
কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম খাদ্যনিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত। বিশাল উর্বর কৃষিজমি, পর্যাপ্ত মিঠা পানির উৎস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজে নিয়োজিত পরিবারগুলো দেশটির খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের নীতিগত উদ্বেগ খুব কমই দেখা গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কঠোর নিয়ন্ত্রণনীতি এবং খামারিদের ওপর বাড়তি প্রশাসনিক চাপ এখন দেশটির খাদ্যব্যবস্থাকে নতুন এক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২১ সালের পর থেকে দেশটিতে গ্রোসারি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটি শুধু পরিসংখ্যানগত বৃদ্ধি নয়; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে শুধুমাত্র খাবারের জন্য। ২০২৬ সালের কানাডা ফুড প্রাইস প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চার সদস্যের একটি পরিবারের এ বছর খাদ্য বাবদ প্রায় ১৭ হাজার কানাডিয়ান ডলার ব্যয় হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক বছরের ব্যবধানে খাদ্য ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেশটির অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
খাদ্য সংকটের এই আলোচনাকে আরও গভীর করেছে “দি ন্যাশনাল সিটিজেন ইনকোয়ারি” নামে একটি স্বাধীন জনশুনানি উদ্যোগ। গত মার্চে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কোলোনা শহরে আয়োজিত এক শুনানিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কৃষক, খামারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, সমস্যা শুধু বাজারদর বৃদ্ধি নয়; বরং কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর একযোগে নেমে এসেছে অর্থনৈতিক, আইনি ও প্রশাসনিক নানা চাপ।
অনেক খামারি অভিযোগ করেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তাদের আয় সেই হারে বাড়ছে না। জ্বালানি, পশুখাদ্য, পরিবহন এবং যন্ত্রপাতির মূল্যবৃদ্ধি তাদের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তুলেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক নীতি ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের কারণে অনেক খামার কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এই শুনানিতে সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্যগুলোর একটি দেন কানাডিয়ান সার্ভিড অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট কনস্টান্স সিউটার। তিনি জানান, নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের কারণে তার খামারের ৫৮৭টি প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেছে। তার দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, সরকার প্রদত্ত ক্ষতিপূরণ তার তুলনায় অনেক কম। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, বহু বছরের শ্রম ও বিনিয়োগ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখাটা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
সিউটার আরও জানান, একসময় কানাডাজুড়ে তাদের সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ছিল ৬০০-এর বেশি। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৩০০-তে নেমে এসেছে। তার মতে, এটি শুধু একটি সংগঠনের সদস্যসংখ্যা হ্রাস নয়; বরং কৃষি খাত থেকে মানুষ সরে যাওয়ার একটি বড় ইঙ্গিত। অনেক খামারি পেশা বদল করছেন অথবা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার খাদ্যব্যবস্থার ওপর এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে দেশটির খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকরা দুর্বল হয়ে পড়লে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে কৃষক ও খামারিদের টিকিয়ে রাখার জন্য কার্যকর সহায়তা প্রদান করা। কারণ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ভেতরে যদি অনিশ্চয়তা বাড়তেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কানাডার মতো সমৃদ্ধ দেশও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আরও গভীর সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
