
আশির দশকে ‘সাপ্তাহিক চিত্রবাংলা’ নামের অদ্ভুত একটা পত্রিকা বেরুতো। সে সময় রেলে-বাসে-ইস্টিমারে দূরপাল্লার যাত্রীরা এই পত্রিকাটি অতি আগ্রহ নিয়ে কিনতেন। ট্রেনে করে চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট যাবার সময় কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনের জানলা দিয়ে হকাররা যে পত্রিকাগুলো বিক্রি করতো, আমি দেখেছি সেগুলোর সিংহভাগই ছিলো চিত্রবাংলা। একবার পুরো কম্পার্টমেন্টে আমি-ই কেবল এককপি বিচিত্রা আর এককপি যায়যায়দিন কিনেছিলাম। সাতজন কিনেছিলেন ‘চিত্রবাংলা’। আর একজন ‘চিকিৎসা সাময়িকী’ নামের একটি যৌন ম্যাগাজিন।
এই চিত্রবাংলা পত্রিকাটি বেরুতো খবর হাউস থেকে। বিখ্যাত মিজানুর রহমান মিজানের খবর হাউস। ওই হাউসের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক ছিলো। চিত্রবাংলার সম্পাদক হিশেবে খবর সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানের নাম মুদ্রিত হতো বটে কিন্তু সম্পাদকের পুরো দায়িত্ব পালন করতেন গোলাম কিবরিয়া নামের এক সাংবাদিক। দেশের অশিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত পাঠকেরা কী খায় সেটা খুব ভালো বুঝতেন এই কিবরিয়া। খুবই পাঠকপ্রিয় ছিলো চিত্রবাংলা, সেই শ্রেণীর পাঠকের কাছে। আমি নিজে একবার পত্রিকাটির প্রচ্ছদ ছাপার সময় প্রেসের প্রিন্টিং ম্যাশিনের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে অবাক বিস্ময়ে দেখেছিলাম—প্রচ্ছদের সায়ান কালারের প্লেটটির ইম্প্রেশন সংখ্যা সাতষট্টি হাজার অতিক্রম করছে ম্যাশিনটির কাউন্টিং মিটার!
দৈনিক খবরের ছোটদের পাতা ‘শাপলা দোয়েল’ বের করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিটিভি প্রযোজক শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম। বিনে পয়সায় পাতা চালানোর দায়িত্বটি কাঁধে নিয়ে খুশিতে বাকুম বাকুম আলী ইমাম ভাই সওয়ার হয়েছিলেন আমার কাঁধে। আমি বিনে গতি নেই তাঁর। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে আলী ইমাম ভাইকে ‘না’ বলার কোনো সুযোগ ছিলো না আমার। শাপলা দোয়েল পাতাটির সব কাজ আমিই করে দিতাম। পেস্টিং এর বহু রাতে আমি আর আলী ইমাম, (কখনো কখনো আমীরুলও) একসঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাত কাবার করতাম। ভোরের দিকে দৈনিক খবরের নিউজ টেবিলের ওপর (দুটি টেবিল একসঙ্গে জোড়া দিয়ে) পত্রিকার ফাইলকে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়েছি কতোবার! খবর হাউসের সবাই জানতো, জানতেন সম্পাদক মহোদয়ও, যে শাপলা শালুক পাতাটির অলিখিত সম্পাদক আমিই। অফিসের পিওন-দারোয়ান সবাই জানতো আমি সেই হাউসে চাকরি করি। অবশ্য এর আগে আমি ওই হাউসের চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক ‘ছায়াছন্দ’ পত্রিকায় কাজ করেছিলাম কিছুদিন। তখন ছায়াছন্দের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন শহীদুল হক খান।
চিত্রবাংলার গোলাম কিবরিয়া এক রাতে পেস্টিং টেবিলে আমাকে পাকড়াও করলেন। বললেন—এখান থেকে ‘মনোরমা’ নামে মহিলাদের একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরুবে। ওটার নির্বাহী সম্পাদক হিশেবে দায়িত্বটা আমাকেই দিতে চান তিনি এবং সম্পাদক স্বয়ং। আগামীকাল ছুটির দিন দুপুরের আগে আগে আমাকে কিবরিয়ার সঙ্গে যেতে হবে সম্পাদক মহোদয়ের বাসভবন ধানমণ্ডিতে। আমি রাজি হই না। কিবরিয়া ভাই ঠেঁসে ধরেন—আরে মিয়া না কইরো না। আমি তো আছি। তোমারে হেল্প করুম নে। রাজি হইয়া যাও। টাকা-পয়সার ব্যাপারটাও খোলাসা করেই বললেন কিবরিয়া ভাই—ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ীই পাইবা। ঠকবা না। মিজান ভাই তোমারে ঠকাইবো না। বিনা পয়সায় সার্ভিস তো কম দিলা না খবর হাউসরে।
মিজান ভাইয়ের বাসায় গেলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করলেন। সে এক বিরাট হিস্টোরি। অন্য একটি লেখায় সেই কাহিনি বর্ণিত আছে বিধায় এইখানে চেপে গেলাম। কিবরিয়া কাহিনিতে কনসেন্ট্রেড করি আপাতত।
খুব মজার এক মানুষ ছিলেন এই গোলাম কিবরিয়া। নিজে লিখতেন না এক লাইনও। কিন্তু তাঁর জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় পত্রিকাটি হাইয়েস্ট সার্কুলেটেড সাপ্তাহিক হিশেবে দীর্ঘদিন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতি সংখ্যায় অদ্ভুত সব লেখা কোত্থেকে কোত্থেকে যোগাড় করে ফেলতেন। শিরোনামগুলো সবসময় শালীন-শোভনও হতোনা। কিন্তু মিজান ভাই ছিলেন মহা সন্তুষ্ট। সপ্তাহ ঘুরতেই হকার্স ইউনিয়ন থেকে চিত্রবাংলা বিক্রির বিপুল অংকের টাকা এসে হামলে পড়তো তাঁর একাউন্টে।
‘মনোরমা’র দায়িত্ব নেবার পর আমার রুমে কিংবা কিবরিয়ার রুমে কতো যে আড্ডা জমিয়েছি তার কোনো হিশেব নেই। গায়ে গতরে বিশাল ছিলেন তিনি। ট্রিপল এক্স সাইজ। কিবরিয়ার বিশাল ভুঁড়িটা ছিলো দেখার মতো। টেবিলে তাল ঠুকে ঠুকে গান গাইতেন তিনি। গানের গলাটা চমৎকার ছিলো। মঞ্চে অভিনয়ও করতেন এককালে কোনো একটা নাট্যদলের হয়ে। তাঁর কুমড়োপটাশ মার্কা শরীরটা নিয়ে থলথলে একটা ভঙ্গিতে হাঁটতেন তিনি। আটানব্বুই সালে আমার রচনা ও পরিচালনায় বিটিভির ঈদের বিশেষ ছোটদের অনুষ্ঠানে কাজে লাগালাম তাঁকে। আমার লেখা আর আনিসুর রহমান তনুর সুরে তিনি গাইলেন—‘‘শরীরটা হলে পরে তাগড়া/আসবে না দিতে কেউ বাগড়া/তাই বলি খোকা-খুকু/খেয়ে নাও সবটুকু/মুরগিটা খেয়ে নাও আস্ত/তাহলে হবে ঠিক স্বাস্থ্য…।’’ ছোটরা পছন্দ করেছিলো কিবরিয়ার পারফরম্যান্স।
আমি সাপ্তাহিক মনোরমার সম্পাদকের দায়িত্বপালন করার সময়(যদিও সম্পাদক হিশেবে মুদ্রিত হতো মিজান ভাইয়ের স্ত্রী ফুল্লরা বেগম ফ্লোরার নাম) কিবরিয়া ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ট আর ক্যাজুয়াল হয়ে গেলো কিছুদিনের মধ্যেই। তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের সঙ্গেও পরিচিত হয়েছি ততোদিনে। তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের ভাবী খুবই চমৎকার হাসিখুশি একজন মানুষ। কিবরিয়ার অনুজপ্রতীম বন্ধু হিশেবে আমাকে তিনি তুমি সম্বোধনেই কথা বলতেন।
কিবরিয়া ভাই আমার রুমে এসে টেবিলের অপর প্রান্তে আমার সামনে বসেই বলতেন—চা খাওয়াও আর সিগারেট আনাও। চা আমি খাওয়াতাম ঠিকই কিন্তু সিগারেট? কাভি নেহি। আমি নিজে সিগারেট খাই না কাউকে সিগারেট খাওয়াইও না সেটা জানা সত্ত্বেও নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যেতেন যদি কোনোদিন ভুল করে তাঁকে একটা সিগারেট আনিয়ে দিই! কিন্তু সেই ভুল আমার কখনোই হতো না। আমার অফিস সহকারী বা পিওন ছেলেটাকে বলাই ছিলো কিবরিয়া যতো জোরাজুরিই করুক আমার একাউন্ট থেকে একটা সিগারেটও দেয়া যাবে না তাঁকে। আমার অগোচরে বাচ্চা ছেলেটাকে কতো হম্বিতম্বি করেছেন কিবরিয়া ভাই—যা ব্যাটা তোর স্যারের একাউন্ট থিকা আমার লাইগা একটা ব্যানসন লইয়া আয়। কিন্তু পিওন ছেলেটা খালি হাসে—স্যার আপ্নে ট্যাকা দ্যান নিয়া আসি। রিটন স্যারের নিষেধ আছে। আমার চাকরি থাকবো না।
কপট রাগ দেখিয়েছেন কিবরিয়া ভাই—অই ব্যাটা আমি থাকতে তোর চাকরি কেউ খাইতে পারবে না। লাগে রিটনের চাকরিই আমি খাইয়া দিমু, তুই বাবা আমারে একটা সিগারেট আইন্যা দে।
পিওন ছেলেটা সিগারেট আনার ভান করে রুম থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর ফিরে আসে না। আমি অফিসে না আসা পর্যন্ত ছেলেটা লুকোচুরি খেলে কিবরিয়ার সঙ্গে। তারপর আমার লাল হোন্ডাটা অফিসে প্রবেশ করা মাত্র বিকশিত দন্তে বীরদর্পে উদয় হয় সে—স্যার, কিবরিয়া স্যারে তো পিছে লাগছে। কয় সিগারেট আইন্যা দেতে অইবে।
–তুই সিগারেট দিছস তারে?
–মাত্থা খারাপ!
আমাকে আর পিওন আলমগীরকে অফিস ক্যাম্পাসে দেখে গ্যারেজের ওপরে তাঁর ছোট্ট রুম থেকে জানালায় ফুঁচকি দিয়ে কিবরিয়া ভাই হইচই বাঁধিয়ে দেন—অই হারামজাদা আইজ তর চাকরি শ্যাষ। আলমগীর হাসে—হিহি হিহি। আমার চাকরি খাওন অতো সোজা না। আমি বলি—এইতো ব্যাটা বাঘের বাচ্চা। একদম ডরাবি না কিবরিয়া স্যাররে।
দিন যায়।
কিবরিয়া ভাইয়ের সঙ্গে হাস্যে-লাস্যে-ভাষ্যে সময় কেটে যায় কোনদিক দিয়ে টেরই পাই না। আমাদের সঙ্গে শামিল থাকেন সাপ্তাহিক ছায়াছন্দের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক হারুনুর রশীদ খান ওরফে হারখা। তিনি আরেকটি ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার খবর হাউসের।
২
ঈদের টানা ছুটি চারদিনের। শান্তিনগরের মোড়ে খবর অফিসটা নিরব। নিরিবিলিতে কিছু কাজ এগিয়ে রাখতে ঈদের পরদিন সকালে আমার রুমে বসে কাজ করছি নিবিষ্ট মনে। এই সময়টায় অনেক কাজ করা যায়। কোনো দর্শনার্থী আসেন না। উটকো কোনো ঝামেলাও থাকে না। টেবিলে মাথা গুঁজে লিখছি কোনো একটা প্রতিবেদনের ইন্ট্রো ,এমন সময় গদাইলস্করী চালে আমার রুমে দশাসই ফিগারের হাস্যোজ্জ্বল গোলাম কিবরিয়ার প্রবেশ। তিনি হাসেন কিন্তু আমি হাসি না। লেখায় মনোযোগী হই। তিনি এসে বসেন আমার মুখোমুখি। আমি তাকাই না। টেবিলে তাল ঠুকে তিনি গান ধরেন—ও ও ও ও বাচপান কে দিন ভুলানা দেনা আজ হাছি কাল রুলানা দেনা…।
বাধ্য হয়ে আমি তাকাই তাঁর দিকে—অই মিয়া কি চান এই ছুটির দিনে? অফিসে আইছেন ক্যান? যান মিয়া বাড়িতে যান! বউ বাচ্চার লগে সময় কাটান।
আমার কথায় একটুও রাগ না করে উলটো খুশি হয়ে ওঠেন কিবরিয়া ভাই—এই জইন্যেই তোমারে ভালো লাগে। তুমি মিয়া জিনিস একটা। বউ বাচ্চার লগে সময় কাটাইতেই তো বাইরাইলাম।
–বউ বাচ্চার লগে সময় কাটাইতে বাইরাইলাম মানে?
–মানে তোমার ভাবী আর বাচ্চারা গেছে নারায়ণগঞ্জে, শ্বশুর বাড়ি। আমি এখন যাইতাছি। ভাবলাম অফিসটা একটু ঘুইরা যাই। দেইখ্যা যাই। তোমারে পাইয়া খুব উপকার হইলো।
–ঘটনা কী?
টেবিলে ফের তাল ঠুকতে ঠুকতে কিবরিয়া ভাই বললেন—তুমি আমারে পাঁচশ ট্যাকা হাওলাত দেও তো। সামনের সপ্তাহে পাইয়া যাইবা।
এর আগে আমার কাছ থেকে এরকম টুকটাক টাকাকড়ি নিয়েছেন তিনি। এবং যথারীতি দিয়েও দিয়েছেন সময় মতোই। কিন্তু আজকে আমার মুড অন্যরকম। সুতরাং মুখের উপরেই বলে দিলাম—হবে না। যান ফোটেন।
–আরে দ্যাওনা মিয়া। আইচ্ছা ঠিক আছে পাঁচশ না পারো তিনশ অন্তত দ্যাও। সম্মানটা বাঁচাও। শ্বশুর বাড়িতে যামু। খালি হাতে যাওয়াটা ঠিক হইবো না।
–ধুর্মিয়া কি ঝামেলা করেন আজাইরা। আমারে কাজ করতে দ্যান তো ভাই!
–আইচ্ছা ঠিক আছে, দুইশ দ্যাও। ঠ্যাকা কাম দুইশ দিয়াই চালাই।
–পারুম না। (বলেই লেখার প্রতি মনোযোগী হবার চেষ্টা করি।)
–তুমি তো মিয়া এতো খারাপ আছিলা না! হইলো কী তোমার? শরীল ঠিক আছে? আইচ্ছা দ্যাও একশ ট্যাকাই দ্যাও। এই যে দ্যাহো আমার মানিব্যাগ খালি। বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে মানিব্যাগ খুলে উপুড় করে দেখালেন।
কিন্তু আমার মন তাতেও টলে না। আমার সেই একই জবাব—দিগদারি কইরেন না তো ভাই। ট্যাকা নাই। আর পিওন পোলাডাও নাই। সুতরাং আপ্নেরে চা-ও খাওয়াইতে পারুম না। ছুটির পরে অফিস খুললে আসেন। এখন যান তো ভাই!
কিবরিয়া ভাই হাল ছাড়েন না—অনেক আশা নিয়া বড়মুখ কইরা আইলাম তোমার কাছে! আইচ্ছা ঠিক আছে আমার সম্মান বাঁচাইতে মিনিমাম পঞ্চাশটা ট্যাকা তো দিবা, নাকি?
–পঞ্চাশ ট্যাকা? পঞ্চাশ পয়সাও পাইবেন না আইজকা। মাপ চাই।
এইবার গম্ভীর হয়ে যান কিবরিয়া ভাই। টেবিলে তালঠোকা বন্ধ। মুখের অমলিন হাসিটাও উধাও। আশাহত বেদনার্ত চেহারা নিয়ে উঠে দাঁড়ান তিনি—তাইলে তুমি দিবা না? সত্যি সত্যি দিবা না?
–সত্যি মানে? পৃথিবীতে এইরকম সত্যি ঘটনা এর আগে কোনোদিন ঘটে নাই।
ব্যর্থ মনোরথ কিবরিয়া ভাই ঘুরে দাঁড়ান। তারপর থলথল ভঙ্গিতে হাঁটা ধরেন দরোজার দিকে। আর স্পষ্ট উচ্চারণে গাইতে থাকেন—দুনিয়াকা লাথ মারো দুনিয়া সালাম কারে…
অনেক কষ্টে আমি হাসি সম্বরন করি। আমার উদ্দেশে নিবেদিত কিবরিয়া ভাইয়ের এই গানটাকে গায়ে মাখি না। নিজেও শামিল হই গানে—তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়?/দুখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়…
চোখের সামনে থেকে অপসৃত হন কিবরিয়া ভাই।
৩
ঈদের ছুটি শেষ।
শান্তিনগরের খবর অফিস কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে। সকাল এগারোটায় অফিসে এসে সবার সঙ্গে ঈদ পরবর্তী মোলাকাত সমাপন করে আমার অতিতরুণ সহকর্মী সাংবাদিক বন্ধু স্নেহভাজন মাহবুব রেজা, দেলোয়ার হোসেন, আরমান হোসেন, জাহিদ রহমান, ফটোগ্রাফার পলাশ এবং পিওন আলমগীরের সঙ্গে ওদের ঈদ উদযাপনের গল্প শুনছি। এমন সময় আমার কক্ষে উদয় হলেন কিবরিয়া ভাই। তাঁকে দেখামাত্র আলমগীরকে বললাম—যা রে ব্যাটা কিবরিয়া স্যারের জন্যে ফাস্কেলাস একটা চা আর একটা ব্যানসন লিয়া আয়।
আমার এই সামান্য আপ্যায়নে খুশি হয়ে ওঠেন কিবরিয়া ভাই—যাউক তোমার দিলে তাইলে রহম আসছে!
–জ্বি কিবরিয়া ভাই। আমার দিলটা রহমে ভর্তি।
চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়া একাকার করে ফেলেন কিবরিয়া ভাই। বিশেষ কায়দায় সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ছেড়ে গোলাকার বৃত্ত নির্মাণের চেষ্টা করেন বারবার। আমার রুমটা ধোঁয়াচ্ছন্ন, কেমন মেঘলা হয়ে ওঠে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কিবরিয়া ভাই বলেন—তুমি মিয়া পাজি আছো। ভাবছিলা তুমি ট্যাকা না দিলে আমি যাইতে পারুম না শ্বশুর বাড়িতে?
–হ ভাবছিলাম তো।
–কিন্তু আমি তো ঠিকই গেছি।
–ক্যাম্নে গেলেন? ট্যাকা পাইলেন কই? অফিস ছুটি ছিলো। একাউন্টস সেকশন বন্ধ ছিলো। দৈনিক খবরের কোনো সাংবাদিকও অফিসে ছিলো না। ট্যাকা পাইলেন কই? শেষমেশ গরিব সিগ্রেটঅলার থিকা হাওলাত করছিলেন?
–আরে না মিয়া। অই ব্যাটাও তো ঈদ করতে চইল্লা গেছিলো। শোনো মিয়া, সেইদিন তোমারে অফিসে পাইয়া হাতে আসমানের চান পাইছি মনে করছিলাম। কিন্তু তুমি মিয়া ইমুন ছোটলোকের মতোন আচরণ করলা যে কি আর কমু। শ্যাষে কী আর করি! গেইটে দাঁড়ানো একটা রিকশাঅলারে জিগাইলাম গুলিস্তান বাসস্ট্যাণ্ড পর্যন্ত যাইবা? কইলো যামু। পাঁচ ট্যাকা দিয়েন। তো উঠলাম রিকশায়। রিকশা লইয়া গেলাম গুলিস্তান। নারায়ণগঞ্জ রুটের একটা বাসের পাশে রিকশায় বইসাই সেই বাসের কন্ডাক্টররে কইলাম আমি চাষাড়া নামুম। তুমি রিকশাঅলারে পাঁচটা ট্যাকা দিয়া দ্যাও তো। কন্ডাক্টর রিকশাঅলারে পাঁচ ট্যাকা দিয়া দিলো। বাস ছাড়োনের কিছুক্ষণ পর কন্ডাক্টর শালায় ভাড়া চায়। জিগাইলাম কতো? বললো—ভাড়া দশ ট্যাকা আর রিকশাঅলারে দিসি পাঁচ ট্যাকা, আপ্নে আমারে পন্র ট্যাকা দিবেন স্যার। বললাম—দিতাছি চাষাড়া গিয়া লই। চাষাড়া গিয়া বাসের জানালা দিয়া আরেকটা রিকশাঅলারে আমার শ্বশুরবাড়ির মহল্লার নাম কইয়া জিগাইলাম যাইবা নি? কইলো যামু। কতো নিবা? কইলো—সাত ট্যাকা দিয়েন। আমি কইলাম পুরা দশ ট্যাকাই দিমু কিন্তু লগে ভাংতি নাই তুমি এখন বাসের এই কন্ডাক্টররে পনেরোটা ট্যাকা দেও আগে। রিকশাঅলা কন্ডাক্টররে পনেরো ট্যাকা দিয়া দিলো। রিকশাটা লইয়া আমি চইলা গেলাম শ্বশুর বাড়ির গেইটে। অইখানে গিয়া তোমার ভাবীরে কইলাম—সব দোষ রিটনের। আমার লগে হারামিপনা করছে। আমারে একটা ট্যাকাও দেয় নাই। এখন তুমি এই রিকশাঅলারে পঁচিশটা টাকা দিয়া বিদায় করো। পয়লা চেইতা গেছিলো কিন্তু নিজের বাপের বাড়িতে নিজের সম্মান না বাঁচাইয়া করবো কি? দিতে বাইধ্য হইলো মিয়া…
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির এককালের সভাপতি আমার অগ্রজবন্ধু সেই কিবরিয়া ভাই মারা গেছেন ০৯ মে, ২০০৯ সালে। আমি অটোয়ায় বসে তাঁর মৃত্যুসংবাদ দেখেছি পত্রিকার পাতায়, ইন্টারনেটের কল্যাণে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম খবরটা পড়ে। বুকটা কী রকম মোচড় দিয়ে উঠেছিলো। অসংখ্য স্মৃতি এসে ভিড় করছিলো চোখের সামনে। বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলাম আমি। আমার বারবার মনে পড়ছিলো ঈদের পরেরদিনের সেই প্রসন্ন সকালটার কথা। কিবরিয়া ভাই, আপনার সঙ্গে সেদিন যে কঠিন আচরণ করেছিলাম আমি, সেটা কোনো পরিকল্পিত ব্যাপার ছিলো না। ইনস্ট্যান্ট নাটক ছিলো সেটা। আপনি তো জানেনই আমি মজা করতে ভালোবাসি। জাস্ট ফান করার জন্যেই সেদিন আপনার কথিত ‘ছোটলোকের মতোন’ আচরণটি আমি করেছিলাম। পঁচিশ বছর পর সেই স্মৃতি রোমন্থন করে এখনও হাসছি আমি। আমি জানি এই লেখাটি আপনার চোখে পড়লে আপনিও হাসবেন! বলবেন—তুমি মিয়া জিনিস একটা!
মিস ইউ কিবরিয়া ভাই…
অটোয়া, কানাডা
