
মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে, যা সাধারণ বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যের ২৯ বছর বয়সী ক্যারোলিনা প্যাকেনাইটেরের কাছে মাউন্ট এভারেস্ট জয় তেমনই এক স্বপ্ন। তবে এই স্বপ্নের বিশেষত্ব হলো, তিনি একই সঙ্গে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারানোর পথে এগিয়ে চলেছেন। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। বরং নিজের অবশিষ্ট দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর এই কঠিন অভিযানে তাকে সহায়তা করছে কানাডার টরন্টো অঞ্চলের দুই উদ্ভাবকের তৈরি অত্যাধুনিক একটি সেন্সরি ভেস্ট, যা কম্পনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দেয়।
ক্যারোলিনার বয়স যখন মাত্র ১৯ বছর, তখন তার শরীরে ধরা পড়ে আশার সিন্ড্রোম। এটি একটি বিরল জেনেটিক রোগ, যা ধীরে ধীরে মানুষের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। অধিকাংশ রোগীর মতো ক্যারোলিনার ক্ষেত্রেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি ক্রমশ কমে আসছে। এই বাস্তবতা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং তিনি নিজের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। তার বিশ্বাস, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জীবনের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি ইচ্ছাশক্তি অটুট থাকে।
এভারেস্টের বেজক্যাম্পে পৌঁছানো ছিল ক্যারোলিনার বহুদিনের স্বপ্ন। তিন বছর আগে তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করেন। কিন্তু সেই সফরই তার জীবনের লক্ষ্যকে আরও বড় করে তোলে। বেজক্যাম্পে অবস্থানকালে তিনি এমন এক পর্বতারোহী দলের সঙ্গে পরিচিত হন, যারা বিশ্বের প্রথম বধির ব্যক্তি হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই মুহূর্তেই তার মনে একটি প্রশ্ন জাগে এখন পর্যন্ত কি কোনো অন্ধ-বধির ব্যক্তি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছাতে পেরেছেন? উত্তর ছিল ‘না’। এই তথ্যই তার মনে নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। ক্যারোলিনা বলেন, “তখন থেকেই একটি প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে ফিরছে যদি এখনও কেউ এটি করতে না পারে, তাহলে আমি কেন চেষ্টা করব না? সেই চিন্তা আমাকে আর ছাড়েনি। এখনও আমি সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।”
এভারেস্ট অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরাপদ পথ চিনে এগিয়ে যাওয়া। যেখানে অধিকাংশ পর্বতারোহী চোখ ও কানের ওপর নির্ভর করেন, সেখানে ক্যারোলিনার জন্য প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা। এই সময় তার পাশে দাঁড়ান ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো মিসিসোগা-এর হিউম্যান-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন গবেষক লিওন লু। প্রায় পাঁচ বছর আগে গ্রিসে একটি আন্তর্জাতিক অ্যাকসেসিবিলিটি সম্মেলনে প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের। সেখানে লিওন লু এমন একটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছিলেন, যা কম্পনের মাধ্যমে অন্ধ শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করে। এই প্রযুক্তিই ক্যারোলিনার নজর কাড়ে। পরে যখন তিনি এভারেস্টে ওঠার পরিকল্পনা শুরু করেন, তখন আবারও লিওন লুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক গবেষণা ও উদ্ভাবনের পথ।
লিওন লু ও তার সহকর্মীরা এমন একটি বিশেষ সেন্সরি ভেস্ট তৈরি করেছেন, যা ব্যবহারকারীর শরীরের বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম কম্পনের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেয়। এই ভেস্ট আশপাশের পরিবেশ বিশ্লেষণ করে দিকনির্দেশনা, প্রতিবন্ধকতার অবস্থান কিংবা চলার নিরাপদ পথ সম্পর্কে সংকেত দেয়। ফলে দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি সীমিত হলেও ব্যবহারকারী পরিবেশ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ধারণা পেতে পারেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তি শুধু পর্বতারোহণ নয়, বরং দৃষ্টি ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
ক্যারোলিনা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তার লক্ষ্য কেবল একটি রেকর্ড গড়া নয়। তিনি চান, বিশ্বের কোটি কোটি প্রতিবন্ধী মানুষ বুঝতে পারুক যে সীমাবদ্ধতা মানেই সম্ভাবনার শেষ নয়। তার মতে, অভিযানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
আধুনিক সহায়ক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তন এনে দিচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর প্রযুক্তি এবং হ্যাপটিক ফিডব্যাকের মতো উদ্ভাবন এমন সব কাজকে সম্ভব করে তুলছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। ক্যারোলিনা প্যাকেনাইটেরের এভারেস্ট অভিযান তাই শুধু একটি পর্বতারোহণের গল্প নয়। এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের এক অনন্য উদাহরণ। যদি তিনি সফল হন, তবে ইতিহাসে প্রথম অন্ধ-বধির ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছানোর গৌরব অর্জন করবেন এবং লাখো মানুষের কাছে হয়ে উঠবেন সাহস ও দৃঢ়তার নতুন প্রতীক।
রেজাউল হক : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ
