
সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর, আমেরিকা ইসলাম ও ইসলামের অনুসারীদের তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। সেই প্রেক্ষাপটে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো ধীরে ধীরে আমেরিকার প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়। বিশেষ করে যেসব দেশে আমেরিকা-বিরোধী জাতীয়তাবাদ বা উগ্র জঙ্গিবাদী মনোভাব প্রবল, সেসব দেশ আমেরিকার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এই ধারাবাহিকতায় আমেরিকা নানা অজুহাত দেখিয়ে ইরাক ও লিবিয়ায় সরাসরি সামরিক অভিযান চালায় এবং ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দেশ দুটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। আফগানিস্তানেও তারা “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ” এর নামে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়, যার মূল লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা। দীর্ঘ অভিযান শেষে আমেরিকা তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়।
ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের ঘটনার পর থেকেই অনেকেই ধারণা করছিলেন, আমেরিকার পরবর্তী লক্ষ্য হবে ইরান। শেষ পর্যন্ত সেই শঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে বলে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমেরিকা ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইস্পাহান—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ চালিয়েছে।
তবে এই আক্রমণ আগের মতো সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। বরং এটি অনেকটাই ভারতের “অপারেশন সিন্দুর”-এর মতো পরিকল্পিত এবং সীমিত পরিসরের একপ্রকার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ধ্বংস বা বিপর্যস্ত করা, রেজিম পরিবর্তন নয়।
এর আগে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে আটক, লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে হত্যা এবং আফগানিস্তানে তালেবান সরকারকে অপসারণের মাধ্যমে আমেরিকা সরাসরি রেজিম চেঞ্জে সফল হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আমেরিকার কোনো স্থল অভিযান দেখা যায়নি, শুধুমাত্র আকাশপথেই হামলা চালানো হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে রেজিম চেঞ্জ আমেরিকার উদ্দেশ্য নয়; বরং তারা শুধুমাত্র ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম থামিয়ে দিতে চায়।
তবে ইরান ইরাক বা লিবিয়ার মতো সহজ টার্গেট নয়। দেশটির ধর্মীয় নেতা ইতিমধ্যেই তার দায়িত্ব সাময়িকভাবে রেভ্যুলুশনারি গার্ড বা বিপ্লবী বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করেছেন, যা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে, নেতার মৃত্যুর পরও দেশের নিয়ন্ত্রণ একটি শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর হাতে থাকবে, যা রেজিম চেঞ্জকে কঠিন করে তুলবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ও আমেরিকার সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক ছিল। ফলে তারা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর মূল উপাদানগুলো এমনভাবে প্রস্তুত রেখেছে যেন সেগুলো সহজে স্থানান্তরযোগ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ যন্ত্রপাতি পোর্টেবল অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়।
এমন পরিস্থিতিতে যদি আমেরিকা স্থল, নদী ও আকাশপথে পূর্ণাঙ্গ অভিযান না চালায়, তবে ইরানকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। বিশেষ করে রেজিম চেঞ্জ করে সেখানে আমেরিকান স্বার্থ সংশ্লিষ্ট “পাপেট সরকার” প্রতিষ্ঠা করা কোনো সহজ কাজ নয়।
আমার ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে যেতে আগ্রহী নন। বরং ইসরায়েলকে খুশি করতেই তিনি পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে সীমিত আক্রমণ চালিয়েছেন—একটি মোদি-স্টাইল “শক্তি প্রদর্শনমূলক” অভিযান। তবে ইসরায়েল যদি ইরানে একের পর এক হামলা চালাতে থাকে এবং ইরান পাল্টা আক্রমণে যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। ইসরায়েল নিজেই হয়ত আমেরিকাকে ব্যাপক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
একই সময়ে বিশ্ব ইতোমধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের মতো এক ভয়াবহ সংঘাতে জর্জরিত। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ গোটা পৃথিবীর জন্য এক ভয়ানক অশনি সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
স্কারবোরো, কানাডা
