লিবার্টি ভিলেজে হত্যা মামলার আসামী নতুন বয়ান দিলেন

Historic brick building at a busy city intersection, flanked by modern high‑rise towers as cars pass and pedestrians cross the street.
টরন্টোর আদালতে শুক্রবার দেওয়া সাক্ষ্যে খোয়া ট্র্যান বলেন রিয়াজ হাবিবের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব কয়েক বছরের পুরোনো

কানাডার টরন্টোর আলোচিত লিবার্টি ভিলেজ হত্যাকাণ্ড মামলায় নতুন মোড় এসেছে। প্রতিবেশী চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজ হাবিবের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত খোয়া ট্র্যান আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে দাবি করেছেন, ২০২৩ সালের জুন মাসে ঘটে যাওয়া ওই মৃত্যুর ঘটনায় তার কোনো ভূমিকা ছিল না। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী হলেও শেষ কয়েক মাসে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল বলে আদালতকে জানিয়েছেন তিনি। তবে সেই বিরোধ কখনও হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে না বলেও দাবি করেন ট্র্যান।

টরন্টোর আদালতে শুক্রবার দেওয়া সাক্ষ্যে খোয়া ট্র্যান বলেন, রিয়াজ হাবিবের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব কয়েক বছরের পুরোনো। একই টাউনহাউজ কমপ্লেক্সে বসবাসের সুবাদে তারা নিয়মিত কথাবার্তা বলতেন, কখনও কখনও একসঙ্গে সময় কাটাতেন এবং বিয়ারও পান করতেন। কিন্তু ২০২৩ সালের বসন্তে তাদের সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।

- Advertisement -

ট্র্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ব্যবহৃত চারকোল বারবিকিউ থেকে ওঠা ধোঁয়া নিয়ে হাবিব আপত্তি জানাতে শুরু করেন। প্রথমদিকে বিষয়টি সাধারণ প্রতিবেশীসুলভ অভিযোগ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিরোধ ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। আদালতে ট্র্যান দাবি করেন, সমস্যার সমাধানে তিনি কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও হাবিব তাতে সহযোগিতা করেননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, শেষ দিকের কথোপকথনে হাবিবের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক এবং আক্রমণাত্মক। ট্র্যানের দাবি, একপর্যায়ে হাবিব তাকে এবং তার স্ত্রী কুইন (ইসাবেলে) নিগুয়েনকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার হুমকিও দেন। আদালতে তিনি হাবিবকে সে সময় ‘রাগান্বিত, বিবর্ণ এবং অসুস্থ দেখাচ্ছিল’ বলে বর্ণনা করেন।

মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২০২৩ সালের ৬ জুন রাতের ঘটনা। ওই রাতেই রিয়াজ হাবিবের মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। সাক্ষ্যে ট্র্যান বলেন, সেদিন তিনি গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছিলেন। ক্লান্ত হয়ে একটি চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় ওপরতলা থেকে হঠাৎ চিৎকারের শব্দ শুনতে পান। তার ভাষ্য, “চোখ খুলতেই মনে হলো কেউ দ্রুত দৌড়ে আমার দিকে আসছে। এরপর এমন একটি শব্দ শুনলাম, যেন কেউ সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে। তারপর সবকিছু একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায়।” তিনি আরও জানান, ঘটনাটি শোনার পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু আশপাশে কাউকে দেখতে পাননি। পুরো এলাকা তখন শান্ত ছিল এবং কোনো ধরনের গোলযোগ বা কথাবার্তার শব্দও তার কানে আসেনি।

দুই দিন পর, অর্থাৎ ২০২৩ সালের ৮ জুন, টরন্টোর ওস্টোর্ন ব্যাটারি রোডের একটি টাউনহাউজ কমপ্লেক্সে কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় রিয়াজ হাবিবের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো এলাকাকে নাড়িয়ে দেয়। তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে হাবিবের নিচতলার বাসিন্দা খোয়া ট্র্যানকে সন্দেহের তালিকায় আনে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে মৃতদেহ অবমাননা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ আরও গুরুতর হয়ে ওঠে এবং তা সেকেন্ড-ডিগ্রি মার্ডারে উন্নীত করা হয়। অন্যদিকে ট্র্যানের স্ত্রী কুইন (ইসাবেলে) নিগুয়েনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন।

মামলার অন্যতম বিতর্কিত প্রমাণ হলো নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ। ওই ফুটেজে দেখা যায়, হাবিবের মরদেহ উদ্ধারের কিছুদিন আগে ট্র্যান হাবিবের একটি বাইক আবর্জনার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। প্রসিকিউশনের মতে, এই আচরণ সন্দেহজনক এবং এটি অপরাধ আড়াল করার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে আদালতে ট্র্যান ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, ঘটনাটি বাইরে থেকে সন্দেহজনক মনে হতে পারে। কিন্তু তার দাবি, কয়েক দিন আগে বারবিকিউ নিয়ে হাবিবের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর রাগের বশে তিনি ওই কাজ করেছিলেন। তিনি এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে হাবিবের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।”

মামলাটি এখন বিচারপর্বের চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। আদালতে ট্র্যানের সাক্ষ্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে রয়েছে প্রতিবেশীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের তথ্য, অন্যদিকে রয়েছে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অভিযুক্তকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয় প্রমাণের প্রশ্ন। প্রসিকিউশন পক্ষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রিয়াজ হাবিবের মৃত্যুর সঙ্গে খোয়া ট্র্যানের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা আইনজীবীরা চেষ্টা করছেন দেখাতে যে, প্রতিবেশী বিরোধ থাকলেও সেটি হত্যার উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনার প্রমাণ নয়।

রিয়াজ হাবিব ছিলেন টরন্টোভিত্তিক একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার রহস্যজনক মৃত্যু এবং পরবর্তীতে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ কানাডার সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ফলে মামলাটির প্রতিটি শুনানি এখন জনসাধারণ এবং গণমাধ্যমের নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। খোয়া ট্র্যান এবং তার স্ত্রী কুইন নিগুয়েন উভয়েই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। আদালতের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত তারা আইনগতভাবে নির্দোষ বলেই বিবেচিত হবেন। তবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই বহুল আলোচিত মামলার পরিণতি কী দাঁড়ায়, সেদিকেই এখন নজর টরন্টোবাসীর।

- Advertisement -

Read More

Recent