
১৯৮৮/৮৯ সাল। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমি তখন সেই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। বহু নেপথ্য কর্মকাণ্ড এবং রাজপথে আমার সরাসরি অংশগ্রহণ। ছড়া-লিফলেট লিখি। ছড়া-ফোল্ডার ছাপি। ছড়ায় ছড়ায় আমার প্রতিবাদ চলমান। টিএসসি চত্বরে জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চে আমার এরশাদ বিরোধী ছড়া তখন তুমুল ভাবে জনপ্রিয়। আমার লেখা এরশাদের কার্টুনসম্বলিত ছড়াপত্র মানুষের হাতে হাতে। কবিতা পরিষদের বিরাট নেতা তখন সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ব্যাপক এবং সেটা প্রশংসা কুড়িয়েছে সুশীল মহলেও। সেই সময়, ফয়েজ ভাই একটা সমাবেশ ডাকলেন মহিলাদের। ভ্যেনু প্রেসক্লাব। রূপ-ঝলোমল ধনাঢ্য মহিলাদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ এবং খেটে খাওয়া নারীও উপস্থিত হয়েছেন। এরশাদ বিরোধী একটা ‘নারী মিছিল’ বেরুবে আজ প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে, তাই প্রেসক্লাব অঞ্চল লোকে লোকারণ্য। নিচতলা কিংবা দোতলা কোথাও ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই ছোট সে তরীর অবস্থা। ফটোসাংবাদিকরা ক্যামেরা রেডি করে অপেক্ষা করছেন। দারূণ একটা ছবি হবে আজ। নারীদের মিছিল বলে কথা। তা-ও আবার এরশাদ বিরোধী। সহসা কী হলো ফয়েজ ভাইয়ের। তিনি কারো সঙ্গে কোনোরকম শলাপরামর্শ না করেই ঘোষণা দিলেন—আমাদের সমাবেশ সফল হয়েছে কিন্তু কোনো মিছিল বেরুবে না আজ।
প্রেসক্লাবে উপস্থিত জনারণ্যে সন্দেহ ফিঁসফাস। ফয়েজ ভাইয়ের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ। দোতলায়ও খবর পৌঁছে গেছে। সেখানেও আলোড়ন—এর পেছনে বড় ধরণের কোনো রহস্য আছে। ঠিক এসময় দোতলায় অবস্থানকারী এক প্রতিবাদী তরুণ লাফ দিয়ে একটা টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে তীব্র ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলো—‘এই ঘোষণা মানি না। মিছিল হবার কথা ছিলো। মিছিল হবেই। এরশাদ বিরোধী আজকের আন্দোলনকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বন্ধুগণ। আপনাদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। মিছিলের কথা বলে সমাবেশ ডেকে এখন মিছিল না করার ঘোষণা আন্দোলনের পিঠে ছুরি মারারই নামান্তর। তাই বন্ধুগণ—আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই—মিছিল হবেই। ফয়েজ ভাইয়েরা এরশাদের কাছ থেকে সুবিধে নিয়ে কর্মসূচি বাতিল করতে পারেন না…’
সকলেই হতবাক—কে এই বিদ্রোহী তরুণ? অনামা অচেনা এক তরুণের বক্তৃতা বেশিক্ষণ কনটিনিউ করতে পারলো না। ‘আন্দোলনের ভেতরে আন্দোলন বিনষ্টকারী বহিরাগত চর’ হিশেবে চিহ্নিত করে যুবকটিকে পাকড়াও করা হলো। তারপর ফয়েজ ভাইয়ের অনুগত অনুসারীরা যুবকটিকে এক পশলা উত্তম মাধ্যমে আপ্যায়ন করে তাকে একটা কক্ষে আটকে রাখলো। আমি নিচে ছিলাম। কেউ একজন কানে কানে আমার কাছে খবরটা পৌঁছানো মাত্র আমি ছুটে গেলাম দোতলায়। দোতলায় উঠে ডানদিকের শেষ মাথায় একটা কক্ষে যুবকটির অবস্থান আবিস্কার করলাম।
আরেকপ্রস্থ ধোলাইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন যুবকদের ভিড় ঠেলে কক্ষটির ভেতরে ঢুকে পড়লাম আমি। মেঝের ওপর বসে আছে লাথি-ঘুষি-চড়-থাপ্পড়-টানাহেচড়ায় অর্ধছিন্ন পোশাকের বিধ্বস্ত এক যুবক। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। কপালে আর থুতনিতে আঘাতের চিহ্ন ফুটে আছে। ফ্লোরে বসে মাথা নিচু করে দেয়ালে হেলান দিয়ে ফ্লোরের দিকেই তাকিয়েছিলো যুবকটি। আমার আগমন শব্দে সন্ত্রস্ত ও ভীত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েই কী রকম খুশি হয়ে উঠলো সে–রিটন! ওর চোখে মুখে এক ধরণের সম্ভাব্য মুক্তির আনন্দ। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমার হাত ধরে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। আমি তার একটি হাত আমার হাতের মুঠোয় নিয়ে টানতে টানতে বের করে আনলাম। তাকে মারপিট করা তরুণরা বিস্মিত। আমি ওদের বললাম–এই যুবক আমার বন্ধু। এরশাদের চর নন। আবেগ তাড়িত হয়ে আপনারা তাকে মারপিট করেছেন। আমি তাকে নিয়ে যাচ্ছি। নিজ দায়িত্বে।
আন্দোলনে আমার নিয়মিত এবং সক্রিয় অংশ গ্রহণের কারণে আমার নাম ও চেহারা বিক্ষুব্ধ তরুণদের কাছে পরিচিত ছিলো। সুতরাং কেউ বাঁধা দিলো না। আমি সেই যুবককে প্রেসক্লাবের মূল ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। বিদায় নেবার আগে কান্না মেশানো কম্পমান কণ্ঠস্বরে অশ্রুসজল নয়নে যুবকটি বললো–‘আপনার এই উপকারের কথা আমি কোনোদিন ভুলবো না…।’
গল্প–দুই
১৯৯৬ সাল। ছোটদের কাগজ নামে একটা মসিক পত্রিকা বের করি আমি। বাংলাদেশে ছোটদের পত্রিকা চালানো একটা কঠিন কাজ। বিশেষ করে একক ভাবে সেই কাজ করাটা দুরূহও বটে। আমার পেছনে কোনো ধনাঢ্য ব্যবসায়ী নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। কোনো স্পন্সর নেই। অনেক কষ্টে কাগজটা বের করি। যদিও বিপুলভাবে পাঠকনন্দিত পত্রিকাটি। শিশু-কিশোররা প্রতি মাসে এই কাগজটির প্রতীক্ষায় থাকে। আমি ঘুরে ঘুরে খুব অল্প কিছু বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করি। তাতে কষ্টেসৃষ্টে দিন চলে যায়। প্রতি মাসে নিজের জমানো টাকা খরচ হতে হতে তলানিতে চলে এসেছি। কিন্তু তারপরেও পত্রিকাটা বন্ধ করতে পারি না। সে এক অদ্ভুত প্রেম। সে এক অদ্ভুত নেশা। পত্রিকা বের করার নেশায় তখন নিঃশ্ব হবার আনন্দে উদ্বেল আমি। সম্মোহিত আমি।
পরিচিত লোকজন নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিন্তু সবার কাছে বিজ্ঞাপন চাইতে যাই না। তাঁদের কাছেই যাই যাঁরা ছোটদের জন্যে একটা পত্রিকা বেরুলে সেটার প্রতি মমতা প্রদর্শনের ব্যাপারে আন্তরিক হৃদয়ের অধিকারী। বন্ধুদের কাছে জানলাম সুশীল সূত্রধরের কথা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুশীল। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের এককালের ঘনিষ্ঠজন সুশীল। আমার সঙ্গেও তাঁর চমৎকার সম্পর্ক। তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তা ‘সিঙ্গার’-এর। গেলাম তাঁর কাছে। একসময় ‘চিত্রালী’ অফিসের একটি কর্ণারে তিনি এবং আরো কয়েকজন বন্ধু নিয়মিত বসতেন। চিত্রালী পাঠক-পাঠিকা চলচ্চিত্র সংসদ সংক্ষেপে ‘চিপাচস’ গঠন করেছিলেন তাঁরা। চিপাচসের শামীম আলম দীপেন, লোদী, সৈয়দ শহীদ ইত্যাদি একঝাঁক উদ্দীপ্ত তরুণের সঙ্গে তখন আমার বিপুল সখ্য। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের পক্ষে জনমত গঠনের ব্যাপারে একসময় ‘চিপাচস’ খুব আলোচিত ভূমিকা রেখেছিলো। আমি একসময় চিত্রালীর চিপাচস-এ প্রায় নিয়মিত বসতাম। আড্ডা দিতাম। তোপখানা রোডের মাথায় মঞ্চ বানিয়ে একটা সমাবেশ করেছিলো চিপাচস। আমি সেই সমাবেশেও অংশ নিয়েছিলাম আমার চিপাচসের বন্ধুদের সঙ্গে। সুতরাং চিপাচসের সুশীল সূত্রধর আমাকে এবং ছোটদের কাগজকে বুঝবেন এরকম একটা বিশ্বাস থেকেই তাঁর কাছে যাওয়া। তিনি আমাকে নিরাশ করেন নি। বিজ্ঞাপন তিনি দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।
দিন যায়।
একবার হলো কী—আমি গেছি বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে। সুশীল সেদিন খুবই ব্যস্ত। বললেন—আজ তো আমি খুবই ব্যস্ত থাকবো সারাদিন। এক্ষুণি স্যারের রুমে(মাহবুব জামিল) চলে যাচ্ছি, খুব জরুরি মিটিং। আজকে আমি ওয়ার্ক অর্ডার দিতে পারছি না কিন্তু অসুবিধে নেই। আপনি ছেপে ফেলুন। পরে দেখা যাবে।
বিজ্ঞাপনটা ছেপে যথারীতি বিল সাবমিট করা হলো। বিজ্ঞাপন বিভাগের লোকজন খুব বিনয়ের সঙ্গে বললো—ভাই এইটার তো ওয়ার্ক অর্ডার নেই। ওটা ছাড়া তো আমরা বিল তৈরি করতে পারবো না। এবং সেটা না হলে তো চেকও ইস্যু হবে না।
–আমাকে তাহলে কী করতে হবে?
–তেমন কিছুই না। সুশীল স্যারের কাছ থেকে একটা ওয়ার্ক অর্ডার করিয়ে নিতে হবে।
আমি গেলাম সুশীল স্যারের কাছে। বিষয়টা বললাম। তিনি বললেন—ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়া আপনি বিজ্ঞাপন ছাপলেন কেনো?
আমি তাঁকে মনে করিয়ে দিলাম—আপনি সেদিন খুবই ব্যস্ত ছিলেন। আপনিই বলেছিলেন ছেপে ফেলতে। বলেছিলেন অসুবিধে হবে না। পরে দেখা যাবে।
আমার কথায় আকাশ থেকে পড়লেন তিনি—আমি বলেছি এমন কথা! ইম্পসিবল। এমন কথা আমি বলতেই পারি না।
আমি হেসে ফেললাম—দেখুন আপনি না বললে এটা আমি ছাপি কোন যুক্তিতে! এ যাবৎ কখনোই এমনটা হয়নি।
সুশীল সহসা গম্ভীর হয়ে গেলেন—এটা হয় না। হতে পারে না।
খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেলাম আমি। আগামীকাল আর্মানিটোলা থেকে কাগজ সরবরাহকারী লোকটা আসবে টাকা নিতে। সিঙ্গারের পাঁচ হাজার টাকার বিলটা মানে চেকটা না পেলে টাকার ঘাটতিতে পড়ে যাবো। আমার অফিসে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা আছে। কিন্তু লোকটাকে দিতে হবে পঞ্চাশ হাজার। আমি তাই শেষ বারের মতো আকুতিটা প্রকাশ করলাম—ব্যাপারটা খুবই বিব্রতকর। খুবই লজ্জিত আমি। দেখেন যদি দিতে পারেন তাহলে খুবই উপকার হয়…
সুশীল উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও ইশারা করলেন উঠতে। বললেন—আসুন আমার সঙ্গে।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। যাক ব্যবস্থা তাহলে হচ্ছে।
তিনি উঠে আমাকে নিয়ে দরোজার দিকে এগিয়ে গেলেন। বিল সেকশনের দিকে না গিয়ে দরোজার দিকে যাওয়াতে আমি ভাবলাম তাঁর বস সিঙ্গারের চেয়ারম্যান মাহবুব জামিলের কাছে বোধ হয় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে। কারণ মাহবুব জামিল সাহেব বসেন সিঁড়ির ডানদিকের অংশে। আর সিঁড়ির বাঁ দিকের অংশে সুশীল এবং তাঁর ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
আমাকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ির প্যাসেজটায় এসে ডানদিকের অংশে না গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন সুশীল। আমি তাকালাম তাঁর দিকে। তিনি চেয়ারম্যানের দরোজার দিকে না তাকিয়ে তাকালেন সিঁড়ির দিকে এবং তাঁর ডান হাতের নির্দেশনায় আমাকে দেখিয়ে দিলেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার পথ। এবং হাতের নির্দেশনা অপরিবর্তিত রেখে মুখে শুধু বললেন—প্লিজ!
আমার পৃথিবীটা কী রকম দুলে উঠলো! পা কেমন ভারী হয়ে গেছে। তুলতে পারছি না। যেনো বা শেকড় গজিয়ে গেছে আমার পায়ে। নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে শক্তি সঞ্চয় করে সিঁড়ির দিকে তাকালাম। সিঁড়িগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। পায়ে পায়ে নেমে আসছি আমি। সিঁড়ির ধাপগুলোও কী রকম বড় হয়ে গেছে! বেড়ে গেছে একটা সিঁড়ি থেকে আরেকটা সিঁড়ির দুরত্ব। পদযুগলও বোধকরি অপমান বোঝে। অপমানের ভারে আমার প্রতিটা পদক্ষেপ কী রকম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অপমানের জলধারায় প্লাবিত দু’চোখ কোনো নিষেধ মানছে না। হাতের চেটোয় চোখ মুছতে মুছতে অনেক কষ্টে আমি সেই কেঁপে ওঠা বিল্ডিং-এর বাইরে এসে দাঁড়াই। ব্যস্ত মতিঝিলের প্রায় ছুটতে থাকা লোকজন গুম্ফধারী ঝাঁকড়া চুলের এক ঝকঝকে মানুষকে অশ্রুসজল অবস্থায় প্রত্যক্ষ্য করে বিস্মিত হয়ে বারবার ফিরে তাকায়। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করি না আমি। আমার ঝাপসা চোখে আবছা ভেসে ওঠে বছর দশেক আগের একটি দৃশ্য—প্রেসক্লাবের মূল ফটকে কান্না মেশানো কম্পমান কণ্ঠস্বরে অশ্রুসজল নয়নে একটি যুবক আমাকে বলছে–‘আপনার এই উপকারের কথা আমি কোনোদিন ভুলবো না…।’
যুবকটি তাঁর কথা রাখেনি।
অটোয়া, কানাডা
