এক মুসলিম খামার মালিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা

A street campaign scene with a crowd of supporters holding red-and-white signs urging votes for a candidate, outside a restaurant.
মহসিন ভুইয়া এবং তার পরিবার আশা করছেন যারা অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে এবং সরাসরি হুমকি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে

অন্টারিওর ক্ল্যারিংটন এলাকার এক মুসলিম খামার মালিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং চরমপন্থী হুমকির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিত্তিহীন তথ্য ও গুজবের জেরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিবারটি এখন নিজেদের বাড়িতেও নিরাপদ বোধ করছে না। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মহসিন ভুইয়া, যিনি বোম্যানভিল এলাকায় একটি ছোট আকারের হবি ফার্ম পরিচালনা করেন। তার খামারে মৌসুমি সবজি চাষের পাশাপাশি হাঁস, ডিমপাড়া মুরগি, কবুতর এবং খরগোশ পালন করা হয়। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই খামারকে ঘিরেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

মহসিন ভুইয়ার দাবি, গত চার সপ্তাহ ধরে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার খামারকে নিয়ে একের পর এক ষড়যন্ত্রমূলক পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, তার খামারে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয় এবং অবৈধভাবে প্রাণী হত্যা করা হয়। তিনি এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অনলাইনে ছড়ানো মিথ্যা প্রচারণা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তার বাড়ির সামনে বিক্ষোভ হয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং এমনকি ড্রোন ব্যবহার করে তাদের বাড়ি ও খামারের ওপর নজরদারির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

- Advertisement -

এই প্রতিবেদক মহসিন ভুইয়া জানান, তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখন মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার ভাষায়, এখন তাদের কাছে বাড়ি আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়। সব সময়ই মনে হয় কেউ তাদের ওপর নজর রাখছে। কখনও বাড়ির বাইরে অপরিচিত মানুষের উপস্থিতি, কখনও ড্রোন উড়তে দেখা, আবার কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে গুজব ছড়িয়ে পড়া এসব কারণে পরিবারটি সবসময় আতঙ্কে থাকে। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে এমন মন্তব্যও করা হয়েছে যেখানে তাদের “দেশে ফেরত পাঠানো” কিংবা “হত্যা করার” মতো উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এসব মন্তব্য শুধু তাদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, বরং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার দাবি, আগে যেসব প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল, এখন সেই পরিবেশও বদলে গেছে।

ঘটনার পর মহসিন ভুইয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস (এনসিসিএম)। সংগঠনটি বলেছে, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিরোধ নয়; বরং কানাডায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়ার একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ। এনসিসিএমের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং ষড়যন্ত্রমূলক তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। অনলাইন বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব জীবনে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার রূপ নিচ্ছে। সংগঠনটি আরও দাবি করেছে, গত তিন বছরে কানাডায় সহিংস ও পদ্ধতিগত ইসলামোফোবিয়ার ঘটনা প্রায় ১,৮০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কেবল একজন ব্যক্তি নয়, পুরো একটি পরিবার বা সম্প্রদায়ের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা দ্রুত সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রূপ নেয়। কানাডার মতো বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে শক্তিশালী রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরছেন। তাদের মতে, অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার দিকেও নজর রয়েছে। মহসিন ভুইয়া এবং তার পরিবার আশা করছেন, যারা অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে এবং সরাসরি হুমকি দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে একজন ব্যক্তি বা পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানানো গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা। তাই এ ধরনের বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ

- Advertisement -

Read More

Recent