
ইতিহাসের অনেক বর্বরোচিত হত্যাকান্ড শাসকগোষ্টি ধামাচাপা দিয়ে রাখতে চায়। সত্যিটা মানুষকে জানতে দিতে চায় না। কিন্তু সেই ইতিহাস যুগের পর যুগ ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায় না, একদিন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। পার্বত্য জনপদে আদিবাসীদের উচ্ছেদে নানানভাবে রাস্ট্রীয় ষড়যন্ত্র চলে আসছে পাকিস্তান আমল থেকে। স্বাধীন বাংলাদেশে তা তীব্র আকার ধারন করে সামরিক জান্তার আমলে। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে পাহাড়ে সেটেলার বাংগালীরা লুটপাট,অগ্নিসংযোগ, খুন,ধর্ষন, জমি জিরাত দখল, বসত বাড়ি উচ্ছেদ থেকে শুরু করে এহেন কোন অপরাধ নেই তারা করেনি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বা কম কিসে! তারা ফ্রাংকাইনস্টানে নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে। কথিত শান্তি চুক্তির আড়ালে এখনো পার্বত্যাঞ্চলে অঘোষিত সামরিক বিধি নিষেধ বিদ্যমান।
স্বাধীনতার পর থেকে পাহাড়ে কয়েক শত ছোটবড় গনহত্যা সংঘটিত হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় সেগুলো লিপিবদ্ধ না হলেও আদিবাসীরা কেউ ভুলে যায়নি। এরকম একটি নারকীয় গনহত্যা সংঘটিত হয়েছিল ১০ এপ্রিল ১৯৯২ সালে। এদিনটি পাহাড়ের আদিবাসীদের কাছে বিভীষিকাময় রক্তাক্ত দিন।
পাহাড়ে আদিবাসীদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইয়ের তিন দিন আগে সংঘটিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে অন্যতম বর্বর হত্যাকাণ্ড। ঠিক ৩৩ বছর আগে এইদিনে খাগড়ছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাংয়ে পাহাড়ি গুচ্ছগ্রামে এই গণহত্যার ঘটনা ঘটে, যা লোগাং গণহত্যা নামে পরিচিত।
এক বাঙালি রাখাল বালককে হত্যায় তৎকালীন শান্তিবাহিনীকে অভিযুক্ত করে সেনাবাহিনী, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি), আনসার-ভিডিপির সহযোগীতায় সেটলার বাঙালিরা এ হত্যাকাণ্ড চালায়। সেটলাররা দা, বটি, কুড়াল দিয়ে নিরীহ আদিবাসীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেনাবাহিনী ও বিডিআর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। শিশু, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ নর-নারী কেউ রেহায় পায়নি সেদিন। দুই শতাধিক পাহাড়ি আদিবাসী মারা যায়। অনেকে নিখোঁজ হয়। সংখ্যাটা শতাধিকের ওপর। আগুনে পুড়িয়ে ছাঁই করে দেয়া হয় পাঁচশত বাড়িঘর।
এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের কারনে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুর আনন্দ শোকে পরিণত হয়। ১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে হাজার হাজার লোকের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, লেখক-সাংবাদিক বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভে শামিল হন। হাজার হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রতিবাদ ও নিহতদের স্মরণ করা হয়।
ঢাকা থেকে উৎসবে যোগ দিতে যাওয়া রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী, লেখক-সাংবাদিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যেতে চাইলে তাদের নিরাপত্তার অজুহাতে তাদের বাঁধা দেয় পানছড়ি উপজেলার সেনাবাহিনী। প্রবীণ রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, আইনজীবী সারা হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনু মুহাম্মদ সহ ২২ জন ঢাকায় ফিরে এক বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে জানানো হয়, “খাগড়াছড়ি গিয়ে আমরা স্বভাবতঃই ঐ অঞ্চলে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করি ঘটনার সত্যাসত্য জানবার দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু পরের দিন ১২ই এপ্রিল লোগাং যাবার পথে পানছড়িতে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা বলে নিরাপত্তাবাহিনী আমাদের ঘটনাস্থলে যেতে বাধা প্রদান করে। ”
এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২৮ এপ্রিল ১৯৯২ পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ লোগাং অভিমুখে পদযাত্রা করে। হাজার হাজার মানুষের এই পদযাত্রা প্রতিনিয়ত সেনাবাহিনীর বাঁধা পেরিয়ে লোগাং পৌছায় এবং সেখানে ফুল দিয়ে নিহতদের সন্মান জানানো হয়।
এই ঘটনার পর সেই বছর রাঙ্গামাটি আর খাগড়াছড়িতে আর সেইভাবে বিজু পালন করা হয়নি।
“এই ঘটনার একমাস পর তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পরে ওখানে কোথায় যেন সেটেলারদের একটা সমাবেশে তিনি বক্তৃতাও করেছেন। “তিনি পুরো ঘটনার জন্যে দোষ চাপান শান্তি বাহিনীর উপর, নিরাপত্তাবাহিনীর লোকজনদের খুব প্রশংসা করেন আর দম্ভভরে সেখানে ঘোষণা করেন যে প্রয়োজনে এইরকম ব্যাবস্থা আরও গ্রহণ করা হবে।”
( সুত্রঃ এড. ইমতিয়াজ মাহমুদ )
আজো পাহাড়ের আদিবাসীরা শোকভরে স্মরণ করে লোগাং গণহত্যার সেই ইতিহাস। অঘোষিত সামরিক শাসনে থাকা পাহাড়ি আদিবাসীরা আজো কোন গণহত্যার বিচার পায়নি। একটা গ্রামের পাঁচশর মতো ঘরে আগুন লাগিয়ে, ইচ্ছামত গুলি করে কুপিয়ে, শিশুদেরকে জ্বলন্ত আগুনে ছুঁড়ে ফেলে এতোগুলি মানুষকে হত্যা করা হলো,
এর কি কোনদিন কোন বিচার হবে না!
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
