
অন্টারিওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর মিসিসোগা আবারও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে রাজনৈতিক লড়াই। একদিকে বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশ, অন্যদিকে দীর্ঘ এক দশক শহর পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে আবারও নির্বাচনী মাঠে ফিরছেন সাবেক মেয়র ব্রনি (বনি) ক্রম্বি। পাশাপাশি বর্তমান সিটি কাউন্সিলর আলভিন টেডজো ও দিপিকা ডেমার্লাও মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে এবারের নির্বাচনকে মিসিসোগার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোববার ব্রনি ক্রম্বি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি মঙ্গলবার মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক জল্পনার অবসান ঘটেছে।
ব্রনি ক্রম্বি ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো মিসিসোগার মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর টানা তিন মেয়াদে, অর্থাৎ ২০২৪ সাল পর্যন্ত শহরের সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে নগর উন্নয়ন, অবকাঠামো, পরিবহন, আবাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলে সমর্থকরা দাবি করেন। তবে ২০২৪ সালে মেয়রের পদ ছেড়ে তিনি প্রাদেশিক রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং অন্টারিও লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে দলটি ২০২৫ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে আগের তুলনায় ভালো ফল করে এবং পুনরায় আনুষ্ঠানিক বিরোধী দলের মর্যাদা ফিরে পেতে সক্ষম হয়। যদিও ব্যক্তিগতভাবে ক্রম্বি নিজের নির্বাচনী আসন মিসিসোগা রাইডিং থেকে জয়ী হতে পারেননি। পরবর্তীতে দলের নেতৃত্ব নিয়ে পর্যালোচনা বা লিডারশিপ রিভিউয়ের পর তিনি চলতি বছরের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর থেকেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয় তিনি কি আবার স্থানীয় রাজনীতিতে ফিরে আসবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল তার সাম্প্রতিক ঘোষণায়।
অন্যদিকে বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশও নির্বাচনী প্রচারণা জোরদার করেছেন। ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়া প্যারিশ শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে দেখা যায়, উপনির্বাচনে তার বিজয়ের পর ব্রনি ক্রম্বি তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এমনকি প্যারিশের প্রশংসা করে গানও গাইতে দেখা যায় সাবেক মেয়রকে। ভিডিওটি শেয়ার করে প্যারিশ কটাক্ষের সুরে লেখেন, “আজ কমিউনিটি বারবিকিউ অনুষ্ঠানে বনি ক্রম্বি বলেছেন, মিসিসোগার স্থিতিশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমি তার সঙ্গে একমত। তবে আমি মনে করি, সেই স্থিতিশীল নেতৃত্ব ইতোমধ্যেই রয়েছে। আমাদের অন্য কোনো স্তরের সরকারের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমরা পুরোপুরি মিসিসোগার মানুষ ও এই শহরের উন্নয়নের প্রতি নিবেদিত। আশা করি, সবাই এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একমত হবেন।” প্যারিশের এই বক্তব্য মূলত ভোটারদের কাছে একটি বার্তা তিনি নিজেকে শহরের বর্তমান এবং কার্যকর নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
ব্রনি ক্রম্বির সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের একটি পুরনো মন্তব্যও আবার আলোচনায় এসেছে। গত মার্চে সাংবাদিকরা যখন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ক্রম্বি যদি আবার মিসিসোগার মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে জবাবে ফোর্ড রসিকতার সুরে বলেছিলেন, “এমন হলে আমি মিসিসোগায় আর্মি পাঠাব।” তিনি আরও বলেন, “আমি সাধারণত কখনোই পৌর নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করি না। কিন্তু যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশকে সমর্থন দিতে আমি সেখানে আর্মি পাঠাব।” যদিও মন্তব্যটি রাজনৈতিক রসিকতা হিসেবেই দেখা হয়েছিল, তবুও তা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
মিসিসোগা কানাডার দ্রুত বর্ধনশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি। বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলের অন্যতম প্রধান এই নগরীতে পরিবহন, আবাসন সংকট, নগর পরিকল্পনা, কর কাঠামো এবং অবকাঠামো উন্নয়ন আগামী দিনের বড় ইস্যু হতে যাচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ব্রনি ক্রম্বি নিজেকে আবারও শহরের নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন। অন্যদিকে বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশ দাবি করছেন, তার নেতৃত্বেই শহর স্থিতিশীল রয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
এই নির্বাচন কেবল দুই প্রভাবশালী রাজনীতিকের ব্যক্তিগত লড়াই নয়; বরং এটি মিসিসোগার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। ক্রম্বির পক্ষে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং শহরের উন্নয়নে তার পূর্ববর্তী ভূমিকার স্মৃতি। অপরদিকে প্যারিশ বর্তমান প্রশাসনের ধারাবাহিকতা, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন। এছাড়া আলভিন টেডজো ও দিপিকা ডেমার্লার মতো নতুন প্রজন্মের প্রার্থীরাও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোটের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে মনোনয়ন দাখিলের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিসিসোগার মেয়র নির্বাচন এখন কানাডার স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে প্রার্থীদের প্রচার, নীতিগত বিতর্ক এবং ভোটারদের সমর্থন অর্জনের লড়াইই নির্ধারণ করবে মিসিসোগার নেতৃত্বে আবারও কি ফিরবেন ব্রনি ক্রম্বি, নাকি দায়িত্ব ধরে রাখবেন বর্তমান মেয়র ক্যারোলিন প্যারিশ।
