
প্রতিবার গাড়ির ট্যাংক ভর্তি করতে গিয়ে যেন নতুন করে হতাশার মুখোমুখি হতে হয় কানাডার বাসিন্দা ডারনেল ব্যারেটকে। শুক্রবার সকালে একটি পেট্রোল পাম্পে দাঁড়িয়ে গ্যাসোলিন ভরার সময় তার মুখে ফুটে উঠেছিল সেই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। জ্বালানির লাগামছাড়া দামের চাপ এতটাই বেড়েছিল যে সম্প্রতি নিজের হামার গাড়িটিই বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন ব্যারেট। তার কথায়, “কঠোর পরিশ্রম করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করলে সেটি নিজের প্রয়োজন কিংবা ভবিষ্যতের জন্য খরচ করার কথা। কিন্তু শুধুমাত্র গ্যাসের দাম মেটাতেই যদি সেই অর্থ শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেটা আর স্বাভাবিক বিষয় নয়। এটি শুধু আমার নয়, প্রায় প্রত্যেক পরিবারের জন্যই একটি বড় সংকট।” একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক চালক ফিলিপ ইনটাক। তার মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পারিবারিক বাজেটকে সরাসরি চাপে ফেলছে। তিনি বলেন, “প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খরচের মধ্যে গ্যাসের পেছনে এখন অনেক বড় অংশ চলে যাচ্ছে। দাম যে হারে ওঠানামা করছে, তা কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। আমরা চাই দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক।”
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার মধ্যে সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পর কানাডার জ্বালানি বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমেছে। বাজার পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান GasBuddy-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে কানাডাজুড়ে প্রতি লিটার গ্যাসোলিনের গড় মূল্য ছিল ১৬৩.৯ সেন্ট। এটি এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ৫ সেন্ট কম। শুধু তাই নয়, এক মাস আগের তুলনায় দাম কমেছে প্রায় ২৫ সেন্ট প্রতি লিটার। এই মূল্যহ্রাসে স্বস্তি পেয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। তবে অনেকেই মনে করছেন, এটি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যহ্রাসকে স্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার এখনও নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কানাডিয়ান ফর অ্যাফোর্ডেবল এনার্জির প্রেসিডেন্ট ড্যান ম্যাটিগ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও গ্যাসের দাম লিটারপ্রতি গড়ে ৫ থেকে ৬ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। তার ভাষায়, “জ্বালানির বাজারে এখন একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। দাম কিছুটা কমলেও আবার দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ এক ধাপ এগোলে যেন দুই ধাপ পিছিয়ে যেতে হচ্ছে।” ম্যাটিগ আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদনে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণের মতো কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে সরবরাহের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ইতিহাসের দিকে তাকালেও এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন উৎপাদন ঘাটতির নজির খুব কমই দেখা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আপাতত কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো নতুন সংঘাত, উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আবারও দ্রুত বাড়তে পারে গ্যাসোলিনের দাম। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনের খরচই বাড়ায় না; এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, খাদ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও। ফলে গ্যাসের দাম কমলেও সাধারণ মানুষের স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে কানাডার চালকেরা সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলেও বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহই বলে দেবে এই মূল্যহ্রাস স্থায়ী প্রবণতায় রূপ নেয়, নাকি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে জ্বালানির দাম।
