নীল সাঁঝের উজান

চিত্রশিল্পীশ্যামল বসাক

বিচ্ছেদের প্রায় ছয় বছর পর প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে দেখা উজানের। যেখানে তারা থামিয়ে দিয়েছিলো দুজনের পথচলা সেখান থেকে  দুজনের বয়স ছয়টা বছর বেড়ে গেছে। গত ছয় বছরে উজান যেমন হারিয়েছে তার মাথার উপর থাকা একমাত্র অভিভাবক মা কে সেই সাথে স্থবির হয়েছিলো তার জীবন। সবদিক থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো সে। কারো সাথে প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলতো না। বাসা থেকে অফিস আবার সেই অফিস থেকে বাসা ছিলো তার গন্তব্য। আত্নীয় স্বজন সবার কাছ থেকে এখনো সে একরকম লুকিয়ে থাকে। ডিভোর্স এর পর কম ভোগান্তিতো পোহাতে হয়নি তাকে। মানুষের হাজার রকমের প্রশ্ন ঘিরে ধরেছিলো থাকে যদিও অনেক দিন অবধি সে খোলাসা করে কাউকে কিছুই জানতে দেয়নি। স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া ধোঁকার কথা এখনো অনেকেরই অজানা। তবে মায়ের প্রয়াণ এর আগে এই কঠিন সত্যিটা উজান তার মাকে জানিয়েছিলো। তার মা ছেলের জন্য বিদায় বেলায় খুব আফসোস করে গেছেন। নিজের কৃতকর্মের জন্য ছেলের কাছে অনেক লজ্জিত হয়েছেন। উজান শুধু তার মাকে বলেছিলো

” সন্তান হিসেবে আমার অনেক অপারগতা ছিলো। আমিও অনেক ভুল ত্রুটি করেছি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। মাফ করে দিও মা “।

- Advertisement -

অভিভাবকহীন উজানের দিনগুলো চলে গেছে। কথায় আছে  সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা। দিনের পর দিন এমনিতেই চলে যায়। কাজের ব্যস্ততা বাড়িয়ে দেয় উজান। প্রথম প্রথম যখন অফিস থেকে ঘরে ফিরতো ভুলে যে কতবার ডোরবেল দিয়েছে। পাচঁ মিনিট ডোরবেল বাজানোর পর তার মনে হয়েছে তাকে দরজা খুলে দেওয়ার কেউ নেই। জ্বরে কাহিল হয়ে বেহুশ হয়ে গেছে কতবার। তবু এক গ্লাস পানি তাকে নিজে নিয়েই খেতে হয়েছে। প্রায়ই অফিস কলিগদের দেখে কি সুন্দর হাসি খুশি পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে গেছে। তাদের দেখে বুকের ভেতর হাহাকার ঠেলে আসতো তার। বুক থেকে বের হয়ে আসতো চাপা দ্বীর্ঘশ্বাস। এমন একটা পরিবার তার থাকতে পারতো। কিন্তু তার নেই কিছুই নেই সে একা ভীষণ একা। আজ হঠাৎ এতো বছর পর ইশাকে দেখে তার পুরনো দিনের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। ইশারও বয়স বেড়েছে কিন্তু তার গড়ন দেখে তা বুঝার উপায় নেই। আগের চেয়ে মোটা হয়ে গেছে কিছুটা কিন্তু সুন্দর হয়ে গেছে বেশ। সেও বোধহয় শপিং করতে এসেছে। সাথে স্বামী সন্তান আছে নিশ্চয়ই। মেয়েদের ড্রেসের সেকশনে এখন সে। সাঁঝের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে এসেছে। নতুন বউ নতুন পরিবার হয়েছে এখন। স্বামীর বাড়িতে গিয়ে সে কি পরবে তাই কিছু কাপড়চোপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে এসেছে। এখানে এসেই তার ইশার সাথে দেখা। একদম তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সে অন্য কারো বউ।  ডাকাটা শোভনীয় হবে কি হবে না এই দ্বিধায় যখন সে চুপ হয়ে আছে ঠিক তখনই তার নাম ধরে কেউ ডাকলো। কাপড় থেকে চোখ সরিয়ে সেই ডাক অনুসরণ করে তাকালো সে

“উজান”

ইশা নিজে থেকেই ডেকেছে তাকে। যাক বাচাঁ গেলো তাকে আর মনের সাথে দ্বিধায় জড়াতে হবে না। অবাক হওয়ার রেশ নিয়ে উজান স্মিত হেসে জবাব দিলো

” ইশা তুমি?

ইশার চোখে মুখে এক ধরনের জড়তা আর সাথে অনুতাপে মোড়ানো দ্বিধা। এই মানুষটাকে সে সোজাভাবে ছেড়ে দিতে পারতো। কিন্তু যে ছলের আশ্রয় সে নিয়েছে এটা তাকে আজীবন পোড়াচ্ছে। ভেতর থেকে খোকলা বানিয়ে দিচ্ছে। জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সে করেছে উজান এর বিশ্বাস ভেঙে।  সেই ভুলের মাশুলও তাকে দিতে হয়েছে অনেক বাজে ভাবেই। ইশা হালকা হেসে জবাব দিলো

” হ্যাঁ আমি। কতদিন পর তোমার সাথে দেখা। এখনো আগের মতোই আছো”।

উজান হেসে বললো

” কোথায় আগের মতো আছি? বয়স বেড়েছে। আজকে আয়নাতে দেখলাম চুল দু একটা পেকে গেছে। দেখো পেটের মেদটাও বেড়ে সামনে গিয়েছে। কিন্তু তুমি আগের মতোই আছো। তবে আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে গেছো। তা একাই এসেছো শপিং করতে”?

ইশা বললো

” না একা আসিনি। আমার ছেলে আর স্বামীও এসেছে সাথে। ছেলে জেদ ধরেছে খেলনা কিনবে। তাই বাবা ছেলে সেই দোকানেই গেছে “।

উজানের বুকের মধ্য একটা মোচড় দিয়ে উঠলো। যদিও এটা শোভনীয় নয়  বেমানান দেখায়। তবুও ইশাতো তার এক সময় স্ত্রী ছিলো। চারবছর একসাথে সংসার করেছে। কিন্তু কপালে ছিলো না তাই টিকেনি। এখন তার কত সুন্দর সংসার আছে। স্বামী সন্তান নিয়ে একটা সুখী পরিবার তার। উজান এর একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। ইশা কি তাকেই বেছে বিয়েছে যার সাথে সে সম্পর্কে জড়িয়েছিলো? কিন্তু প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না হয়তো তাই চুপ করে রইলো। প্রসঙ্গ পালটে বললো

”  ছেলের বয়স কত?

ইশা উত্তর দিলো

” চার বছর চলছে “। তুমি এখানে শপিং করতে এসেছো বুঝতে পারছি। কিছু পছন্দ হলো? কার জন্য কিনতে এসেছো তোমার মার জন্য”?

উজান সহজ গলায় বললো

” মা বেচেঁ নেই দুবছর হলো ইশা। ডায়বেটিকস ছিলো সেটাতো তুমি জানতেই। একদিম সেটা নীল হয়ে গিয়ে মা দুনিয়া আর আমাকে ছেড়ে চলে গেছে “।

ইশার মুখটা মুহুর্তের মধ্যই ছোট হিয়ে এলো বিষাদে। কি বলছে উজান তার মা বেচেঁ নেই। ছেলেটার দুনিয়াতে আপন বলতে আর কেউ নেই। তাহলে কার জন্য কেনাকাটা করছে সে? সে কি এখনো একা নাকি বিয়ে করেছে আবার। ইশা ইতস্তত হয়ে বললো

” আমি দুঃখিত। আমি জানতাম না মা আর বেচেঁ নেই। তুমি কি আবার বিয়ে করেছো উজান”?

উজান যে প্রশ্নটার ভয় পাচ্ছিলো ইশা সেই প্রশ্নটাই করেছে তাকে। কিন্তু আবার ভাবলো এতে ভয়ের কি আছে। বিয়েইতো করেছে। সবার মতো তারও ভালো থাকার অধিকার আছে। উজান হেসে বললো

” হ্যাঁ গতকাল রাতে বিয়ে করেছি। ভেবেছিলাম করবো না। পরে ভেবে দেখলাম এক জীবন এভাবে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব না। দিনশেষে ঘরে ফিরে দুটো কথা বলার জন্য কাউকে পাশে দরকার। তাই বিয়েটা করেই ফেললাম। হঠাৎ মেয়ে দেখে পছন্দ হয়ে গেলো তাই বিয়ে করে ফেলেছি। সত্যিটা জানিয়েই বিয়ে করেছি। নতুন বউ বাড়িতে যাবে কিন্তু তার প্রয়োজনীয় কিছুই নেই স্বামীর ঘরে। তাই এসেছি কিছু দরকারি কেনাকাটা করতে “।

ইশা চুপ করে শুনে গেলো। কি অবলীলায় জীবনের কঠিন অথচ সুন্দর একটা মুহুর্ত বলে গেলো উজান। উজান বরাবরই এমন। ভনিতা করা পছন্দ করেনা। সোজাসাপ্টা বলে দেয় যা মনের মধ্য চলে। ইশা স্মিত হেসে জবাব দিলো

” অভিনন্দন তোমাকে নতুন জীবনের জন্য। আগামী দিনগুলো সুন্দর হোক। জীবনে সবারই ভালো থাকার অধিকার আছে। তোমারও আছে। আসলেই একা জীবন কাটানো সহজ ব্যাপার না। জীবনে চলার জন্য পাশে বন্ধুর মতো কাউকে দরকার”।

ঠিক এই মুহুর্তে আম্নু বলে একটা বাচ্চা ডেকে উঠলো। পেছন থেকে এসে ইশার আচঁল ধরে দাড়াঁলো। ইশা হেসে ছেলেকে কোলে নিয়ে বললো

” খেলনা কেনা হয়েছে আব্বু? পছন্দ হয়েছে কিছু”?

বাচ্চাটা বললো

” না কিছুই পছন্দ হয়নি। সব আগের খেলনা গুলোই”।

তখন একজন পুরুষ মানুষ বললো

”  ইশা তোমার ছেলে যা বিচ্চু আর চালাক। এইটুকু বয়সেই সে নতুন পুরাতন চেনে। দোকানে গিয়ে কোন খেলনাই তার পছন্দ হয় না। যেটাই দোকানদার দেখায় সেটাই পুরাতন বলে। শেষে কিছুই নিলো না”।

উজান বুঝলো এটাই ইশার স্বামী। কিন্তু চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছে। একটু ভালো করে দেখে মনে করার চেষ্টা করলো সে।  মনে পড়লো তার। আরে হ্যাঁ এইটাতো ইশার ফুপুর ছেলে। তার মানে ওই ছেলেটার সাথে ইশার বিয়ে হয়নি। কিন্তু এই ছেলেতো বিবাহিত ছিলো। তাদের বিয়েরও অনেক আগে বিয়ে হয়েছিলো। একটা বাচ্চাও ছিলো তাদের। উজানকে চুপ করে থাকতে দেখে সেই পুরুষ মানুষটি বললো

” আরে উজান ভাইয়া আপনি এখানে? কত বছর পর দেখা। কেমন আছেন?

উজান হেসে বললো

“ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? ইশা প্রায় আপনার কথা বলে “।

উজান ইতস্তত বোধ করলো। বর্তমান স্বামীর কাছে প্রাক্তন স্বামীর গল্প করা কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার মনে হলো তার। যতই হোক এক সময় তারা বেশ ভালো দাম্পত্য জীবন পার করেছে। উজানকে একটু বিব্রত হতে দেখে ছেলেটি ইশাকে বললো

” ইশা বাবুর জন্য কিছু ড্রেস কিনেছি। আর তোমার জন্যও। কাউন্টারে রাখা আছে। বিল করছে। তুমি একটু এগিয়ে দেখো। কাপড়গুলো বাবুর সাইজ মতো গায়ে হবে কিনা”।

ইশা হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়িয়ে সেদিকে আগায়। উজানকেও যেতে হবে। আরও কিছু কিনতে হবে। সময় বেশি নেই। উজানও তাড়া দেখিয়ে বিদায় নিয়ে  সামনে এগোতে নিলেই ইশার স্বামী বললো

” ইশাকে সেই ছেলে ঠকিয়েছে উজান ভাই। আপনার সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর ইশা বাড়িতে সেই ছেলের কথা জানায়। বলে বিয়ে করবে দুজন। প্রস্তুত তারা। বিয়ের কথা পাকাপোক্তও করে। বিয়ের পর ব্যবসা শুরু করবে এই  কথা বলে ইশার বাবার কাছ থেকে ছেলেটা পাচঁ লাখ টাকা নেয়। সরল মনে তারা দেয়। বিয়ের তারিখ পাকাপোক্ত হয়। কিন্তু যেদিন বিয়ে সেদিন সেই ছেলেটি আর আসেনি। তার এক বন্ধু মারফত ইশা জানতে পারে বিয়ের দিনই সেই ছেলে বিদেশ চলে গেছে। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সাথে কথা বললে বলে তারাও কিছু জানে না। তারাও এই কথা বিয়ের দিনেই জেনেছে। এর মধ্য বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় একটা রোড এক্সিডেন্টে আমার স্ত্রী আর মেয়ে দুজনেই আমাকে ছেড়ে চলে যায়। তারপর দুই পরিবারের সিদ্ধান্তে আমাদের বিয়ে হয়। ইশা এখনো মনে করে আপনাকে ঠকানোর জন্যই সেও এইভাবে ঠকে গেছে। এখনো সে আপনার কথা বলে প্রায়ই আফসোস করে। আপনি ওরে ক্ষমা করে দিয়েন”।

ইশার স্বামীর কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় উজান। আসলে এমনটা যে হবে আশংকা করেছিলো সে শুরুতেই। এজন্য সাবধানও করেছিলো ইশাকে। দুজন পুরুষ মানুষ নিজেদের মধ্য আরও কথা বলে কাউন্টারে বিল মিটিয়ে বের হয়ে আসতে নেয় উজান। আসার আগে সে ইশা কে বলে

”  যে জীবন তুমি আবার উপহার পেয়েছো তাকে আনন্দে বিমোহিত হয়ে উপভোগ করো। কোন পিছুটান রেখোনা ঠিক যেমন আমার নেই। ভালো থেকো এটাই চেয়েছিলাম এখনো চাই। কোন অভিযোগ নেই এখানে “।

- Advertisement -

Read More

Recent