এয়ার ইন্ডিয়ায় বোমা হামলার কথা কোনোদিনই ভুলবেন না দীপক খান্ডেলওয়াল

Air India passenger jet taxiing on the tarmac with a modern terminal in the background, white fuselage with red Air India branding and red engines.
এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ এ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা বিশ্ব বিমান চলাচলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়

চার দশকেরও বেশি সময় কেটে গেছে। তবুও ১৯৮৫ সালের ২৩ জুনের সেই ভয়াবহ সকাল আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে দীপক খান্ডেলওয়ালের জীবনে। এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২-এ সংঘটিত ভয়াবহ বোমা হামলায় তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর দুই বোনকে। সময়ের সঙ্গে অনেক ক্ষত শুকিয়ে গেলেও এই শোকের কোনো শেষ নেই বলেই মনে করেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে খান্ডেলওয়াল বলেন, “এটা এমন কোনো ঘটনা নয়, যা একদিন ভুলে যাওয়া যায়। প্রতিদিনই এটি আমাকে তাড়া করে। আপনি এটাকে জীবনের বাইরে সরিয়ে রাখতে পারবেন না। বরং সময়ের সঙ্গে আপনি শুধু এটাকে বয়ে নিয়ে চলতে শেখেন।”

এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২-এ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা বিশ্ব বিমান চলাচলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার আগে এটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ বিমানবিধ্বংসী সন্ত্রাসী ঘটনা। ১৯৮৫ সালের ২৩ জুন আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের আকাশে বিস্ফোরণের পর ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজটি। একই দিনে জাপানের নারিতা বিমানবন্দরেও আরেকটি বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটে। দুটি হামলায় মোট ৩৩১ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ২৬৮ জন ছিলেন কানাডার নাগরিক। ফলে এটি শুধু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস নয়, কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাগুলোর অন্যতম হিসেবেও বিবেচিত হয়।

- Advertisement -

প্রতিবছরের মতো এবারও নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তবে এ বছরের স্মরণ অনুষ্ঠানে টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউ এবং অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের অনুপস্থিতি ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে। এ বিষয়ে দীপক খান্ডেলওয়াল বলেন, এই অনুপস্থিতি শুধু হতাশাজনক নয়, বরং নিহতদের স্মৃতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। তাঁর ভাষায়, “তারা এসব বিষয়কে গুরুত্বই দেয় না। যেসব কানাডিয়ান ওই হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা এখনও এটাকে বিদেশে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখে। কারণ এটি এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছিল, এয়ার কানাডার নয়।” খান্ডেলওয়ালের এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দীর্ঘ ৪১ বছর পরও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ মনে করেন কানাডা রাষ্ট্র এখনও এই ঘটনাকে নিজের জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।

ঘটনার চার দশক পরও কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ট্র্যাজেডি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ কানাডিয়ান এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২-এ সংঘটিত বোমা হামলা সম্পর্কে হয় খুব সামান্য জানেন, নয়তো একেবারেই অবগত নন। এই পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার ঘটনাটি কেন এখনও জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারেনি? কেন স্কুলের পাঠ্যক্রম, জনসচেতনতা কিংবা রাষ্ট্রীয় স্মরণে এই ঘটনার উপস্থিতি এত সীমিত?

এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ বিস্ফোরণ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাস নয়; এটি গোয়েন্দা ব্যর্থতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চরমপন্থার ভয়াবহ পরিণতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পরবর্তীকালে কানাডার নিরাপত্তা কাঠামো, গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় এবং বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও এই ঘটনার প্রভাব ছিল গভীর। তবে নিহতদের স্বজনদের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হলেও সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে স্মৃতির সংরক্ষণে। তাঁদের দাবি, এই ঘটনাকে শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় চেতনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বুঝতে পারে সন্ত্রাসবাদের মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে।

দীপক খান্ডেলওয়ালের মতো বহু পরিবারের কাছে ২৩ জুন কোনো সাধারণ দিন নয়। এটি এমন একটি দিন, যা প্রতি বছর ফিরে আসে নতুন করে শোক, স্মৃতি এবং অপূর্ণতার অনুভূতি নিয়ে। চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের প্রশ্ন একই রয়ে গেছে কবে এই ট্র্যাজেডিকে কানাডা সত্যিকার অর্থে নিজের ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্বীকার করবে, এবং কবে নিহতদের স্মৃতিকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হবে?

- Advertisement -

Read More

Recent