
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের কিংস্টন শহরে একটি সড়কের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে আবারও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ‘ইন্ডিয়ান রোড’ নামের একটি আবাসিক সড়কের নতুন নামকরণ নিয়ে এ সপ্তাহেই ভোটাভুটিতে যাচ্ছে কিংস্টন সিটি কাউন্সিল। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শহরের পোর্টসমাউথ অ্যাভিনিউ এলাকার ‘ইন্ডিয়ান রোড’ দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত একটি ঠিকানা। সড়কটিতে প্রায় ৬০টি বাড়ি রয়েছে এবং বহু পরিবার কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সড়কটির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে আসায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ইন্ডিয়ান রোডের দীর্ঘদিনের একজন বাসিন্দা নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করে বলেন, এই রাস্তার নামের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আবেগ জড়িয়ে আছে। প্রায় ৩৭ বছর আগে তিনি এই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তার মতে, রাস্তার নাম পরিবর্তন মানে শুধু একটি সাইনবোর্ড বদলানো নয়, বরং এলাকার ইতিহাস ও বাসিন্দাদের পরিচয়ের একটি অংশ মুছে ফেলা। বাসিন্দা বলেন, “মনে হচ্ছে তারা আমার বাড়ির একটি অংশ কেড়ে নিচ্ছে। আমি এখানে বহু বছর ধরে আছি। এই নামের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, ‘ইন্ডিয়ান রোড’ নামটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি অসম্মান নয়, বরং সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তার ভাষায়, “আমার পরিবারে ফার্স্ট নেশন সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছেন। আমার অনেক বন্ধু ফার্স্ট নেশন থেকে আসা। আমি সবসময় এই নামটিকে তাদের প্রতি সম্মানের প্রতীক হিসেবেই দেখেছি। তারা শক্তিশালী, জ্ঞানী ও সম্মানিত মানুষ।”
বিতর্কের মধ্যে স্থানীয় সিটি কাউন্সিলর জেফ ম্যাকলারেন নিজ উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করেন। সেই জরিপে দেখা যায়, এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দাই রাস্তার নাম পরিবর্তনের পক্ষে নন। ম্যাকলারেনের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত নতুন নামগুলোর প্রতি স্থানীয়দের সমর্থন অত্যন্ত কম। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮৫ শতাংশ চারটি সম্ভাব্য বিকল্প নামের সবকটিই প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে বোঝা যায়, নাম পরিবর্তনের প্রশ্নে শুধু আবেগ নয়, স্থানীয় জনগণের মধ্যে বাস্তবিক অনীহাও রয়েছে।
রাস্তার নতুন নাম হিসেবে আদিবাসী ভাষা থেকে নেওয়া চারটি নামের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নামগুলো হলো : আকি – যার অর্থ পৃথিবী বা ভূমি। বিনেসি – অর্থ বৃহৎ পাখি বা থান্ডারবার্ড। নুকোমিস – অর্থ দাদী বা গ্র্যান্ডমাদার। ওডামিনো – অর্থ খেলা বা খেলাধুলা। নামগুলো স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একজন কমিউনিটি সংগঠক বলেন, “ইন্ডিয়ান” শব্দটি বর্তমানে অনেক আদিবাসীর কাছে পুরোনো এবং অপমানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। তার মতে, উপনিবেশিক যুগের পরিভাষা ব্যবহার না করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি। মারাকেল বলেন, একটি রাস্তার নাম কেবল দিকনির্দেশনার মাধ্যম নয়; এটি সমাজের মূল্যবোধ ও ইতিহাসেরও প্রতিফলন। তাই আদিবাসী জনগণের সম্মান ও পরিচয় রক্ষার জন্য আরও উপযুক্ত নাম নির্বাচন করা প্রয়োজন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘ইন্ডিয়ান রোড’-এর নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটি এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দু’বার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে প্রতিবারই মতবিরোধ ও জনমতের কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এবার সিটি কাউন্সিলের ভোটাভুটির মাধ্যমে বিষয়টির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে। তবে ভোটের ফল যাই হোক না কেন, বিতর্কটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্নে সমাজের বিভিন্ন অংশের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও এক নয়।
কিংস্টনের এই বিতর্ক আসলে কানাডার বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশজুড়ে বহু রাস্তা, ভবন, স্কুল এবং সরকারি স্থাপনার নাম পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল উপনিবেশিক অতীতের বিতর্কিত শব্দ ও প্রতীকগুলোর পরিবর্তে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় তুলে ধরা। তবে এমন উদ্যোগ প্রায়ই স্থানীয় জনগণের আবেগ, ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একদিকে রয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির দাবি, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের বাসিন্দাদের স্মৃতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন। ফলে ‘ইন্ডিয়ান রোড’ বিতর্ক কেবল একটি রাস্তার নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি কানাডায় ইতিহাসের ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিয়ে চলমান বৃহত্তর আলোচনারই একটি অংশ।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
