বন্ধু তুমি শত্রু তুমি

মাসুদুল হাসান রনি

গতকাল অকস্মাৎ মৃত্যু বরণ করেছেন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব টিটো। তাঁর হঠাৎ চলে যাওয়ার সংবাদ মেনে নিতে পারছি না। নিজের অসুস্থতার মাঝে এই সংবাদ শুনে সারাদিন আরো বিষন্নতায় কেটেছে।

বারবার ভেবেছি, হঠাৎ চলে যাবার কোন মানে হয়?  কতকিছু বলার ছিল, কত তর্ক জমেছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও টিটোর সাথে প্রায় দিন ইনবক্সে কথা চালাচালি হতো। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে আমি কঠোর ভাষায় তুলোধুনো করতাম। কিন্ত টিটো ছিল সম্পুর্ন বিপরীত চরিত্রের মানুষ। তাঁর বিশাল দেহের ভেতর ছিল নরম কোমল একটা হ্রদয়। আর্দশের প্রতি ছিল প্রগাঢ় ভালবাসা ও নিষ্ঠাবান। শান্ত শিষ্ঠ টিটো কোমল শব্দ চয়নে যুক্তিতর্ক করত। কোনদিন তাকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারিনি। ওর কোমল স্বভাবের কারণে আমি ধৈর্যহারা হয়ে আরো কঠিন বাক্যবানে তাঁর মতাদর্শের মুন্ডুপাত করেছি।মাঝেমাঝে টিটো আমার স্ট্যাটাসে যে সব কমেন্ট করত আমি বন্ধু হিসেবে মানতে পারতাম না বলে ওকে ইনবক্সে নিয়ে আসতাম। তখন ওর সাথে তর্কটা জমে উঠতো। বিশেষত: পাঁচ আগস্টের পর মাত্রাটা বেড়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমাদের দু’জনের সম্পর্ক হয়ে গেল বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি!

- Advertisement -

তাঁর সাথে অসংখ্য স্মৃতি আমাকে ভারাক্রান্ত করেছে। গত শতাব্দীর ১৯৮৪-৮৫ সালে আমাদের পরিচয়। টিটোর বাড়ি মৌলভীবাজার। আমি থাকি নারায়ণগঞ্জ। তখন আমরা সদ্য স্কুল ছেড়েছি। এসময় দু’জনে হাত পাকাচ্ছি ছড়া লিখে৷ ছড়া লেখার কল্যানেই আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। সেই সময় নারায়ণগঞ্জ হতে কাজী শাহীদুল ইসলামের সম্পাদনায় নোলক নামে ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের হত। আমি শাহীদভাইয়ের সহকারী ছিলাম। এই পত্রিকায় টিটো নিয়মিত তাঁর সনেট পাঠাতো। মাঝে মধ্যে দু’একটা ছড়া। সেই সুত্রে নিয়মিত পত্র যোগাযোগ হত টিটোসহ মৌলভীবাজার, সিলেটের অনেক ছড়াকারের সাথে। নব্বই দশকে টিটো ঢাকায় থিতু হবার পর প্রায় সময় দেখা হত নানান জায়গায়। শাহবাগ আজিজ মার্কেট, মোল্লার দোকান, পিজি হাসপাতালের সামনে ফুটপাতের আড্ডায়। বেশ ক’বার নীলক্ষেতের পুরানো বইয়ের দোকান ও নিউমার্কেটের জিনাত বুক ডিপোতে একসাথে গিয়েছি বই খুঁজতে।

নব্বই দশকের মধ্যভাগে আমাদের যোগাযোগ নানা কারণে ক্ষীন হয়ে যায়। বিশেষত: ছাত্র রাজনীতিতে আমার সক্রিয়তা ও ব্যস্ততায় টিটোসহ লেখক বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। নতুন শতাব্দীর শুরুতে  আমি যখন সিদ্বেশ্বরীতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করি তখন একদিন  থিয়েটার বুক কর্নারে থিয়েটার পত্রিকা কিনতে গিয়ে টিটোর সাথে দেখা। এই পথেই সে যাচ্ছিল সাগর পাবলিশার্সে। বহুদিন পর দেখা পেয়ে গার্লস গাইড মিলনায়তনের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দু’জন প্রায় ঘন্টা দেড়েক আড্ডা দেই। নতুন করে সেই শুরু। তাঁর মৃত্যুর দুইদিন আগেও তর্ক হয়েছে চারুকলায় আনন্দ শোভাযাত্রার জন্য বানানো ফ্যাসিস্টের ভয়াল দর্শনের মুখাবয়ব নিয়ে।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের খুব একটা কথা হত না।কিন্ত সে আমার আদ্যোপান্ত জানতো।২০০৭ সালে তাঁর স্ত্রী শ্রাবণী সেন শাওনের অকাল বিয়োগের পরের দিনগুলোতে কদাচিৎ মনভারাক্রান্ত সময় কিছু কিছু বিষয় আলাপ হত। প্রায় সময় কথার মাঝখানে উদাস ভাব লক্ষ্য করে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিতাম।

সিলেট ও মৌলভীবাজারের স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে সৌমিত্র দেব টিটোর সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয়। পরে সে প্রথম আলোয় প্রদায়ক হিসেবে লেখালেখি করেন। দৈনিক মানবজমিনে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর অনলাইন সংবাদমাধ্যম রেডটাইমসের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমার বেশ কিছু লেখা সে চেয়ে নিয়ে প্রকাশ করেছেন। একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, “একসময় আপনি আমার লেখা ছাপতেন, এখন আমি আপনার লেখা ছাপি। বিষয়টা কেমন ভাইসভার্সা হয়ে গেল না?”

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০–এর বেশি। কবিতার জন্য ২০০৫ সালে পান বাংলাদেশ রাইটার্স ফাউন্ডেশন পদক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে অজবীথি, নীল কৃষ্ণচূড়া, পাথরের চোখ ইত্যাদি। তিনি অভিনয়ও করতেন। কবিতা, ছড়ার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন তিনি। জীবনবোধ, স্বদেশ,প্রেম, ভালবাসা এবং মানবিকতার কথাই তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে।

কবি ও সাংবাদিক পরিচয়ের বাহিরে টিটো ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের এক্টিভিস্ট। তাঁর এক্টিভিজম অনেকেই পছন্দ করতেন না। কারণ, তিনি ভারসাম্য রক্ষা করতেন না।

আবার অনেকের মতন সে মেরুদণ্ড বন্ধক দিয়ে চুপ করেও থাকেনি। যা বিশ্বাস করতেন তা বলায় ছিলেন সহজ ও অকপটে। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, ৩২ নম্বর, ৭ই মার্চ- এসব ব্যাপারে টিটো কখনো সুশীল হতে পারেননি। এসব বিষয়ে অনেক অপরিশীলত ধরনের উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।

এই ৭ই মার্চের দিবস বাতিলের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে লাঞ্চিত হয়েছেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কন্ঠ ছেড়ে উচ্চকিত হতে ভীত ছিলেন না।  সৌমিত্র দেব টিটোর সঙ্গে বাকি আওয়ামী বিপ্লবীদের পার্থক্য হলো, ভয়েজ রেইজ করার জন্য তাকে প্রবাসী হতে হয়নি। দেশে বসেই বেধড়ক মার খেয়ে প্রতিদিনই চিৎকার করেছেন। অন্য কবি সাহিত্যিকদের মতন সে গর্তজীবি হয়নি।

মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে টিটোর এই চিৎকার কখনও কখনও পছন্দ করিনি। কিন্ত তাকে এড়িয়ে চলিনি। মতের ভিন্নতা থাকলেও অনেক বিষয় দ্বিমত ছিল না। যুক্তিতর্ক করেছি। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদের আস্ফালন নিয়ে আমাদের কনসার্ন ছিল।

অসুস্থতার সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সৌমিত্র দেব টিটো চলে গেলেন। তাঁর অসুস্থতার কথা অনেকেই জানতো না।    তাঁর হঠাৎ চলে যাবার সংবাদে আমার মতন বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বজ্রাহত হয়েছেন। এই শোক হয়ত সবাই কাটিয়ে উঠবো কিন্ত টিটোকে কোথাও খুঁজে পাব না। নিদারুন বেদনার ভার সইতে হবে তাঁর বন্ধু ও স্বজনদের।

টিটো, অনন্তপানে আপনার যাত্রা শুভ হোক।

 

মন্ট্রিয়ল, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent