
আব্বা পৃথিবী ছেড়ে চেলে গেছেন ১৯৯৭ এর ১৩ এপ্রিল। সেদিন বাংলাদেশে ক্রিকেট দল আই সিসি তে জিতেছিল। আব্বা চলে যাবার খবর পেয়ে দোয়েল,বানীরা ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাচ্ছিল যখন,গাড়ি থামিয়ে ওদেরকে রঙের পানি ঢেলে দিয়েছিল, পথে আনন্দ করতে থাকা পথচারীরা। ওদের কান্না সেদিন দেখতে পারেনি ওরা। আব্বা চলে যাওয়ার এতগুলো বছর চলে যাবার পর ও এখনো ঠিক মনেপড়ে শোনা সব কথাগুলো।
আব্বা চলে যাবার খবর ফোনে জানিয়েছিল ভাইজান।মনে হয়েছিল কানের ভিতর আগুনের শিসা ঢেলে দিলো কেউ। অনেকদিন ফোনের রিং শুনলে ভয় হতো!দম আটকে আসতো।সেই শুরু। এর পর কত কাছের মানুষ চলে যাবার খবর পেলাম।সময়,অসময়ে কত মানুষ যে চলে গেলো।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও আজ আমার পাশের মানুষ, রাশীকের বাবাও নেই ৪ বছর ৬ মাস!।
আব্বা নাই আজ ২৮ বছর। আব্বা নেই বলে আহ্লাদ আবদারের মানুষটা নাই।কিছু আবদার করবার জন্য এমন একটা মানুষ, পৃথিবীতে আর নাই! হয়না।
আব্বা চলে যাবার পর যখন কাঁদতাম,ছোট্ট রাশীক আমাকে জড়িয়ে বলতো,”কেঁদোনা মামমা।আমিই তোমার বাবা ডাঃ ওমর আলী।”
বাচ্চাদের সামনে কাঁদলে ওরা অস্থির হয়ে যায়।রাশীক,রাইয়ানের কান্নাভেজা চোখ দেখি প্রায়। আমরা সবাই সবাইকে লুকাই।আবার কখনো লুকাতে পারিনা। একসাথে জড়িয়ে কাঁদি। বাবা মা না থাকলে জীবন শূন্য হয়ে যায়। রাশীক,রাইয়ান সেটা অনেক আগেই বুঝেছে।
কিছু কিছু দিন জীবনে আসে।ফাঁকা অনুভব হয়। আজ এমনি একটা দিন। শূন্য লাগে সব। রাশীকের বাবা থাকলে বলতো,মা বাবাতো আমারো নাই সাজি। চোখ মুছিয়ে দেবার,বুঝতে পারার সেই মানুষটা আজ কোন সে আসমানে? কতদূরে গেলে আবার তাদের পাবো?
আব্বাকে নিয়ে আমার স্মৃতির অন্ত নাই। আব্বা দূরে রোগী দেখতে যাবার সময় আমাকে সাথে নিয়ে যেতেন।মটর সাইকেলের পিছনে বসে আদিতমারী, কাকিনা যেতাম। ছোটবেলায় আব্বার সাথে বৈশাখ এর প্রথমদিন হালখাতা খেতে যেতাম। পুরানবাজারের মোড়ে আমাদের ঔষধের দোকান “সেবা ফার্মেসী”র আশে পাশে সব দোকানে হালখাতার সময় রঙিন কাগজ দিয়ে সাজাতো।আব্বার সাথে এক দোকান থেকে আর এক দোকান। গামলা ভর্তি মিস্টি দেখে আমার কেমন অবাক লাগতো। আব্বা টপাটপ অনেকগুলো রসগোল্লা খেয়ে ফেলতেন।লালশালু দিয়ে মোড়ানো খাতা নিয়ে বসে থাকতো দোকান মালিকরা। আমি খেতে পারতাম না একটার বেশি। নিমকী খেতে ভালো লাগতো খুব। ওটাই খেতাম।
আমি জন্মাবার পর আব্বা আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছেন পরম মমতায়।একটা প্রীম্যাচিউর শিশুকে বড়করা অনেক কঠিন ছিল মায়ের জন্য। আব্বা সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মা, আপা,আপু আমাকে সারাজীবনে বহুবার বলেছে সেই গল্প।। আব্বার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। আব্বা এয়ারপোর্টে এসেছিলেন দেশ ছেড়ে আসার সময়।ছোট্ট একটা শিশুর মত কেঁদেছিলেন। হয়তো আর দেখা হবেনা বলেই। আব্বার সেই কান্নার জল এখন আমার চোখে। যতবার দেশে যাই, মনেহয় এয়ারপোর্টে নামলেই মনে হয় হয়তো আব্বাকে দেখতে পাবো। আব্বা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আমাকে নিতে আসতো!
আব্বা লেখাপড়া ভালোবাসতেন। শুধু চাইতেন আমরা অনেক লেখাপড়াকরি। আব্বার ছাত্র জীবনে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছিলেন কিন্তু আমাদের কোন অভাব বুঝতে দেননি। আমাদের বাসায় কখনো আমরা বুঝিনি আমরা মেয়ে তাই এটা করা যাবেনা , ওটা করা যাবেনা। আব্বা সবসময় চেয়েছেন আমরা যেনো লেখাপড়া করে ভালো মানুষ হই।আব্বা অসম্ভব উচ্চাভিলাষী একজন মানুষ ছিলেন। আব্বা মায়ের মনের স্বপ্ন দিয়ে গড়া আমরা তাদের ছেলে মেয়েরা। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সব ভালোতে তারা আছেন।
লালমনিরহাটে ভাবীর নামে নামকরণ করা,ডাঃ সেলিমা রহমান ডায়েবেটিক হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, আব্বার স্বপ্নগুলো ভাইজান,ভাবীর মত কত অজস্র স্বপ্নচারী মানুষদের হাত ছুঁয়ে কত দূর চলে গেছে। এতবড় একটা প্রতিষ্ঠান আমার ভাইজান ডাঃ জাকি সহ কত মানুষের অক্লান্ত সাধনায় তৈরী হয়েছে।আব্বা দেখতে পারলে অনেক খুশি হতেন। আর দেখছেন যে না তাই বা কি করে বলি! মা বাবার দোয়া সারাজীবন সংগে থাকে!
আমার রাশীক,রাইয়ানের দিকে তাকালে কারো চোখ ,কারো ঠোঁট,কারো হাতের ,মুখের দিকে তাকালে আব্বার মত লাগে। কখনো কখনো ভাইজানের মত,বোনদের মতো এমনকি নিজের মত লাগে। রাশীকের হাঁচির শব্দ শুনলে আব্বাকে মনে পড়ে। ওদের জড়িয়ে থাকি। ওদের জড়িয়ে বাঁচি। আব্বা আব্বা বলে ওদেরই ডাকি। শায়েক,অংকুরকে বাবা ডাকি।
প্রার্থণা করি,আব্বার আত্মা শান্তিতে থাক।চলে যাওয়া প্রিয় মানুষদের জন্য আমাদের সবার তো এই একই প্রার্থনা
“রাব্বির হাম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা”
“হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।”
অটোয়া, কানাডা

