাখা থাকতো। নার্স ইনজেকশন পুশ করলে আমি চিৎকার থামাতাম। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে সামান্য ব্যথাতেই আমি প্রাণপণে চিৎকার দিয়ে হাসপাতাল কাঁপিয়ে তুলি। কয়েকদিনের মাথায় চিকিৎসক ব্যাপারটা ধরে ফেললেন। আধো ঘুম আধো জাগরণে আমি শুনতে পেলাম ডাক্তার বলছেন—‘এই ছেলেকে আর পেথেড্রিন দেয়া যাবে না। ও তো এডিকটেড হয়ে যাচ্ছে!’ বোনাসের ঘটনাটা এই জীবনে কাউকে বলা হয়নি। আজকে বলি। ব্যথানাশক ইনজেকশন আমাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে রহস্যময় একটা ভুবনে নিয়ে যেতো। হাসপাতাল কেবিনে আমার ধবধবে শাদা বিছানাটা অসস্র বেলি আর শিউলি ফুলের সুরভিত চাদর হয়ে উঠতো। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আলাদিনের চাদরের মতো সেই চাদরটা আমাকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিতো। খুব দ্রুতই আমি পৌঁছে যেতাম অনেক দূরের ঝকঝকে একটা নীল আকাশে। তখন আমার ডানে বাঁয়ে মেঘ উড়ে যায় শরীর ছুঁয়ে। অনেক উঁচু থেকে পাখির চোখ আমি পাহাড় দেখি নদী দেখি সমুদ্র দেখি। উঁচু থেকে ঢাকা শহরের বিল্ডিংগুলোকে কখনো মনে হয় লেগো, কখনো মনে হয় ম্যাচ বাকসো আবার কখনো ডাস্টার। নদীগুলো যেনো আঁকাবাঁকা লম্বা রূপোলি ফিতে। নদীর বুকে পালতোলা নৌকোগুলোকে মনে হয় হাঁস। কিন্তু কোথাও কোনো মানুষ দেখি না। আসলে এতো উঁচু থেকে মানুষকে দেখা যায় না। একদিন ওরকম ওড়াউড়ির সময় দেখি আমার পাশ দিয়ে উড়ে যায় শাদাশাড়ি পরা একটা পরী। পরীটার ডানা দুটোও ধবধবে শাদা পালকের। পরীটার কপালে লাল একটা টিপ। সেই টিপের সঙ্গে ম্যাচ করা লাল লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙানো পরীটাকে আমি চিনতে পারি। এই পরীটার নাম জয়শ্রী কবির। পরীটা আমার পাশাপাশি ওড়ে। তারপর কতো যে কথা বলে আমার সঙ্গে, পরীটা!
জয়শ্রী আজও আমার কাছে সেই স্বপ্নের পরীটাই।
