
দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে কঠোর ব্যয়সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে কানাডার টরন্টোর দুটি বৃহৎ পাবলিক স্কুল বোর্ড। শিক্ষকসংখ্যা কমানো, বিভিন্ন শিক্ষা ও সহায়ক কর্মসূচি সংকুচিত করা এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপের ফলে ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হলেও, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এখনও ঘাটতিপূর্ণ অবস্থায় অনুমোদন করতে হয়েছে। প্রাদেশিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড (টিডিএসবি) এবং টরন্টো ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড (টিসিডিএসবি) দুটি প্রতিষ্ঠানই নতুন অর্থবছরের বাজেট অনুমোদন করেছে, যেখানে আগের তুলনায় ঘাটতি কমলেও আর্থিক ভারসাম্য পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
টিডিএসবির প্রকাশিত বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অথচ বছরের শুরুতে এই ঘাটতির পরিমাণ ৭ কোটি ৪৫ লাখ ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিভিন্ন ব্যয়সংকোচনমূলক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বোর্ড প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ ডলার সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছে। এই সাশ্রয়ের বড় অংশ এসেছে শিক্ষকসংখ্যা কমানো, কিছু শিক্ষা কর্মসূচি বন্ধ বা সীমিত করা এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। বোর্ডের বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় বর্তমান ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের পথে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
টিডিএসবি কর্তৃপক্ষের দাবি, কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেও তারা এমনভাবে বাজেট পুনর্বিন্যাস করেছে যাতে শ্রেণিকক্ষের মূল শিক্ষা কার্যক্রম সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ও একাডেমিক অর্জন ধরে রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যদিও বাজেট কমানোর কারণে কিছু সহায়ক কর্মসূচি ও মানবসম্পদে কাটছাঁট করতে হয়েছে, তবুও শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
বর্তমানে অন্টারিও প্রদেশের অধীনে পরিচালিত আটটি স্কুল বোর্ডের মধ্যে রয়েছে টিডিএসবি ও টিসিডিএসবি। প্রাদেশিক সরকার অভিযোগ করেছিল যে, এসব বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অব্যবস্থাপনা, ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচিত বোর্ডের পরিবর্তে প্রদেশ বিশেষ তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করে, যারা সরাসরি আর্থিক সংস্কার এবং ব্যয়সংকোচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, টরন্টো ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড (টিসিডিএসবি)ও ঘাটতিপূর্ণ বাজেট অনুমোদন করেছে। বোর্ডের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের সম্ভাব্য ঘাটতি ৩ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। যদিও প্রাথমিকভাবে এই ঘাটতি ৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়কের নেওয়া ব্যয়সংকোচনমূলক পদক্ষেপের ফলেই এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে জানিয়েছে বোর্ড। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক পর্যায়ের কর্মীসংখ্যা কমানো, কেন্দ্রীয় দপ্তরের ব্যয় সংকুচিত করা এবং কর্মদিবসে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঘাটতি কমানো অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে শিক্ষকসংখ্যা ও বিভিন্ন শিক্ষা কর্মসূচি কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের সহায়তা সেবা এবং অতিরিক্ত শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক শহর হিসেবে পরিচিত টরন্টোতে আন্তর্জাতিক ভাষা কর্মসূচি সংকুচিত হওয়ায় অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে শিক্ষকসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত শিক্ষাসহায়তা কমে যাওয়া এবং শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রাদেশিক তত্ত্বাবধায়কদের মূল লক্ষ্য হলো কয়েক বছরের মধ্যে দুই বোর্ডকেই ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের আওতায় ফিরিয়ে আনা। এজন্য আগামী বছরগুলোতেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যোগ অব্যাহত থাকতে পারে। যদিও চলতি বছরের বাজেটে ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি, তবুও প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় বড় অঙ্কের সাশ্রয় দেখাতে পারায় দুই বোর্ডই এটিকে আর্থিক পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এই সাশ্রয়ের মূল্য কতটা শিক্ষার গুণগত মানে প্রভাব ফেলবে, সেটিই আগামী দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
