কানাডার খনি ও রিঅ্যাক্টর খাতের জন্য আশীর্বাদ পরমাণু শিল্প

Three people in an office present a framed award with a blue‑and‑red emblem, smiling for the photo.
এক সময় যে পারমাণবিক শিল্পকে অনেকেই ভবিষ্যতহীন বলে মনে করেছিলেন সেই শিল্পই এখন আবার বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে

এক সময় যে পারমাণবিক শিল্পকে অনেকেই ভবিষ্যতহীন বলে মনে করেছিলেন, সেই শিল্পই এখন আবার বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। প্রায় এক দশকের স্থবিরতা, খনি বন্ধ, হাজারো কর্মী ছাঁটাই এবং বিনিয়োগে ভাটার পর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে পারমাণবিক শক্তিকে আবারও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে বহু দেশ। এই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে কানাডার ইউরেনিয়াম খাতের একজন কর্মী টারিন রোস্কের জীবনের অভিজ্ঞতায়।

কয়েক বছর আগেও পারমাণবিক শিল্পের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরেনিয়ামের আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন দাম কম থাকায় উৎপাদন কমিয়ে দেয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ক্যামেকো। এর প্রভাব পড়ে কানাডার সাস্কেচুয়ানের খনিগুলোতে। রোস্ক জানান, কোম্পানির র‌্যাবিট লেক খনিতে কর্মরত অবস্থায় তিনি চাকরি হারান। ২০১৬ সালে খনিটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে শতাধিক কর্মীর সঙ্গে তাকেও ছাঁটাই করা হয়। চাকরি হারানোর সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল সেটি। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে নিজের বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু তখন আবাসন বাজারও ছিল মন্দার মধ্যে। ফলে বাড়ি বিক্রি করেও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাকে।

- Advertisement -

প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চার মাসের মাথায় তিনি ক্যামেকোর ম্যাকআর্থার রিভার মাইন এবং কি লেক মিল-এ নতুন চাকরি পান। তবে ভাগ্য বেশিদিন সহায় হয়নি। মাত্র দুই বছর পর ওই প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমও স্থগিত হয়ে যায়। ফলে আবারও শুরু হয় কর্মী ছাঁটাই। তবে রোস্কের মতে, দ্বিতীয়বার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। কোম্পানি আগেভাগেই কর্মীদের জানিয়ে দিয়েছিল যে কার্যক্রম বন্ধ হতে যাচ্ছে। ফলে তিনি সময় নিয়ে নতুন চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে তিনি সিগার লেক মাইন-এ যোগ দেন এবং এখনও সেখানেই কর্মরত আছেন।

রোস্ক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই শিল্পে কাজ করা মানুষের জন্য সেই সময়টা ছিল মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপের। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে পারমাণবিক শিল্পের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেছে এবং এটি আর কখনও আগের অবস্থায় ফিরবে না। কিন্তু গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পারমাণবিক শক্তিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ফলে ইউরেনিয়ামের বাজারও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে শুরু করেছে।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে পারমাণবিক শিল্প আবারও বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অনেক দেশ কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎস প্রয়োজন, যা দিন-রাত সমানভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। সেই জায়গায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক দেশ আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে পারমাণবিক শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

বর্তমানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির ক্ষুদ্র মডুলার রিঅ্যাক্টর নিয়েও কাজ চলছে। এই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কানাডাও নিজেদের পারমাণবিক খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। ফেডারেল সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশে ১০টি নতুন পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণই নয়, কানাডায় নির্মিত পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহারের জন্য কানাডার ইউরেনিয়াম রপ্তানিও বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

পারমাণবিক শিল্পের এই পুনরুজ্জীবন শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় যেসব খনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিংবা উৎপাদন সীমিত করেছিল, সেগুলোর অনেকগুলো আবারও চালু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে খনি, প্রকৌশল, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। টারিন রোস্কের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, একটি শিল্পের মন্দা কতটা গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। আবার সময় ও বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই শিল্পই কীভাবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তারও বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে কানাডার পারমাণবিক খাত। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বৈশ্বিক রূপান্তরের যুগে পারমাণবিক শক্তি আবারও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ফিরে পাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বহু বছর ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা হাজারো কর্মী ও তাদের পরিবারের জন্যও তৈরি হচ্ছে নতুন আশার আলো।

- Advertisement -

Read More

Recent