
চিতায় জ্বলে উঠা দাউ দাউ করা লাশের ছবি দেখেছি,
সত্যি সত্যি দেখিনি, সবটাই সিনেমায়,
সিনেমা তো জীবনেরই কথা বলে ,সেখানে আমার,
তোমার আমার পূৰ্বপুরূষের গল্প, কোনটাই মিছে নয় ,
নয় কোন জুজুবুড়ির বানানো কল্প কাহিনী !
আমি পড়তাম সেসব কাহিনী, বাল্য বিধবাদের আগুনে ঝলসানোর সে সব গল্প, আশতিপর বৃদ্ধার মৃত্যুতে নয়বছর বয়সী বালিকার চিতায় পোড়ানোর আত্মত্যাগ ,এটা কি শুধু আত্মত্যাগ নাকি জীবন্ত সমাজের সবাই মিলে জলন্ত খুন?
নয় বছরের বালিকা জানেনা বিয়ে কি ,স্বামী কি ?
শাখ,উলু, বরমাল্য, বাসর, পুরষের কাম, ভালোবাসা কিচ্ছু জানেনি, কিচ্ছু না ,
বাবাকে বলেছিলো, “বাবা আমাকে একটা লাল পেড়ে সাদা শাড়ী কিনে দিবে ?
এবার গড়ের মাঠের পূঁজোয় যাবো ,
আর সাথে এক পয়সার রাবরী,বাতাসা আর ছানার কাঁচা গোল্লা, ওহ্ সাথে প্লাষ্টিকের রেশমী চুড়ি।”
বাবার বড্ডো বেশী আদুরে কন্যা ছিলো ,
তবে সাথে ছিলো অভাব,
পয়সা কৈ কন্যার আব্দার মেটানোর ?
তবে মিটিয়েছিলো সে আব্দার,
যখন অশতিপর বৃদ্ধা স্বামীর মৃত্যু হলো অন্য গাঁয়ে ,
বাবা ভেবেছিলো চেপে যাবে কন্যার স্বামীর
ইহধামের খবর পুরো গাঁয়ের লোকের কাছে,
কিন্তু এই সমাজে কিছু চাপা থাকেনা, খুশবুর মতো খবর ছড়াতে ছড়াতে এ গাঁয়ে এসে পৌঁছে শেষ অব্দি।
“কি হে কন্যার সহমরন না দিলে যে আর জাত থাকছে না ।”
বাবার হাতে লাল পেড়ে সাদা শাড়ী সাথে একগাছি চুড়ি
কন্যা আহলাদে আটখানা,
মায়ায়-আদরে বাবার বুকে লেপ্টে থাকে,
বলে ,” মিঠাই খাবো না বাবা?”
বাবার মুখে কৃষ্ট হাসি, ” বেশ তো খাবি, আগামী কাল নিয়ে যাবোক্ষন গড়ের মাঠে,দেখি কতো খেতে পারিস।”
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয় বাবার হাতে ছোট্ট আদুরে কন্যার হাত,ছোট্ট পায়ে সাদা শাড়ী লালপাড়ে সাক্ষাত দেবী মা লাগছে,পায়ে আলতা,মনে হয় আজীবন এই পা জোড়া রাংগিয়ে রাখে, চপলা মেয়েটি বলে উঠে,
“বাবা বাতাসা খাবো না? কাঁচা গোল্লা ? ”
“সব খাবি মা,এই তো আর ক্রোশ খানেক বাকী”।
সন্ধ্যার আলো আধারীতে দূরে আলোর প্ৰজ্বলন, বাতাসে ধুপের গন্ধ, শাঁখ, উলুর ধ্বনিতে আজ গড়ের মাঠ প্ৰজ্বলিত, কন্যার হাতে কাঁচা গোলা, মুখে রাবরীর স্বাদ আস্বাদন করতে করতে কচি গলায় বলে উঠে,
” বাবা গড়ের মাঠে মেলা নেই এবার কিন্তু ওদিকটায়
এতো আগুনের ফুলকী কেন?”
কে যেন আবছা অন্ধকার বালিকার হাত টেনে বলে,
“কি সতি কন্যা, রাম রাম,জয় রাম”
কারা যেন আগুনে ওর ছোট্ট দেহটাকে ছুঁড়ে দেয়,
তখনো কন্যার মুখে রাবরীর স্বাদ,দুচোখে বিশ্বাস নিয়ে
আকুল কন্ঠে বাবাকে ডাকে, “বাবা গো তুমি কৈ ,আমারে বাঁচাও, চাইনে শাড়ী-চুড়ি,চাইনে বাতাসা,
তোমাকে চাই বাবা, আমার শুধু আমার বাবাকে চাই”!
অদূরে অদ্ভুত আলোয় ঝাপসা চোখে ক্রন্দসী কন্যার কন্ঠস্বর ম্লান হয়ে আসে, “বাবা গো ….”
চারিদিকে মানুষ্য পোড়া গন্ধ,
সেই গন্ধের ভেতরে চোখের নোনা জলে
শুধু কন্যার রিনঝিন হাসি ভেসে আসে…
