
বেশ ছেলেবেলায় ‘বাঁধ’ নামে জহির রায়হানের একটা ছোটগল্প পড়েছিলাম। মাটির তৈরী বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে ভরা যৌবনা নদী। বর্ষাকালে কাল নাগিনীর মতো ফুঁসে ওঠে জলের উপরিভাগ। ফাটল ভেঙে পানি ঢুকে ডুবিয়ে দেয় ফসলী মাঠ। সারারাত গ্রামের মানুষ টর্চ জ্বেলে পাহারা দেয় বাঁধের এ মাথা ও মাথা। ফাটল দেখলেই যেনো তাৎক্ষণিক মেরামত করা যায়।
অনেক আগে পড়া গল্প। পুরো কাহিনী মনে নাই। এটুকু মনে আছে বাঁধ রক্ষার কৃতিত্ব শেষ পর্যন্ত গ্রামের পীর সাহেবের ঝুলিতে যায়। বৃষ্টিভেজা সাধারণ মানুষ রাতভর বাঁধের গর্ত ভরাট করে। আর ভন্ড পীর দাবী করে তাঁর ইশারাতেই মাটির উপর পানির চাপ কমেছে!
এ গল্প যখন পড়ি এর ভেতর কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং খুঁজে পাইনি। অথচ দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ড্যাম মনিটরিং একটি উচ্চ বেতনের প্রকৌশল সেবা। ড্যাম, এমব্যাংকমেন্ট কিংবা ব্যারেজের নির্মান ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয় সাপেক্ষ। ড্যাম ডিজাইন, কন্স্ট্রাকশন প্রসেস এবং কিউএ/কিউসি অনেক জটিল এবং কঠিন কাজ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত প্রকৌশলী মাত্রই জানেন বাঁধের কারিগরী দিক কতোটা বহুমাত্রিক।
বাঁধ নির্মানের ইতিহাস সভ্যতার অন্যতম পুরনো ইতিহাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্মের আগেই যেমন গাছগাছরা শেকড় বাকড় খেয়ে মানুষ চিকিৎসা নিতে শুরু করেছিলো, প্রকৌশল বিজ্ঞান আসার আগেই মানুষ বাঁধ নির্মান করতে সক্ষম হয়েছিলো। সিরিয়ার ৩৫০০ বছর আগের কুয়াতিনাহ ব্যারেজ আজো টিকে আছে। খ্রীষ্টের জন্মের দেড় হাজার বছর আগে মিশরের ফেরাউন রাজারা এটি তৈরী করে।
বেশ অবাক লাগে। স্লোপ স্ট্যাবিলিটির (Slope Stability) ফর্মুলা তখন আবিষ্কৃত হয়নি। মাটির এ্যাঙ্গেল অব ফ্রিকশন কিংবা কিংবা এ্যাঙ্গেল অব রিপোজ মানুষ জানতোনা। অর্থাৎ মানুষ জানতোনা মাটির কণা কত ডিগ্রী জ্যামিতিক কোণে একে অপরের সাথে আটকে থাকে। অথচ কী বিশাল বিশাল ড্যাম তাঁরা বানিয়েছে! যদিও প্রকৌশল বিদ্যার অনুপস্থিতিতে ছয় থেকে আটগুন বেশি সময় এবং অর্থের অপচয় হয়েছে। হেল্থ, সেফটি এন্ড এনভায়রণমেন্ট না থাকায় হাজার হাজার প্রাণহানি ঘটেছে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ বিভিন্ন কৌশলে বাঁধ নির্মাণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। আজ একটি মাটির তৈরী বাঁধের গল্প বলি। ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী স্যাক্রামেন্টো থেকে সোজা উত্তরদিকে ঘন্টা দেড়েক ড্রাইভ করলে অদ্ভুত সুন্দর এক লেক দেখা যায়। নাম লেক অরোভিল। প্রতি বছর অনেক পর্যটক এ এলাকায় বেড়াতে আসে। এর জল নিয়ন্ত্রনে যে বাঁধটি বানানো হয়েছে তার নাম অরোভিল ড্যাম। এই ড্যামের নাম প্রথম শুনি কনকোর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির একটি সেমিনারে। মাস্টার্সে আমার ভারতীয় ক্লাশমেট সতীশ পাওয়ার বাঁধের উপর একটি প্রেজেন্টেশন দেয়। হায়দ্রাবাদের ছেলে সতীশ। আর্থ স্ট্রাকচারে ভীষণ আগ্রহী। ওর প্রেজেন্টেশন থেকে জানলাম অরোভিল ড্যাম ২৩৫ মিটার উচ্চতা নিয়ে যুক্তরাস্ট্রের উচ্চতম ড্যাম। দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটারের বেশী। ৪.৩ ট্রিলিয়ন লিটার পানি ধরে রেখেছে এই বাঁধ। অথচ মাটির স্ট্রাকচারে দাঁড়িয়ে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ফেদার নদীর উপর এমব্যাংকমেন্ট দিয়ে এ ড্যাম নির্মান করা হয়েছে। উচ্চতা ২৩৫ মিটার হলেও হাইড্রোলিক হেড ১৮৭ মিটার। হাইড্রোলিক হেড হচ্ছে এমন একটি উচ্চতা যা বিবেচনায় এনে প্রকৌশলীরা তরল পদার্থের চাপ নির্ণয় করে। সাধারণভাবে বলা যায় এটি ওই লেকের পানির গড়পড়তা সর্বোচ্চ উচ্চতা। অর্থাৎ পাড়ের উচ্চতা ২৩৫ মিটার আর পানির উচ্চতা ১৮৭ মিটার হলে পানি উপচানো বা স্পিলিংএর সম্ভাবনা থাকেনা। কিন্তু প্রকৃতির উপর কার হাত? বরফ গলা জলের ঢল কি আর কোনো হিসাব কষে আসে?।
২০১৭ সালে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় শতবর্ষের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টিজলের সাথে বরফ গলা জল মিলে ভয়াবহ ঢল। ফেদার নদীতে অতিরিক্ত ৫০ হাজার কিউসেক পানির জোয়ারে স্রোতের ফ্লো-প্যাটার্ন বদলে যায়। এরফলে স্পিলওয়ে ফেল করে। স্পিলওয়ে হলো বাঁধের যে অংশের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানির বের করে দেবার সুযোগ করে দেয়া হয়। কিন্তু কখনো কখনো নদী বা হ্রদের পানি এতো বেশি হয়ে যায় যে স্পিলওয়ে ছাড়াও অন্য জায়গা দিয়ে পানি উপচে পড়ে। আবার স্পিলওয়ে পানির চাপে ভেঙে যায় বা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে দিয়ে অন্য ঢালে পানি প্রবাহিত হয়। এরকম অবস্থাকে স্পিলওয়ে ফেইলর বলে। স্পিলওয়ে ফেল করলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। এরফলে আশেপাশের রাস্তাঘাট এবং হাইওয়ে ডুবে যায়। প্রায়ই হলিউড মুভিতে আমেরিকার রাস্তায় গাড়ি ভাসতে দেখা যায়। এর বেশিরভাগ কারণ আশেপাশের স্পিলওয়ে ফেইলর।
১৯৬১ সালে নির্মান কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬৮ সালে। তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে এটি নির্মিত হয়েছিলো। সেচের জল সরবরাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রন এবং ৮২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন। সাথে বোনাস হিসাবে পাওয়া ফেদার রিভার ফিশ হ্যাচারী! ২০১৭ সালে স্পিল বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ১.১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ড্যাম মেরামতের কাজ করে। চতুর্মুখী সুবিধা দেয়া ড্যাম মেরামতে ব্যবসায়ী ট্রাম্প টাকা ঢালতে দ্বিধা করেনি ।
টরন্টো, কানাডা
