
সাগর আর তার বন্ধুরা প্রতিদিন বিকেলে যে মাঠটাতে খেলতে যেত, সেটা ছিল শহরের একেবারে কিনারায়, একরকম আধা-পরিত্যক্ত এলাকা। মাঠের পাশেই ছিল কিছু পুরনো বাড়ি, পেছনে লতাপাতা ঘেরা বাউন্ডারি, আর দেয়ালের ধারে ধারে বাচ্চাদের খেলার আওয়াজ। তবে একটা বাড়ির বারান্দা থেকেই প্রায় প্রতিদিন দুই কিশোরী এসে দাঁড়াতো, একেবারে নির্ভর ভঙ্গিতে, যেন ওদের বিকেলটাও এই মাঠ ঘিরেই।
সাগর, সদ্য কলেজ পাশ করা যুবক, এলাকাতেই বেশ পরিচিত মুখ। হাইট, গায়ের রং আর চোখের মধ্যে থাকা অদ্ভুত এক স্থিরতা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিলো। মেয়েরা তাকাতো, কেউ কেউ হাসতোও, কিন্তু সাগর নির্বিকার। তার দৃষ্টি শুধু বলের গতিপথে, তার আগ্রহ ক্রিকেট বল ছুটে আসার আগে ঠিকমতো ব্যাট নামানো। ভালো খেলতো সে, আর কথাবার্তায় ছিলো নরম অথচ দৃঢ়তা।
তবে এই গল্পের শুরু হয় সেই দুই কিশোরীকে কেন্দ্র করে। ওরা প্রতিদিন নিয়ম করে সাগরদের খেলা দেখতে আসতো। কিন্তু ওদের মধ্যে একজন—রাই, সাগরের দিকে একটু বেশিই মনোযোগ দিতো। আর পাঁচটা কিশোরীর মতো সে কেবল সাগরকে ভালো লাগার বাইরে কিছু ভাবেনি, ভাবতে পারেনি। তবে ভালো লাগা থেকে ধীরে ধীরে একটানা ভাবনার জন্ম হয়।
রাই দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। শান্ত স্বভাবের, আর দশটা মেয়ের চেয়ে একটু বেশি স্বপ্নবাজ। সাগরকে প্রথম দেখেছিলো ওই মাঠেই। ব্যাট হাতে ছেলেটা যে পরিমাণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে দৌড়ায়, বল শট করে, তাতে তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে ওঠে। কিছু একটা হারিয়ে ফেলার মতো। বন্ধুকে নিয়ে প্রতিদিন মাঠের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে, আর অপেক্ষা করে—হয়তো একদিন ছেলেটা তাকাবে, কিংবা কিছু বলবে। কিন্তু সাগরের দৃষ্টি সেইসব সাধারণ কিশোরীদের গায়েই পড়ে না। তার দৃষ্টি হয় ব্যাট-বলের লাইনে, নয়তো বন্ধুর আড্ডায়।
দিন কেটে যায়। বিকেল নামে, খেলা হয়, সন্ধ্যা আসে, আড্ডা জমে, রাইও প্রতিদিন একই ভরসায় এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সাগর একবারও ওদের দিকে চোখ তোলে না। রাই একদিন সাহস করে বান্ধবীকে বলে, “তুই বলতো, যদি ওকে বলা যেতো? যদি কারো মাধ্যমে জানানো যেতো—আমি ওকে পছন্দ করি?”
বান্ধবী প্রথমে হেসে ফেললেও পরে বলে, “তোর এত ইচ্ছা যখন, তানিমকে ধর। ওদের এলাকার ছোট ভাই না?”
তানিম, সাগরের এলাকার ছোট ভাইয়ের মতো, একটু দুষ্টু আর খুবই চঞ্চল। রাই একদিন তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি সাগর ভাইকে কিছু বলবা আমার হয়ে?”
তানিম প্রথমে থমকে যায়, তারপর মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে, “কি বলবো?”
রাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এরপর বলে, “আমি… আমি ওকে পছন্দ করি।”
তানিম কথাটা শুনে হেসে ফেলে। কিন্তু তারপর দেখে রাইয়ের চোখে একটা গম্ভীর সত্যতা। সে কথা রাখে। পরদিনই সাগরের সঙ্গে কথা বলে।
সাগর চুপ করে শুনে যায়। “ওকে চেনো?”—তানিমের প্রশ্নে মাথা নাড়ে। “ওই যে, ওই মেয়েটা, মাঠের পাশের দালানের কোণায় দাঁড়ায় না প্রতিদিন?”
সাগর একবার তাকায় মেয়েটির দিকে। তারপর বলে, “না, পছন্দ হলো না।”
বিষয়টা এতটাই ঠান্ডা ছিলো যে তানিম পর্যন্ত ভড়কে যায়। কিন্তু সে আর কিছু বলে না।
এরপর কেটে যায় কয়েকদিন। রাই খবর পায়, সাগর কিছু বলেনি। কিন্তু মনটা ভেঙে যায় না। বরং একরকম জেদ চেপে বসে। “একবার কথা বললেই বুঝবে, আমি আলাদা।”
তারপর আসে পহেলা বৈশাখ। পুরো শহর সেজেছে নানা রঙে, হালখাতা, পান্তা-ইলিশ, মেলায় ভিড়, মাটির খেলনা, নাগরদোলা। রাই সিদ্ধান্ত নেয়, আজকে সে সাগরের সঙ্গে দেখা করবে। আবার তানিমকে বলে, “আজ যদি কিছু বলেন, জানিও ওনাকে, আমি মেলায় ওনার জন্য অপেক্ষা করবো।”
সাগর এবার আর না করে না। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর শুধু বলে, “হুম।”
রাই সেজে নেয়, সাজে খুব সাধারণভাবে। সাদা-লাল শাড়ি, চোখে হালকা কাজল, হাতে একটা মাটির চুড়ি। তার চেহারায় তখনো স্কুলের সরলতা, কিন্তু চোখে একটা স্বপ্ন। বান্ধবীর হাত ধরে মেলায় আসে। সময় যায়। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে যায়। সাগর আসে না।
সাগর সেদিন বাড়ি থেকেই বের হয় না। কেন যেন তার ইচ্ছে হয়নি। কিংবা হয়তো একধরনের আত্মরক্ষামূলক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা ছিলো। এমনকি তার বন্ধুরা যখন মেলায় যেতে বলে, সাগর তাতে আগ্রহ দেখায় না। শুধু জানালার পাশ থেকে বাইরে তাকায়। চুপচাপ।
রাই অপেক্ষা করে। মেলার আওয়াজ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায় তার কানে। ছেলেটা আসছে না। সে বসে পড়ে এক কোণে। চোখে জল আসে, ধীরে ধীরে গাল বেয়ে নামে।
সন্ধ্যা নামছে। রাই পা বাড়ায় বাড়ির দিকে। তার বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার স্বপ্নটা যেন মেলার রঙে হারিয়ে যায়। রাস্তার মোড়ে সাগর তখন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎ সে তাকিয়ে দেখে—একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, চোখে জল।
সাগরের চোখ আটকে যায়।
সে বুঝে ফেলে, এই মেয়েটাই তার জন্য অপেক্ষা করেছিলো। এই মেয়েটাই তাকে পছন্দ করেছিলো। এবং আজও করছে। কিন্তু তার চোখের ভেজা রেখা, সেই ব্যর্থ প্রত্যাশা—সব কিছু সাগরের বুকের মধ্যে কোথাও গেঁথে যায়।
না, সাগর তার নাম কখনো জানতে পারেনি। কখনো কথা হয়নি। কিন্তু সেই সন্ধ্যার দৃশ্য—মেলার আলোয় কান্নাভেজা চোখে ফিরে যাওয়া এক কিশোরী—তার মনে ঠিকই থেকে যায়।
বছর কেটে যায়। সাগর আজ হয়তো অন্য শহরে, অন্য কাজে ব্যস্ত। কিন্তু সন্ধ্যা হলে এখনো সে মাঝে মাঝে থমকে যায়, কিছুটা সময় চুপচাপ থাকে। একটা ব্যথা বুকে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে—অপ্রকাশিত ভালোবাসা, অপূর্ণ এক মুহূর্ত।
রাই হয়তো এখনো সেই গল্প কাউকে বলেনি। কেউ জানে না, একবার পহেলা বৈশাখে সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিলো। কারো জন্য অপেক্ষা করেছিলো, যে কখনো আসেনি। কিন্তু স্মৃতিটা বেঁচে আছে।
সাগরের মনে, রাইয়ের চোখে, আর হয়তো কোথাও দূরে—সময় নামের এক সেলুলয়েডে আটকে আছে।
হায়, জীবন এতো ছোট কেনো। জীবন যদিবা ছোটই হবে, তবে তার এতোগুলা গল্প কেনো।
