
কানাডায় ক্রমবর্ধমান খাদ্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে গ্রোসারি স্টোরে কেনাকাটার সময় বাড়তি খরচের চাপ এখন অধিকাংশ পরিবারের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতিতে দেশের গ্রোসারি খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে নতুন খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণা করেছে ফেডারেল সরকার। সরকারের দাবি, এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ছোট ও মাঝারি আকারের গ্রোসারি ব্যবসাগুলোও বড় করপোরেট চেইনগুলোর সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল হিসেবে ভোক্তারা কম দামে খাদ্যপণ্য কিনতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কানাডার গ্রোসারি খাত দীর্ঘদিন ধরেই কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাজারে তাদের আধিপত্য এতটাই বেশি যে স্বাধীন বা স্থানীয় মালিকানাধীন ছোট গ্রোসারি স্টোরগুলো প্রায়শই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। বড় কোম্পানিগুলো বিশাল পরিমাণে পণ্য ক্রয়, উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্কের কারণে কম খরচে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। অন্যদিকে ছোট ব্যবসাগুলোর পক্ষে একই সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে স্বাধীন ব্যবসাগুলোকে অনেক সময় বেশি দামে পণ্য সংগ্রহ করতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলে। নতুন কৌশলটি মূলত এই বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
এক ক্রেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় সব পরিবারের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এখন প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও হিসাব-নিকাশ করে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। ফেডারেল সরকারের মতে, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে বড় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ছোট ব্যবসাগুলোও টিকে থাকার সুযোগ পাবে। এতে মূল্য নির্ধারণে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং ভোক্তাদের জন্য আরও সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি হতে পারে।
একজন গ্রোসারি মালিক বলেন, কানাডার গ্রোসারি বাজার বর্তমানে মূলত দুই থেকে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে স্বাধীন ব্যবসাগুলোর পক্ষে বাজারে টিকে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বড় চেইনগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো সক্ষমতা ছোট ব্যবসাগুলোর নেই। তাই সরকার যদি সত্যিই এমন কোনো উদ্যোগ নেয় যা প্রতিযোগিতার সমতল ক্ষেত্র তৈরি করবে, তবে তা অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। তবে তিনি একইসঙ্গে বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। তার মতে, সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা শুনতে ইতিবাচক হলেও বাস্তবে কীভাবে এই সহায়তা পৌঁছাবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি নতুন কোনো বিতরণকেন্দ্র বা সরবরাহ অবকাঠামো তৈরি করা হয়, তাহলে এর ব্যয়ভার কে বহন করবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নতুন খাদ্য নিরাপত্তা কৌশলের আওতায় সরকার খাদ্যপণ্য কেনা, বিক্রি, পরিবহন এবং দেশব্যাপী বিতরণের পুরো ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও কার্যকর, প্রতিযোগিতামূলক এবং স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, আগামী ১০ বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এই অর্থ খাদ্য সরবরাহ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে নতুন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে ব্যয় করা হতে পারে।
পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কানাডার খাদ্য বাজারে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ ঘোষণা করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। প্রয়োজন হবে কার্যকর নীতিমালা, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং এমন ব্যবস্থা যা সত্যিকার অর্থে ছোট ব্যবসাগুলোকে শক্তিশালী করবে। বর্তমানে কানাডিয়ানরা যে উচ্চ খাদ্যমূল্যের চাপের মুখে রয়েছেন, সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভোক্তারা বাস্তব সুফল পাবেন কি না, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনাটি কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর। সার্বিকভাবে, নতুন খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল কানাডার গ্রোসারি খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। এটি স্বাধীন ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তবে সফলতার চাবিকাঠি থাকবে বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার মধ্যে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
