
কয়েক দশক ধরে স্কারবোরোর ৩৬৫০ নম্বর ফ্যাসিলিটিতে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারক কারখানা পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে ২০২৩ সাল থেকে সেই পুরোনো শিল্প স্থাপনাটি রূপ নিয়েছে একটি আধুনিক ডেটা সেন্টারে। বর্তমানে এটি ৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তথ্যভাণ্ডার কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনা করছে স্ট্যাক ইনফ্রাস্ট্রাকচার। কিন্তু প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও এই ডেটা সেন্টার ইতোমধ্যে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর নজরে এসেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ক্লাইমেট ফাস্টের সদস্য আনা হার্ডির মতে, ডেটা সেন্টারটির কার্যক্রম ঘিরে স্থানীয় জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে শব্দ দূষণ এবং কার্বন নিঃসরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হার্ডি বলেন, “ডেটা সেন্টার কর্তৃপক্ষ নিজস্বভাবে শব্দ ও দূষণের মাত্রা পরিমাপ করে এবং সেই তথ্য পরিবেশ, সংরক্ষণ ও পার্কস মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেয়। কিন্তু বাস্তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে সেই মানদণ্ড অনুসরণ করবে কি না, তা নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে।” তার মতে, অন্টারিওজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া ডেটা সেন্টারগুলোর অবস্থান, কার্যক্রম এবং সেগুলোর কারণে স্থানীয় আবাসিক এলাকাগুলো কী ধরনের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে, সে সম্পর্কে জনগণের স্বচ্ছ তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ডেটা সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সাইনেট হাই পারফরম্যান্স কম্পিউটিং কনসোর্টিয়ামের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড্যানিয়েল গ্রানার বলেন, সাধারণভাবে ডেটা সেন্টার হলো এমন একটি স্থাপনা যেখানে অসংখ্য শক্তিশালী কম্পিউটার সার্বক্ষণিক তথ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের কাজ করে। তিনি বলেন, “এআই প্রযুক্তির প্রসারের অর্থ হচ্ছে আরও বেশি সংখ্যক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটারের ব্যবহার। আর এসব কম্পিউটার বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফলে ডেটা সেন্টারের জ্বালানি চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
বর্তমানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ডিজিটাল কর্মকাণ্ড কোনো না কোনো ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্লাউড স্টোরেজ, ভিডিও স্ট্রিমিং কিংবা অনলাইন যোগাযোগ সবকিছুর পেছনেই রয়েছে বিশাল তথ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো। টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ডাইভারসিটি ইনস্টিটিউটের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যবস্থাপক ভিয়েট ভু বলেন, “আপনার ইনস্টাগ্রাম পোস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের বার্তা কিংবা অনলাইনে সংরক্ষিত তথ্য সবকিছুই কোনো না কোনো ডেটা সেন্টারে রাখা হয়। কিন্তু এসব কেন্দ্র পরিচালনা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, এর জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, পানি ও অবকাঠামোগত সম্পদের প্রয়োজন হয়।”
উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব স্থাপনা পরিচালনার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে সার্ভারগুলোকে ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হয়। পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন, ডেটা সেন্টারের বিস্তার দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি, স্থানীয় পানির উৎসের ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে এআই-নির্ভর প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরের ডেটা সেন্টার নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে স্ট্যাক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের স্কারবোরো ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা ৮ মেগাওয়াট। তবে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে এটিকে ৫৬ মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে। শক্তি বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রায় ৫৬ হাজার পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। ফলে এত বড় সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অর্থনৈতিক গবেষক ভিয়েট ভুর মতে, অন্তত কানাডার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্বেগ তুলনামূলক কম। কারণ দেশটিতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন এবং পানির প্রাপ্যতা বিশ্বের অনেক অঞ্চলের তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, “টরন্টো ও কানাডার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ এবং পানির উৎস রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে ডেটা সেন্টার পরিচালনার ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা দেখা যায়, কানাডা সেই অবস্থানে নেই।”
ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব, শব্দ দূষণ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য স্ট্যাক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ডেটা সেন্টার আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতির অপরিহার্য অবকাঠামো হলেও এর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ও আকার দ্রুত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
