
ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক আসরে জাতীয় আবেগের গুরুত্ব কতটা গভীর হতে পারে, তার নতুন উদাহরণ তৈরি হয়েছে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে ঘিরে। কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচের দিন নিজ দেশের গ্যালারিতে না থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে উপস্থিত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।
শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসের বিখ্যাত সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ট্রুডোকে দেখা যায়। একই সময়ে টরন্টোতে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলছিল কানাডা। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে বসনিয়া-হারজেগোভিনার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে কানাডিয়ান দল।
বিশ্বকাপের মতো ঐতিহাসিক একটি উপলক্ষে দেশের সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজনকে কানাডার ম্যাচে না দেখে অনেক সমর্থক হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর একটি হিসেবে কানাডার জন্য এটি ছিল একটি বিশেষ মুহূর্ত। বহু বছর ধরে দেশটিতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির যে প্রচেষ্টা চলেছে, সেই প্রেক্ষাপটে উদ্বোধনী ম্যাচটি ছিল জাতীয় গর্বের প্রতীক।
ট্রুডোর উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, দেশের ফুটবল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেন কানাডার পাশে দাঁড়ালেন না। সমালোচনার জবাবে ট্রুডো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “কখনো কখনো সহায়ক বয়ফ্রেন্ডের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে আপনারা সবাই জানেন, কাপ জয়ের প্রশ্নে আমার শিকড় কোথায়।” বার্তার শেষে তিনি কানাডার পতাকার ইমোজিও যুক্ত করেন।
তবে তার এই ব্যাখ্যা বিতর্ক পুরোপুরি থামাতে পারেনি। সমালোচকদের একাংশের মতে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় দলের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে উপস্থিত থাকা ছিল প্রতীকী দায়িত্বের অংশ। অন্যদিকে ট্রুডোর সমর্থকরা বলছেন, তিনি বর্তমানে কোনো সরকারি পদে নেই এবং ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা তার রয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ট্রুডোর বর্তমান সঙ্গী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পপ তারকা Katy Perry। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার বিশেষ পরিবেশনা ছিল। সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এবং সঙ্গীকে সমর্থন জানাতেই ট্রুডো লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে কেটি পেরিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের পতাকার প্রতীকযুক্ত পিন পরতেও দেখা যায়। এর মাধ্যমে তিনি দুই দেশের প্রতিই সমর্থন ও শুভেচ্ছা প্রকাশের বার্তা দিয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
ঘটনাটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ম্যাচে উপস্থিত থাকা না-থাকার প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় পরিচয়, ক্রীড়াবোধ এবং জনজীবনের পরিচিত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে অনেক কানাডিয়ান মনে করেন, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব ও সমর্থন প্রদর্শন করা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অন্যদিকে অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে আসার পর একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে জাতীয় আনুগত্যের মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে জনপরিচিত ব্যক্তিদের প্রতিটি পদক্ষেপই রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে ট্রুডোর মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও জাতীয় বিতর্কে রূপ নিতে পারে।
ফুটবল বিশ্বকাপ বরাবরই জাতীয় আবেগের অন্যতম বড় মঞ্চ। সেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কোথায় বসে খেলা দেখলেন, সেটিও জনআলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে ট্রুডোকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেটিই আবারও প্রমাণ করল। কেউ এটিকে একজন প্রেমিকের স্বাভাবিক সমর্থন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ জাতীয় দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তুলছেন। তবে বিতর্ক যাই হোক না কেন, বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেই জাতীয় গর্ব ও ব্যক্তিগত জীবনের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা।
