
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো দর্শক উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে ভিড় জমাবেন। সেই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপের ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে দর্শকদের জন্য কোন শহর সবচেয়ে সুবিধাজনক তা নিয়ে একটি বিশেষ মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে খ্যাতনামা ক্রীড়াবিষয়ক ম্যাগাজিন স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড। সেই তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে কানাডার ভ্যানকুভার, যা পরিবহন ব্যবস্থা, হাঁটার উপযোগী নগর পরিকল্পনা, আবহাওয়া এবং দর্শকবান্ধব সুযোগ-সুবিধার কারণে অন্য সব শহরকে ছাড়িয়ে গেছে।
এ মাসে প্রকাশিত এই র্যাংকিংয়ে দেখা গেছে, শুধু ভ্যানকুভারই নয়, কানাডার আরেক বিশ্বকাপ আয়োজক শহর টরন্টোও শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তালিকায় টরন্টোর অবস্থান তৃতীয়, আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল। অর্থাৎ উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ আয়োজনের ক্ষেত্রে কানাডার দুই শহরই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভ্যানকুভারের সবচেয়ে বড় শক্তি এর উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা। শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে আশপাশের উপশহরগুলোকে দ্রুত ও সহজে ডাউনটাউনের সঙ্গে যুক্ত করেছে স্কাইট্রেন নেটওয়ার্ক। ফলে বিদেশি দর্শকদের জন্য বিমানবন্দর থেকে স্টেডিয়াম বা শহরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানো অত্যন্ত সহজ। যদিও প্রতিবেদনে স্কাইট্রেনের বিভিন্ন লাইন যেমন এক্সপো লাইন, মিলেনিয়াম লাইন এবং কানাডা লাইনের মধ্যে আলাদা করে পার্থক্য তুলে ধরা হয়নি, তবুও সামগ্রিকভাবে এই রেলব্যবস্থাকে বিশ্বকাপ দর্শকদের জন্য অন্যতম বড় সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ভ্যানকুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়াম শহরের ডাউনটাউনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। ফলে স্টেডিয়ামের আশপাশেই রয়েছে অসংখ্য হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং পর্যটনকেন্দ্র। দর্শকদের ম্যাচ দেখতে গিয়ে অন্য অনেক আয়োজক শহরের মতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে না। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে যেখানে যাতায়াতের ঝামেলা প্রায়ই দর্শকদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে ভ্যানকুভারের এই সুবিধা শহরটিকে বাড়তি নম্বর এনে দিয়েছে।
ভ্যানকুভারের আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো এর আবহাওয়া। উত্তর আমেরিকার অনেক শহরে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকলেও ভ্যানকুভারে তুলনামূলকভাবে মৃদু ও আরামদায়ক আবহাওয়া বিরাজ করে। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় গরমও তেমন অসহনীয় হয় না। এছাড়া শহরের চারপাশে সমুদ্রসৈকত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং উন্মুক্ত পরিবেশ দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে ম্যাচের পাশাপাশি পর্যটনের অভিজ্ঞতাও সমানভাবে উপভোগ করা সম্ভব হবে।
স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ম্যাগাজিনটির মতে, মার্কিন ডলার ও ইউরোর তুলনায় কানাডিয়ান ডলারের বিনিময়মূল্য বিদেশি দর্শকদের জন্য কিছুটা সুবিধাজনক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আসা সমর্থকদের কাছে ভ্যানকুভারে থাকা, খাওয়া এবং অন্যান্য ব্যয় অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মনে হতে পারে।
র্যাংকিংয়ে তৃতীয় স্থান পাওয়া টরন্টোকেও দর্শকবান্ধব শহর হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। উন্নত গণপরিবহন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের অবকাঠামোর কারণে টরন্টোও বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য অন্যতম প্রস্তুত শহর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপে কানাডার দুই আয়োজক শহরই আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হতে পারে।
অন্যদিকে তালিকার সর্বশেষ স্থানে রয়েছে সান ফ্রান্সিস্কো। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যে স্টেডিয়ামে, সেটি শহরের কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ফলে দর্শকদের দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করতে হবে, যা সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নগরী নিউইয়র্ক এবং প্রতিবেশী নিউ জার্সিও প্রত্যাশিত অবস্থানে নেই। র্যাংকিংয়ে এই দুই শহরের অবস্থান যথাক্রমে ১৩তম ও ১৬তম। স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডের মতে, তীব্র যানজট এবং স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগার বিষয়টি দর্শকদের জন্য বড় অসুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই র্যাংকিংয়ে কেবল স্টেডিয়ামের মান নয়, বরং একজন দর্শক বিমানবন্দরে নামার পর থেকে ম্যাচ দেখে শহর ঘুরে আবার ফিরে যাওয়া পর্যন্ত পুরো অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবহন, স্টেডিয়ামের অবস্থান, হাঁটার সুবিধা, আবহাওয়া, পর্যটন আকর্ষণ এবং ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করেই তালিকা তৈরি করেছে স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড।
এই মূল্যায়ন বিশ্বকাপে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা সমর্থকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কেবল আধুনিক স্টেডিয়াম থাকলেই একটি শহর আদর্শ আয়োজক হয়ে ওঠে না; বরং দর্শকদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন উন্নত নগর পরিকল্পনা, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ যেখানে ভ্যানকুভার বর্তমানে অন্য সব শহরের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।
