
অন্টারিওর লন্ডন শহরে চলতি শরতেই দরজা খুলতে যাচ্ছে সুইডিশ আসবাবপত্র জায়ান্ট আইকিয়ার নতুন স্টোর। তবে এটি হবে না সেই পরিচিত বিশালাকৃতির আইকিয়া, যেখানে একবার ঢুকলে পুরো স্টোর ঘুরে দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। বরং নতুন এই আউটলেটটি খুচরা বাণিজ্যের এক নতুন প্রবণতার প্রতীক ‘ছোট স্টোর, দ্রুত কেনাকাটা’।
লন্ডনের হোয়াইট ওকস মলে সাবেক হাডসন’স বে ভবনে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন স্টোরটি। আয়তনে এটি হবে মাত্র ৪৩ হাজার বর্গফুট, যা আইকিয়ার প্রচলিত স্টোরগুলোর তুলনায় অনেক ছোট। সাধারণত আইকিয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ স্টোরের আয়তন কমপক্ষে তিন লাখ বর্গফুট হয়ে থাকে, যা প্রায় ছয়টি ফুটবল মাঠের সমান। এসব স্টোরে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি পণ্য প্রদর্শিত হয়। অথচ লন্ডনের নতুন আউটলেটে থাকবে মাত্র ২ হাজার ৭০০টি পণ্য।
আইকিয়ার ঐতিহ্যগত স্টোরগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিস্তৃত প্রদর্শনী এলাকা, যেখানে ক্রেতারা বিভিন্ন ঘরের সাজসজ্জা ও আসবাবপত্রের নমুনা ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। অনেকের জন্য এটি কেনাকাটার পাশাপাশি একটি অভিজ্ঞতাও বটে। কিন্তু নতুন ছোট ফরম্যাটের স্টোরে সেই অভিজ্ঞতা অনেকটাই বদলে যাবে। ক্রেতারা দ্রুত পণ্য খুঁজে দেখতে পারবেন, প্রয়োজনীয় জিনিস বেছে নিতে পারবেন কম সময়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে পুরো স্টোর ঘোরার প্রয়োজনও পড়বে না। ডাউনটাউন টরন্টোর ৬৫ হাজার বর্গফুটের একটি আইকিয়া স্টোরে এক সাক্ষাৎকারে অঞ্চল ব্যবস্থাপক জ্যানেট ম্যাকগোয়ান বলেন, লন্ডনের স্টোরটি মূলত আইকিয়ার নতুন ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। তার ভাষায়, “এটি ছোট স্টোর ফরম্যাটে আমাদের রূপান্তরের প্রতিফলন। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আমরা এ ধরনের মডেল নিয়ে কাজ করছি এবং এটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হচ্ছে।”
খুচরা বাণিজ্যে ছোট স্টোরের এই প্রবণতা কেবল আইকিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ব্র্যান্ড একই পথে হাঁটছে। জাপানি পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লো, ডিসকাউন্ট গ্রোসারি চেইন নো ফ্রিলস, ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতা বেস্ট বাই, ম্যাট্রেস রিটেইলার স্লিপ কান্ট্রি এবং কসমেটিকস ব্র্যান্ড সেফোরা সবাই কানাডায় ছোট আকারের স্টোর চালু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শহর ও জনবহুল এলাকায় বাণিজ্যিক জায়গার ভাড়া এবং পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কম জায়গায় বেশি কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কৌশল বেছে নিচ্ছে। ছোট স্টোর পরিচালনার খরচ কম, অবস্থান নির্বাচন সহজ এবং শহরের কেন্দ্রস্থলে উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগও বেশি।
বর্তমান নগরজীবনে ক্রেতাদের আচরণও দ্রুত বদলাচ্ছে। আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা শপিং মলে কাটানোর পরিবর্তে অনেকেই এখন দ্রুত কেনাকাটা করতে চান। অনলাইন কেনাকাটার বিস্তারও এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। ছোট স্টোরগুলো মূলত ‘কনভেনিয়েন্স’ বা সুবিধাভিত্তিক কেনাকাটার চাহিদা পূরণ করছে। ক্রেতারা স্টোরে গিয়ে পণ্য সরাসরি দেখতে পারবেন, আবার প্রয়োজন হলে অনলাইনে অর্ডার দিয়ে বাসায় ডেলিভারিও নিতে পারবেন। এই মডেলে স্টোরগুলো শোরুম ও বিক্রয়কেন্দ্র দুই ধরনের ভূমিকা পালন করে।
ছোট ফরম্যাটের স্টোর নিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু করেছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও। গত বছর বেস্ট বাই এবং বেল কানাডা যৌথভাবে ১৬৭টি ছোট আকারের স্টোর চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর মধ্যে অন্যতম একটি স্টোর স্থাপন করা হয়েছে টরন্টোর ব্যস্ততম পরিবহন কেন্দ্র ইউনিয়ন স্টেশনে। এই ধরনের অবস্থানগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে কম জায়গায় হলেও বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
খুচরা বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আইকিয়ার নতুন লন্ডন স্টোর শুধু একটি নতুন আউটলেট নয়; এটি খুচরা ব্যবসার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও একটি ইঙ্গিত। একসময় যেখানে বিশাল স্টোরই ছিল ব্র্যান্ডের শক্তির প্রতীক, সেখানে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে সহজলভ্যতা, দ্রুত সেবা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। লন্ডনের নতুন আইকিয়া স্টোর সফল হলে ভবিষ্যতে কানাডার আরও অনেক শহরে একই ধরনের ছোট ফরম্যাটের আউটলেট দেখা যেতে পারে। আর তাতে বদলে যেতে পারে আইকিয়াকে ঘিরে ক্রেতাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
